SEND FEEDBACK

English
Bengali

বধূবরণের ভূত থেকে রাশি বা দুর্গার প্রতিবাদ, সবই লেখেন অসিতা

শাঁওলি, এবেলা.ইন | জানুয়ারি ৯, ২০১৭
Share it on
বাংলা টেলিভিশনের চিত্রনাট্যকারদের বিরুদ্ধে এক শ্রেণির দর্শকের প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। সেসব শুনলেন, আর জানালেন টেলিভিশনের রান্নাঘরের বহু কথা। একান্ত সাক্ষাৎকারে টেলিভিশনের চিত্রনাট্যকার অসিতা ভট্টাচার্য।

কিছুদিন আগে ‘বধূবরণ’-এর একটি এপিসোডে ভূত ঝিলমিলকে দেখা গিয়েছিল ভগবানের দেওয়া একটি বাঁশ হাতে। সেই নিয়ে একটি প্রতিবেদনও লেখা হয়েছিল এবেলা.ইন-এ। কৌতূহল ছিল, এই ধারাবাহিকের গল্পকারের সঙ্গে আলাপিত হওয়ার। কিন্তু প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরে জানা গেল ‘বধূবরণ’-এর চিত্রনাট্যকারই লেখেন ‘আমার দুর্গা’-র মতো একটি ব্যতিক্রমী টেলিকাহিনি। তার পরেই লেখিকার একান্ত সাক্ষাৎকারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি করে অনুভূত হতে থাকে। শেষমেশ রাজি হন আদ্যন্ত প্রচারবিমুখ অসিতা ভট্টাচার্য। ‘রাশি’, ‘কনক’ বা ‘দুর্গা’-র মতো বাংলা টেলিভিশনের কাল্ট চরিত্রগুলির স্রষ্টা এই মানুষটি একদিন দূরভাষে কথা বললেন এবেলা ওয়েবসাইটের সঙ্গে। 

বাংলা সিরিয়াল তো প্রচুর মানুষ দেখেন, অথচ এই নিয়ে প্রচুর সমালোচনাও হয়। এটা কি সমালোচনা করার জন্যই করা? 

অসিতা: আমরা তো একটা গল্প দেখাই, সেই গল্পটা যদি দর্শকের মনের মতো হয় তখন তারা দেখতে চায় যে গল্পটা কোথায় যায় শেষ পর্যন্ত। একটা গল্পের হয়তো ৫০০ এপিসোড হওয়া উচিত, কিন্তু সেটা ১০০০ এপিসোড করতে হয়। কারণ, একটা বাণিজ্যিক বিষয় তো থাকে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় গল্প একটু ছেড়ে যায়, কিছু অতিরিক্ত বিষয় আসে, এইভাবে গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আমার কোনও একদিন স্বপ্ন ছিল সাহিত্যিক হব, সেখান থেকে এখানে আসা। আমি মেগা-র গল্প যখন লিখি তখন সেই গল্পের শেষ লাইনটা জানা থাকে। হাজার এপিসোডই হোক বা দেড় হাজারই হোক, সেটা থেকে সরি না। ‘বধূবরণ’-এ তো আমি একটা সম্পর্কের গল্প বলি, সেখানে এখনও পর্যন্ত একটা পরিবারের বন্ধনের গল্পটা বলে এসেছি। একটা স্বপ্নের পরিবার, সেখানে একমাত্র ঝিলমিল নেগেটিভ ছিল, যে অনেক দুষ্টুমি করেছে মারা যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত। মারা যাওয়ার কারণটা ছিল ওর স্বার্থত্যাগ। ওর স্বামী অভ্র ও বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য ও নিজের জীবন দিয়েছিল। এই ভালবাসার বন্ধনের জন্যই ও মুক্তি পায়নি। এভাবে আমি মনে করেছি। সেই কারণেই কিন্তু ওর ফিরে আসা। আমরা তো প্রত্যেকেই নিজের নিজের চোখ দিয়ে দেখি। কিন্তু ঝিলমিল মারা যাওয়ার পরে যখন ফিরে আসে তখন কিন্তু সে পুরোটা দেখতে পায়। তার পরেই কিন্তু ওর চৈতন্য হয় এবং ও বুঝতে পারে, ঠিক কোথায় ভুল ছিল। তার পরেই ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়, পরিবারের ভাল চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘটনাক্রম যেমন দাঁড়ায় তাতে ও কিন্তু বোঝে যে, এই ফিরে আসাটা কিন্তু আসলে আশীর্বাদ নয়, শাস্তি। ওর চোখের সামনেই অভ্রর বিয়ে হয়ে যায়, অভ্র ঝিলমিলের সমস্ত স্মৃতি পুড়িয়ে ফেলে। অভ্র তো জানে না যে ঝিলমিলের আত্মা রয়েছে আশেপাশে। এই গোটা পর্যায়টা, আমার মনে হয়েছিল, আমি যে বন্ডিংয়ের গল্প বলি, সেই গল্পটাই বলছি। ভূত আছে কি নেই, সেটা বিতর্কের কথা। সায়েন্সও তো জোর দিয়ে বলতে পারে না। আমরা সাহিত্যে প্রচুর কিছু পেয়েছি ভূতের প্রসঙ্গ, যেগুলো আমাদের পড়ার সময় অসুবিধা হয়নি। আমার বিশ্বাস ছিল যে, তাহলে আমাদের দেখতে অসুবিধা হবে কেন। নাহলে আমি ঝিলমিল-কে না-ই মারতে পারতাম। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, ঝিলমিল পুরো জীবনটাকে দেখুক, যেটা ও দেখতে পায়নি। আমার এটাই বলার ছিল যে আমরা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে যেটা দেখি, সেটা সব সময় সত্যি হয় না। 

আপনার সাহিত্যিক হওয়ার ইচ্ছে ছিল বললেন, হয়তো সংসারের চাপে সেটা সম্ভব হয়নি। যখন অবসরটা পেলেন তখন টেলিভিশনে এলেন কেন? 

অসিতা: গল্প লেখাটা আমি কোনও দিনই ছাড়িনি। শিশুবেলা থেকে লিখতাম, নাটকও লিখেছি। সেটা কোথাও রয়ে যায়। ‘অলৌকিক’ বলে একটা সিরিজ হতো। আমি সেখানে চারটে গল্প পাঠিয়ে দিই। ওইখান থেকেই শুরু। ‘ফৌজি’ নামে একটা গল্প ২৬ জানুয়ারি টেলিকাস্ট হয়েছিল। আমি খুব প্রশংসা পাই ওই কাজটা করে। তার পর থেকে সুযোগ পেতে থাকি। প্রথমদিকে শুধু স্টোরিতেই কাজ করতাম। 

প্রথম চিত্রনাট্য লেখা কোন প্রজেক্টে? 

অসিতা: টেলিফিল্ম দিয়েই প্রথম চিত্রনাট্য লেখা শুরু। ‘তিন পুরুষ’ বলে ইটিভিতে একটা ইন-হাউস মেগা হতো, সেটাই আমার প্রথম কাজ। তার পরে ‘দেবদাস’। অনেকদিনই হয়ে গেল এই জগতে কিন্তু আমি কোনওদিনই সামনে আসিনি, সেভাবে চেষ্টাও করিনি। সংসারের মধ্যে থেকে কাজটা আমার একটা মুক্তির জায়গা বলতে পারো। 

আপনার কি মনে হয়, মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন কি চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী? 

অসিতা: আমার মনে হয়। কারণ আমরা রোজ সকলের ঘর-গেরস্থালির ভিতরে ঢুকে পড়ি। এবং এটা অত্যন্ত দায়িত্বের কাজ বলে আমি মনে করি। 

রাশি, কনক, দুর্গা বা ঝিলমিলের মতো টেলি-চরিত্র কি জনমানসকে প্রভাবিত করতে পারে? 

অসিতা: আমি বিশ্বাস করি। দুর্গাকে যদি ধরি, রেটিংয়ের দিক থেকে কিন্তু ‘আমার দুর্গা’ এক নম্বর নয়, কিন্তু গ্রাম বাংলায় এমন অনেক মেয়ের কথা আমি জানি, যারা দুর্গার মতো হতে চায় বা অনেকেই দুর্গা হয়ে উঠছে। ‘রাশি’-র সময়েও আমি দেখেছি, প্রচুর মানুষ আমাকে বলেছেন। আমাদের বাড়িতে মন্দিরও থাকে আবার ড্রেনও থাকে। আমার বক্তব্য হল, ড্রেনের ঢাকনাটা না খোলাই ভাল। খুললে হয়তো অনেক বেশি টিআরপি দেওয়া যায় কারণ হয়তো মন্দ জিনিসের প্রতি ঝোঁক বেশি। কিন্তু সেটা না করে মন্দিরের কথা বলাটা হয়তো কঠিন হয়, টেন অন টেন হয় কি না আমি জানি না। যদিও আমাকে কখনও এমন কিছু করার কথা কেউ বলেনি। আমি মনে করি এটা ভগবানের কৃপা। আমি নিজের বিশ্বাসে আজ পর্যন্ত রেজাল্ট পেয়েছি। 

একটি নেগেটিভ চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কতটা চ্যালেঞ্জিং? 

অসিতা: আমি কোনওদিনই পুরোপুরি নেগেটিভ চরিত্রে বিশ্বাসী নই। যেমন ‘রাশি’-র অপালা রায় কিন্তু মা ছিলেন, সেই জায়গাটায় কোনও খাদ ছিল না। আজকে ‘আমার দুর্গা’-য় অভিরূপের চরিত্রে আমি এখনও সেই জায়গায় যাইনি। আমি গ্রে শেডস-এ বিশ্বাসী। একটা মানুষ ভাল-মন্দ হয়। কিন্তু সবার উপরে রয়েছে কিন্তু সেই মানুষটিই। আমি সেই মানুষটিকে খোঁজার চেষ্টা করি। কখনও ভালর মধ্যে দিয়ে, কখনও মন্দর মধ্যে দিয়ে। 

সেই কারণেই কি নেগেটিভ চরিত্রগুলি একটা সময় ‘ভাল’ হয়ে যায়? 

অসিতা: একদমই, তাদের উত্তরণ ঘটে। 

আপনার এই এতগুলো কাজের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র বা প্রিয় প্রজেক্ট কোনটা ছিল? যেটা লিখে আপনার সবচেয়ে ভাল লেগেছে...

অসিতা: ‘বধূবরণ’ তো অবশ্যই। তাছাড়া ‘রাশি’ আর ‘আমার দুর্গা’-র কথা বলব। আমি যেমন কাজ করতে চাই, যেমন চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে চাই সেটা এই দুটো প্রজেক্টে আমি অনেকটাই পেয়েছি। কিন্তু এটা নিশ্চয়ই বুঝবে যে, মার্কেটে কোনটা চলবে সেটা আমাদের ভাবতে হয়। আমি একটু কম ভাবি আর আমি খুব লাকি যে এমন একটা প্রোডাকশন হাউসে কাজ করি, যেখানে এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি সব রকম সহায়তা পাই। 

এমন কি কখনও হয়েছে যে আপনি যেভাবে লিখছেন চরিত্রটা সেটা যিনি অভিনয় করছেন তিনি ঠিক ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না? 

অসিতা: সেটা হতেই পারে কারণ অনেক নতুন ছেলেমেয়েরা তো আসে কিন্তু আমি সব সময় ফ্লোরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, তাদের সঙ্গে কথা বলি। যেমন গীতশ্রী, ‘রাশি’-র সময় একেবারেই নতুন ছিল। ওরও সময় লেগেছে কিন্তু ও আমার এত প্রিয় আর ও নিজেকে এমনভাবেই তৈরি করেছে যে আমি চিরদিনই ওকে রাশি বলেই ভাবব। আমি যে মেয়েটাকে দেখেছিলাম কল্পনায়, তাকে পেয়েছি।   

যে অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে আপনি পেলেন, তার মতো করে কি চরিত্রটা কখনও কখনও শেপ-আপ করতে হয়? 

অসিতা: হ্যাঁ, অনেক সময়েই সেটা করতে হয়। আমাদের তো ৩৬৫ দিনের কাজ। আমি নিজে যেটা ভাবছি, সেটাই সব সময় মেগা-র ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। তাই আমাদের একটু একটু করে, গল্পটাকে কম্প্রোমাইজ না করে চরিত্রকে অনেক সময় তার মতো করে নিতে হয়। 

রাশি তো আবার নতুন রূপে আসছে ‘দেবীপক্ষ’-তে। অভিনেত্রী এক অথচ চরিত্রটা আলাদা। পুরনো চরিত্রকে ভুলিয়ে নতুন চরিত্রকে জনপ্রিয় করে তোলাটা কতটা কঠিন হবে? 

অসিতা: খুবই চ্যালেঞ্জিং। যারা ‘রাশি’-কে ভালবাসে তাদের ‘রাশি’-কে ভুলিয়ে ‘দেবী’-কে এস্টাবলিশ করা খুবই কঠিন হবে। 

আপনার কী মনে হয়, ‘দেবী’ কি ‘রাশি’-র থেকেও বেশি জনপ্রিয় হবে? 

অসিতা: আমি তো আশা করব। 

আরও পড়ুন

অভিনয় করতে করতে এমএ করেছেন, অকপট আড্ডায় ‘আমার দুর্গা’-র সঙ্ঘমিত্রা

‘দেবীপক্ষ’-এ ফিরছেন গীতশ্রী, কেমন কাটল তাঁর দেড় বছরের ব্রেকটাইম

Asita Bhattacharya Scriptwriter Bengali Television Bodhuboron Aamar Durga
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -