SEND FEEDBACK

English
Bengali

আমেরিকায় ভারতীয়ের হত্যাকারী যদি আরব বা মেক্সিকান হতো, কী করতেন ট্রাম্প

মার্চ ২, ২০১৭
Share it on
শুধু দু’জন বিখ্যাত মানুষ কোনও কথা বলছেন না। এক্কেবারে বুদ্ধের স্ট্যাচুর মতো বসে রয়েছেন। এক, আমাদের মোদীজি। আর কোনও কথা শোনা গেল না ট্রাম্পের ট্রম্বোনে।

ক্যানসাসে শ্রীনিবাস কুচিভোটলার জাতিবিদ্বেষ-প্রসূত হত্যার পর থেকে মিডিয়াতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
 
আমরা আমেরিকায় বসে বসে দেখছি, নানারকম ভারতীয় খবরের কাগজ, টিভি ও অনলাইন প্রকাশনাতে দেখতে পাচ্ছি, তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো কেমন। যেন, এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। যেন, এই প্রথম একজন ভারতীয় খুন হলো। হ্যাঁ, মুসলমান হলেও না হয় কথা ছিল। ট্রাম্প মুসলমানদের তাড়াতে চাইছে। হ্যাঁ, সন্ত্রাসীদের তো তাড়াতে হবেই। আর সেসব করতে গেলে দু’চারটে মুসলমান তো একটু মুশকিলে পড়বেই।
 
কিন্তু হিন্দুদের পেছনে কেন বাওয়া? আমরা হলাম একেবারে বাপু গাঁধীজি। নোংভিওলেন্ট। আমাদের হিংসে কেন বাপু? আমরা তো সব বেশির ভাগ ট্রাম্পকেই চেয়েছিলাম। কত নারা দিলাম নভেম্বরে!
 
তা ছাড়া, রাত্তিরবেলা বাড়ির বাইরে গিয়ে বারে বারে ওই বার-এ যাবার দরকার কী ছিল? এ যেন বড্ড বাড়াবাড়ি! তাও আবার ওই ক্যানসাসে। ওসব জায়গা খুব খারাপ। ক্যানসাস, আর ওই আরক্যানসাস। ওসব খুব ভুলভাল জায়গা।  
 
(অবশ্য যাঁরা বলছেন, তাঁদের কেউই ক্যানসাসে কখনো যাননি। কিন্তু আমাদের বাঙালিরা কোথাও কখনও না গিয়েও সেসব জায়গা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিতে পারেন। আমরা পারি। আমাদের কল্পনাশক্তি সত্যজিতের জটায়ুর মতোই তীক্ষ্ণ।)
 
বা, যেন ভাবখানা এই রকম, এ আবার কী সব হচ্ছে আমেরিকায় আজকাল? এই বন্দুকের ব্যাপারটাই আমেরিকার খুব একটা বাজে ব্যাপার। নইলে দেশটা এমনিতে ভালই ছিল। একবার গিয়ে পড়তে পারলেই আজকের দিনে এক ডলারে প্রায় সত্তর টাকা। বাংলাদেশে তো আরো বেশি।
 
পাড়ায় পাড়ায়, রকে রকে, পার্টিতে পার্টিতে, ছাতে ছাতে, বারান্দায় বারান্দায়, এয়ারপোর্টে এয়ারপোর্টে, ক্লাবে ক্লাবে, ড্রিংকে ড্রিংকে, ফিসফিসে ফিশ ফ্রাই, বা সিক্স বালিগঞ্জ প্লেসে ডাবচিংড়ি, বা আর্সালানের বিরিয়ানি খেতে খেতে আলোচনা ফিস ফিস, বা তুমুল। কংগ্রেস বা তৃণমূল।
 
"কী সব চলছে? এই সময়ে আমেরিকা যাচ্ছিস?"
 
"বাবা সাবধানে থাকিস বাবা। একটা হনুমান চালিশা মাদুলি নিয়ে যা। সৌমিত্র বলেছে কাজ হচ্ছে।"

"খুকু, রাতে বেরোস না বাড়ি থেকে। ওদের বলিস ন’টার পরে হলে যেন পৌঁছে দেয়।"

"ওঃ, তোর ভাইপো তো আবার ওই নেব্রাস্কা না কোথায় আছে না? ওসব জায়গা ... মানে ... টেকসাস? ওঃ, খুব বাজে। দেখ না, যদি নিউ ইয়র্কে বা বস্টনে একটা ট্রান্সফার নিতে পারে। কোম্পানিকে বলে দেখ না।"

ঘরে ঘরে মিটিং হচ্ছে। “মানুষ উত্তেজিত। কী করে বাঁচবে লোকে, কেউ যদি বলে দিতো!”

শুধু দু’জন বিখ্যাত মানুষ কোনও কথা বলছেন না। এক্কেবারে বুদ্ধের স্ট্যাচুর মতো বসে রয়েছেন। এক, আমাদের মোদীজি। তাঁর কাছ থেকে এখনো কোনও ধিক্কার স্টেটমেন্ট পাওয়া যায়নি। সরকারিভাবে যদিও কী যেন একটা বলা হয়েছে। যেমন সরকারিভাবে কী যেন একটা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু কোনো ব্যক্তিগত উচ্চারণ শোনা গেল না এখনও বাগ্মী নরেন্দ্রভাইয়ের কাছ থেকে।

আশ্চর্য নীরবতা! কী অদ্ভুত আত্মসংযম! পাওয়ার ইয়োগা।

রণহুঙ্কারী ট্রাম্প

আর কোনও কথা শোনা গেল না ট্রাম্পের ট্রম্বোনে। যিনি কথায় কথায় রণহুংকার ছাড়েন। যিনি কারুকেই কখনও ছাড়েন না। তিনি কেন এই ব্যাপারটায় সম্পূর্ণ ছাড় দিলেন ওয়াল মার্টের মতো, সেটা বোঝা গেল না। ধরুন যদি, আজ সবার সামনে এই সাদা লোকটা খুন না করে একটা কালো লোক খুনটা করতো? ধরুন যদি, আজ এই খুনটা করতো একটা আরবদেশীয় দাড়িওলা লোককে, ধরুন যদি আজ এই খুনটা করতো একটা মেক্সিকান মজুর। বা একটা বার্মা থেকে আসা বাস্তুহারা...?

কিন্তু যুদ্ধোন্মাদ ড্রাগ খাওয়া হাল্লারাজার মতোই এখানে কিছু কিছু লোক, মানে খুব দেশভক্ত ইন্ডিয়ান বা আমেরিকান বা বাঙালি বলতে পারেন, "হুঁ:, ধরুন যদি, ধরুন যদি, ধরুন যদি।" তাঁরা বলতে পারেন, "এতো বড়ো দেশে এরকম দু’চারটে ঘটনা ঘটেই থাকে। এত চেল্লামেল্লি লাগাবার কী আছে?"

সত্যিই তো! এত কথার কী দরকার? দু’দিন পরেই কুচিভোটলা নামটাই কুচিকুচি করে ভোটের কাগজ ছিঁড়ে ফেলার মতোই লোকে জঞ্জাল ফেলার বিনে ফেলে দেবে। এমনিতেই চ্যাটার্জি নয়, ব্যানার্জি নয়, দাস নয়, দত্ত নয়, গুপ্ত নয়। সুর নয়। কর নয়। কুচিভোটলা। বাঙালিই নয়। এসব নাম এমনিতেই আমরা মনে রাখতে পারি না। আমরা মনে রাখবোও না। আজকাল সাইকোথেরাপিস্টরা পরামর্শ দিচ্ছেন, অপ্রিয় স্মৃতি, ভয়ংকর ঘটনা মন থেকে একেবারে মুছে ফেলতে। তাতে হৃদয় প্রশান্ত থাকে। তারপর তো ইয়োগা আর রামদেব আছেই। খারাপ জিনিস ভুলে যাও ভুলে যাও ভুলে যাও। আমরাও কুচিভোটলা আর ক্যানসাস ভুলে যাবো দ্রুত।

দু’দিন পরেই আবার আমরা লাইন লাগাবো হো চি মিন সরণিতে মার্কিন কনসুলেটের সামনে গিয়ে ভিসা করাবার জন্যে। এইচ ভিসা। টুরিস্টদের বি ভিসা। ছাত্র হবার ছাত্রী হবার এফ ভিসা। বিজনেস ভিসা। এ থেকে জেড ভিসা। আম্রিকা আম্রা যাবোই যাবো।

আচ্ছা, ছি ছি, মার্কিন দূতাবাসের রাস্তার নাম হো চি মিন সরণি? এটা মোদিজি জানেন? এটা কিন্তু চরম অসৌজন্য ট্রাম্পের প্রতি। খুব খারাপ। নিশ্চয়ই ওই জ্যোতিবাবু-প্রমোদবাবুদের কীর্তি। ওই চারু-সিধু-কানু। একেবারে কেলেংকারি করে গিয়েছে লোকগুলো! পাকা ঝানু!

এ নামটা বদলে দেওয়া খুব দরকার। ছি ছি ছি ছি! একী কাণ্ড করেছেন আপনারা? যত কাণ্ড কোলকেতাতে?

সে যাই হোক। দেখা যাবে এক সময়ে। ইতিহাস যখন পাল্টানোই হচ্ছে, তখন ওটাও হবে ঠিক সময়ে। সবুর করো একটু। সবুরে মেওয়া ফলে।

আমরা হো চি মিন সরণিকে বলরাজ মাধোক মার্গ করে দেব। উনি আমেরিকাকে খুব পছন্দ করতেন। কিংবা, লোকে যদি বেশি হাল্লাগুল্লা করে, বিজেপি বিজেপি নাম হয়ে যাচ্ছে বলে চেঁচায়, তাহলে আমরা ওটাকে পাল্টে রোনাল্ড রেগান রোড করে দেব। আমেরিকার রাস্তা আমেরিকার লোকের নামে হবে। ব্যাস, আর কেউ ঝামেলা করতে পারবেই না।

আমরা সবাইকে জিজ্ঞেস করবো, "কী, ঠিক কি না?" তখন সবাই সমস্বরে বলবে, "ঠিক, ঠিক, ঠিকই।"
 
সে যাই হোক।

সস্ত্রীক শ্রীনিবাস কুচিভোটলা, ছবিছ ফেসবুক

মিডিয়াতেও বেশিদিন এসব নিয়ে ঘোটালা হবে না। কেন মার্কিন দেশে লোকে প্রত্যেক দিন বন্দুকবাজিতে মরে, কেন এদেশে এত বন্দুক মুড়ি-মিছরির মতো, কেন সেখানে কালো যুবকদের লাশ পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যত্রতত্র পড়ে থাকে নিথর, কেন সে দেশটাতে খুব কম করে দশ লক্ষ লোক জেলে পচছে, কেন সেখানে জেলখানাগুলো সব প্রাইভেট কোম্পানি চালায়, কেন আমেরিকায় কয়েদিদের ক্রীতদাসের মতো রাস্তার পাথর ভাঙার কাজে লাগানো হয়, বা আপেল স্ট্রবেরির ক্ষেতে আঙুরের ক্ষেতে বিনা মজুরিতে খাটিয়ে নেওয়া হয়, কেন মার্কিন মুলুকে মেক্সিকো আর দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে কোটি কোটি লোক না খেতে পেয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পালিয়ে আসে, আর তাদের মেয়েরা আর বাচ্চাগুলো মরুভূমি পার হবার সময়ে জলের অভাবে বালিতে একটা ক্যাকটাস ঝোপের আড়ালে মরে পড়ে থাকে, এসব আলোচনা না করাই ভাল।

ওই যে সাইকোথেরাপিস্টরা পরামর্শ দিচ্ছেন, অপ্রিয় স্মৃতি, ভয়ংকর খবর মন থেকে একেবারে মুছে ফেলতে?

আসুন, আমরা কুচিভোটলাকেও মন থেকে মুছে ফেলি। আর ওই ইয়ান নামে যে সাদা ছেলেটা ওদের বাঁচাতে গিয়ে গুলি খেয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে, ওর কথাও ভুলে যাই।

যত ভুলে থাকা যায়, ততই ভালো। নইলে, এমনিতেই এতো ভুলভাল ব্যাপার হচ্ছে চারদিকে। দেশে, বিদেশে।

আসুন, আমরা সবাই মিলে ভুলভুলাইয়া বেড়াতে যাই।

Srinivas Kuchibhotla Donald Trump Narendra Modi USA Hate Crime
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -