SEND FEEDBACK

English
Bengali

বাহুবলীর এক হাজার সিঁড়ি বেয়ে বীরুর ৩০০ ক্লাবে

সুদীপ পাকড়াশী | ডিসেম্বর ২০, ২০১৬
Share it on
ছাত্রের রান ২৯৯। উত্তেজনায় টিভি অফ করে দিয়েছিলেন তিনি! শেষপর্যন্ত তাঁর অ্যাকাডেমির ছাত্ররা এসে বি শিবানন্দ’কে খবর দিলেন যে, হয়ে গিয়েছে স্যার।

ছাত্রের রান ২৯৯। উত্তেজনায় টিভি অফ করে দিয়েছিলেন তিনি! শেষপর্যন্ত তাঁর অ্যাকাডেমির ছাত্ররা এসে বি শিবানন্দ’কে খবর দিলেন যে, হয়ে গিয়েছে স্যার। 
হ্যাঁ, হয়ে গিয়েছে। শিবানন্দের ছাত্র করুণ নায়ারের ট্রিপল সেঞ্চুরি হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেটে বীরেন্দ্র সহবাগের পরে এই প্রথম আবার কেউ টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি পেলেন। তারও কিছুক্ষণ পর শিবানন্দ আরও রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিলেন। চেন্নাই থেকে করুণ নায়ারের ফোন পেয়ে! নায়ারের ছোটবেলার কোচ তিনি। এমন সাফল্যের দিনেও ছাত্র ভোলেননি গুরু’কে। রোমাঞ্চিত হওয়ারই তো কথা। 
সোমবার বেঙ্গালুরু থেকে করুণ নায়ারের শৈশবের কোচ শিবানন্দ ফোনে বলছিলেন, ‘‘গত বছর রঞ্জি ট্রফির ফাইনালেও ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছিল। তবে এত তাড়াতাড়ি টেস্টে তিনশো করে ফেলবে  ভাবিনি।’’ তারপরেই দ্রুত যোগ করলেন, ‘‘ওর মানসিকতা দেখে এটুকু বুঝতাম যে, সুযোগ পেলে বড় রান করবে। ছোট থেকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছে। তার ফল একদিন না একদিন পেতই।’’
৯ বছর বয়সে বেঙ্গালুরুর কোরমঙ্গলা অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলেন করুণ নায়ার। বেশ ভারী চেহারা ছিল তখন তাঁর। শিবানন্দের তাই মনে হয়েছিল ছাত্রকে প্রথমে একজন দক্ষ অ্যাথলিট তৈরি করতে হবে। প্রথম এক বছর করুণ’কে ব্যাটই ধরতে দেননি শিবানন্দ! তখন তাঁর ছাত্র প্রত্যেক দিন ৬ কিলোমিটার করে দৌড়তেন! আর নেটে বল করতেন। ‘‘এক বছর পর ২০০২ সালের ৬ জানুয়ারি প্রথম করুণের হাতে ব্যাট তুলে দিই,’’ বললেন শিবানন্দ।
তারিখটা ১২ বছর পরেও ভোলেননি করুণের শৈশবের কোচ। শিবানন্দ বলছেন, ‘‘আমি কপিল দেবের ভক্ত। ৬ জানুয়ারি কপিলের জন্মদিন। তাই সেই দিন ওর হাতে ব্যাট তুলে দিয়েছিলাম।’’ কিন্তু দশ বছরের করুণ’কে নাকি বল করতেন ২০ বছরের বোলাররা? এটা কি ঠিক?  শিবানন্দ বললেন, ‘‘হ্যাঁ ঠিক। আমারমনে হয়েছিল, ও তো সারাজীবন ছোটদের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট খেলবে না। বড়দের সঙ্গে খেলতেই হবে। সেই প্র্যাক্টিসটা দশ বছর বয়সে শুরু করে দিলে ক্ষতি কী?’’ 
শিবানন্দের পরিকল্পনা হয়তো ঠিকই ছিল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে অনূর্ধ্ব ১৯ জাতীয় টুর্নামেন্টে কর্নাটকের প্রতিনিধিত্ব করে ফেলেন করুণ। আরও আকর্ষণীয় তথ্য যে, নেটে ছাত্রকে তাঁর কোচ ব্যাট করাতেন মাত্র ২০ মিনিট!

শিবানন্দ বলছেন, ‘‘প্রথম ১৫ মিনিট স্পিনার আর মিডিয়াম পেসারদের বিরুদ্ধে ব্যাট করত। কিন্তু শেষ পাঁচ মিনিট ছিল ভয়ঙ্কর! সেই সময় অ্যাকাডেমির আটজন ২২ বছর বয়সী দ্রুতগতির বোলার ওকে বল করত।’’ দ্বিগুণ বয়সী বোলারদের উদ্দেশে কোচের কড়া নির্দেশ ছিল, প্রত্যেকটা বল যেন উইকেটে’র মধ্যে থাকে। যাতে ব্যাটসম্যানকে খেলতে হয়। 
শিবানন্দ এখনও ভোলেননি সেই দৃশ্য। বললেন, ‘‘প্রথম একমাস করুণ খুব ভয় পেত। বড়জোর ১২ বছর বয়স হবে তখন ওর। কিন্তু মাস দু’য়েক পর দেখতাম আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলছে পেসারদের। তখন নতুন নিয়ম চালু করেছিলাম ওর জন্য। পেসারদের বল স্ট্রেট ড্রাইভ মেরে অ্যাকাডেমির বাইরে পাঠালে ও আরও পাঁচ মিনিট বেশি ব্যাটিং করার সুযোগ পাবে।’’ 
সেই সময় অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত সচিন তেন্ডুলকর আর রাহুল দ্রাবিড়ের ব্যাটিংয়ের ভিডিও দেখতে শুরু করে দিয়েছেন সোমবারের ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ন। শিবানন্দের দাবি, করুণ ছোট থেকেই লড়াকু ছিলেন। না হলে ১৫ বছর বয়সে তাঁর নির্দেশে বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে ‘বাহুবলী’র মন্দিরে সপ্তাহে তিনদিন এক হাজার সিঁড়ি ওঠানামা করতেন কীভাবে! শিবানন্দ বললেন, ‘‘চেন্নাই টেস্টে প্রায় দশ ঘণ্টা ব্যাট করল করুণ। ওর শারীরিক সক্ষমতা তৈরি করার জন্য ছোটবেলা থেকেই কঠোর ট্রেনিং করিয়েছি।’’
তবে, গত জুলাইয়ে করুণের নৌকা দুর্ঘটনার কথা ভেবে এখনও কেঁপে ওঠেন শিবানন্দ। কেরলের পম্পা নদীতে ১০০জন যাত্রীকে নিয়ে একটি নৌকো হঠাৎ উল্টে গিয়েছিল। সাঁতার না জানা করুণও জলে পড়ে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকেরা নদীতে ঝাঁপিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। দু’জন যাত্রী মারা গিয়েছিলেন সেই দুর্ঘটনায়। যে ঘটনার কথা টেনে ট্রিপল সেঞ্চুরির নায়ক নিজেও সোমবার চেন্নাইয়ে বলেছেন, মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়ার পর আর ক্রিকেট মাঠে দাঁড়িয়ে ভয় পাওয়ার কোনও কারণই নেই। 
সোমবার ট্রিপল সেঞ্চুরির পর চেন্নাই থেকে ফোনে করুণ তাঁর শৈশবের কোচ’কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি কী উপহার চান ছাত্রের কাছে। শিবানন্দ বললেন, ‘‘ছেলেটা প্রত্যেক বছর আমাদের অ্যাকাডেমির জন্য অন্তত পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ টাকা খরচ করে! ছেলেদের ব্যাট-বল থেকে শুরু করে, নতুন নেট, ম্যাট— সমস্ত কিছু কেনার জন্য টাকা দেয়। ওর কাছে আর নতুন করে কী উপহারই বা চাইব?’’
শিবানন্দ যে বড়দিনের আগাম উপহারই পেয়ে গেলেন ছাত্রের কাছ থেকে। ৩০৩ নট আউট!

Karun Nair Sehwag Gayle
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -