SEND FEEDBACK

English
Bengali

একলা চলো রে

আরুণি মুখোপাধ্যায় | ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭
Share it on
২০১৬’র ডিসেম্বরের কথা। দিল্লি থেকে রাশিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন নিধি তিওয়ারি। কেন?

২০১৬’র ডিসেম্বরের কথা। দিল্লি থেকে রাশিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন নিধি তিওয়ারি। কেন? রাশিয়ার হাড়হিম করা ঠান্ডায় গাড়িতে সাইবেরিয়া সফর করবেন বলে। ইয়েকুট্স্ক থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর সফর। হিসেব কষলে দেখা যাচ্ছে, ১৮ দিনের সফরে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন নিধি। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সফর থেকে ফিরে দিল্লি থেকে ফোনে আড্ডা দিলেন নিধি।

২০১৫’র শেষে দিল্লি থেকে লন্ডন রোড ট্রিপ করেছিলেন। সেবার সঙ্গী হয়েছিলেন, আপনার দুই বন্ধু (সৌম্যা গোয়েল এবং রশ্মি কোপ্পার)। এবার তো একাই...।
সাইবেরিয়া ট্রিপের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার কাছে বেশ কঠিন ছিল। কারণ, ওই রাস্তায় কেউ আগে ট্যুর করেনি। তবে একা সফর করায় আমার সুবিধাই হয়েছে। কারণ সফরে আমাকে অন্য কারও জন্য সময় ব্যয় করতে হয়নি। সকলকে নিয়ে চলার যে ঝামেলা হয় আর কী। তাই পুরো মনোযোগটা সফরেই দিতে পেরেছি। আশপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও ভালভাবে উপভোগ করতে পেরেছি। ইট ওয়াজ অ্যান এক্সাইটিং ট্যুর ফর মি!

রাশিয়া এবং সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একা সফর করার ভাবনাটা একটু বেশিই দুঃসাহসী নয় কি?
(হাসি) রিস্কে আমি অভ্যস্ত! জীবনের প্রতি মুহূর্তেই তো রিস্ক রয়েছে। কোনও মুহূর্তকে বা ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন, সেটার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। ঝুঁকি রয়েছে বলে যদি পিছিয়ে আসি, তাহলে নিজেই পিছিয়ে পড়ব। রিস্ককে অতিক্রম করতে হবে।

রাশিয়া সফরের কথাটা মাথায় এল কীভাবে?
রাশিয়ায় ট্যুর করব বলেই যে এমন পরিকল্পনা করেছি, তা কিন্তু নয়। আসলে আমি ওই রকম বরফ ঢা়কা এলাকায় ড্রাইভ করতে চেয়েছিলাম। ইয়েকুট্স্ক থেকে মাগাডন অবধি রাস্তাটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম রাস্তা বলে ধরা হয়। আমার স্বপ্ন ছিল, সেই রাস্তা দিয়ে জীবনে অন্তত একবার ড্রাইভ করব! হাড়হিম করা ঠান্ডায়, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর সুযোগটা নেব। এইসব ভেবেই আমি ওই রুটম্যাপ ধরে এগিয়েছিলাম। 

দিল্লি থেকে লন্ডন সফরের সময় আপনি তো গুগ্‌ল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে ভাষার সমস্যা মিটিয়েছিলেন। এবারও কি তাই...?
একদম। এবার আমার যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, কী বলব! আমার সেলফোনে ইংরেজিতে কিছু একটা টাইপ করে ট্রান্সলেটরে দিতাম। অনেক সময়ই সেই লেখা পড়ে ওঁরা আঁতকে উঠত। ওঁদের কথা পড়ে আমিও অনেকবার অবাক হয়েছি। পরে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলতাম (হাসি)।

আপনি তো কোলিমা হাইওয়ের উপর দিয়েও ড্রাইভ করেছেন? যাকে ‘দ্য রোড অফ বোন্‌স’ও বলা হয়।
হ্যাঁ। ওই মাগাডান যাওয়ার সময় রাস্তাটা পড়ে। জোসেফ স্তালিনের সময় এই রাস্তাটা তৈরি করা হয়েছিল। সোভিয়েত জমানার বেশ কিছু কনসেনট্রেশন ক্যাম্পও রয়েছে ওই এলাকায়। শোনা যায়, ওই রাস্তা তৈরির সময় ক‌্যাম্পের যে শ্রমিকরা কাজ করতেন, প্রবল ঠান্ডায় বা অসুস্থতায় তাঁরা মারা গেলে, রাস্তার আশপাশেই তাঁদের দেহ পুঁতে দেওয়া হতো। প্রত্যন্ত এলাকা হলেও, ওখানে ট্রাফিকের চাপ যথেষ্টই রয়েছে। ওই এলাকাটা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। তাই প্রচুর কয়লা বোঝাই ট্রাক চলাচল করে ওই রাস্তায়। তবে ওখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। সাইবেরিয়া বলতে আমাদের মনে যে দৃশ্য ভেসে ওঠে, সেটা ওখানেই রয়েছে।  

সফর চলাকালীন আপনি ‘উওম্যান বিয়ন্ড বাউন্ডারিজ’এর ফেসবুক পেজ’এ একাধিক ভিডিও আপলোড করেছিলেন। যার একটিতে, গাড়ি থেকে বেরতেই আপনার চোখের পাতায় বরফ জমে গিয়েছিল...।
(হাসি) ওখানে ঠিক কতটা ঠান্ডা, আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। ইট্‌স ব্রুটালি কোল্ড দেয়ার! ধরুন, ছবি তুলব বলে গাড়ি থেকে মাত্র চার মিনিটের জন্য নামলাম, তাতেই আমার আঙুল জমে গিয়ে ব্যথা শুরু হয়ে যেত। তারপরই আমাকে দৌড়ে গাড়িতে ঢুকে পড়তে হতো। ওখানে সারাদিনে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা সূর্যের আলো থাকে।   

গাড়ির ভিতর সব সময় হিটার চালিয়ে রাখতে হতো নিশ্চয়ই?
সব সময় গাড়ির ইঞ্জিন চালিয়ে রাখতে হতো। সফর শুরুর কয়েকদিন পর থেকেই আমার কাশি শুরু হয়েছিল। প্রথমে বুঝতে পারিনি কেন। পরে বুঝলাম, সারাক্ষণ ইঞ্জিন এবং হিটার চালিয়ে রাখায় গাড়ির ভিতরটা পুরোপুরি ড্রাই হয়ে গিয়েছিল। আর্দ্রতার লেশমাত্র ছিল না। প্রবল ঠান্ডায় গাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার গাড়িতে ফিরে আসা— তাপমাত্রার হঠাৎ তারতম্যের কারণে শারীরিক কিছু সমস্যা তো হতোই। 

সারাদিনে কতক্ষণ ড্রাইভ করতেন?
(একটু ভেবে...) অন্তত ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা।

সফরের প্রস্তুতিপর্বটা কেমন ছিল?
রুটম্যাপটা কেমন হবে, সেটা নিয়ে প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছিলাম। কোথায় রাত্রিবাস করব, বা পেট্রোল পাম্প থেকে গাড়ির জ্বালানি ভরব— সেটাও আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম। পাশাপাশি, ভাল গাড়ির খোঁজও শুরু করে দিয়েছিলাম। ওই রকম পরিবেশের চালানোর জন্য গাড়িতে কিছুটা মডিফিকেশন করার প্রয়োজন ছিল।

আপনি তো টয়োটা ল্যান্ডক্রুজারে সফর করেছিলেন?
হ্যাঁ। ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো। দিল্লিতে থাকার সময়ই আমি রাশিয়ায় ওই গাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম।

আপনি তো ওইমিয়াকনেও গিয়েছিলেন। পৃথিবীর শীতলতম জায়গা, যেখানে মানুষ বসবাস করে।
(হাসি) দ্য ড্রাইভ টু ওইমিয়াকন ওয়াজ রিয়েলি নাইস! বরফে ঢাকা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। উফ্‌ অসাধারণ! শীতকালে ওখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নেমে যায়। আমি ছাড়া ওখানে কোনও মহিলা ড্রাইভার আমার চোখে পড়েনি। আমিই প্রথম ভারতীয় যিনি ওই জায়গায় গিয়েছেন। 

গোটা সফরের সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা কোনটা?
ওয়হ্‌ তো রোজ থা ইয়ার, কেয়া বাতাউঁ (জোরে হাসি)!

ট্যুরে সব মিলিয়ে আপনার খরচ কত পড়ল?
সফরটা নাকি বড্ড বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কেউ আমাকে স্পনসর করতে চায়নি। তবে আমি জেদ ধরেছিলাম, যে যাবই! তাই ট্যুরের অনেকটা টাকাই নিজের পকেট থেকে দিতে হয়েছে। বাজারে অনেক ধারও হয়ে গিয়েছে। 

Nidhi Tiwari Travel
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -