SEND FEEDBACK

English
Bengali

নারদ ম্যাথু এবার জালিয়াতির জালে

জয়ন্ত মজুমদার | জুন ২৯, ২০১৬
Share it on
ব্ল্যাকমেলের পর জালিয়াতি। ‘নারদনিউজ ডটকমে’র সিইও ম্যাথু স্যামুয়েলকে বাঁধার জন্য কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের দ্বিতীয় রশি। কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল সূত্রের খবর তেমনই। যে খবর বলছে, ম্যাথু তাঁর নামে জাল ভোটার পরিচয়পত্র বার করেছিলেন।

ব্ল্যাকমেলের পর জালিয়াতি। ‘নারদনিউজ ডটকমে’র সিইও ম্যাথু স্যামুয়েলকে বাঁধার জন্য কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের দ্বিতীয় রশি। কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল সূত্রের খবর তেমনই। যে খবর বলছে, ম্যাথু তাঁর নামে জাল ভোটার পরিচয়পত্র বার করেছিলেন। যার সূত্রে তদন্তকারীদের দাবি, গোপন ক্যামেরা অভিযানে নেমে ম্যাথু শুধুমাত্র ষড়যন্ত্র করেননি। ষড়যন্ত্র করতে গিয়ে জালিয়াতিও করেছেন। সেই জালিয়াতির অঙ্গ হিসাবেই তিনি সরকারি নথি (ভোটার পরিচয়পত্র) জাল করেছেন।
তদন্তকারীদের বক্তব্য, ‘ব্ল্যাকমেল তত্ত্ব’ প্রতিষ্ঠার জন্য ম্যাথুর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ আগেই হাতে এসেছিল। ভোটার পরিচয়পত্র জাল করার বিষয়টি সদ্য তাঁদের                    হাতে এসেছে। 
পুলিশ সূত্রের খবর, কলকাতায় হোটেলে থাকা এবং শহরে আসা-যাওয়ার বিমানের টিকিটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং ট্রাভেল এজেন্টদের থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তাতেই দেখা যাচ্ছে, ম্যাথু নিজের ‘পরিচয়পত্র’ হিসাবে দু’টি জাল ভোটার কার্ড ব্যবহার করেছেন। ব্যবহার করেছেন জাল ড্রাইভিং লাইসেন্সও। তা-ও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। যে জাল ভোটার কার্ড ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের নথি তাঁরা পেয়েছেন, সেগুলি বানানো হয়েছে দু’টি অন্য রাজ্য থেকে। জাল নথিগুলির প্রতিলিপিও আটক করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য, ম্যাথুর বিরুদ্ধে জাল সরকারি নথি ব্যবহারের যে প্রমাণ হাতে এসেছে, তার ভিত্তিতে এখনই তাঁকে জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করা যেতে পারে। কিন্তু তাঁরা সেই পথে হাঁটতে চান না। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য, ম্যাথুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণ করা। সেই কারণেই ম্যাথুকে লালবাজারে তলব করা হয়েছে। ম্যাথুর বিরুদ্ধে যে ‘তথ্যপ্রমাণ’ পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির ব্যাপারে আগে তাঁর বক্তব্য শুনতে চায় পুলিশ। ম্যাথু ‘সন্তোষজনক’ উত্তর দিতে না-পারলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হবে। ম্যাথু লালবাজারে হাজির হলে তাঁর জেরা পর্বের ভিডিও রেকর্ডিংও করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে তিনি তাঁর বক্তব্য নিয়ে অন্য দাবি করতে না পারেন বা বক্তব্য বদলাতে না-পারেন।
তবে ভুয়ো ভোটার কার্ড ব্যবহারের কথা ম্যাথু নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে তার পিছনে তাঁর যুক্তিও দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘‘নারদ এক্স ফাইলসে আমি ম্যাথু স্যামুয়েলের পরিচয় দিয়ে গোপন ক্যামেরা অভিযান করিনি। সেখানে আমার পরিচয় ছিল সন্তোষ শঙ্করণ। তা বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে আমাকে ভুয়ো ভোটার কার্ড ব্যবহার করতেই হতো। এটা গোপন ক্যামেরা অভিযান! যেখানে সাংবাদিককে ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ নিতে হয়েছিল। আসল পরিচয় দিলে তো আমি প্রথমদিনই ধরা পড়ে যেতাম!’’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘অপারেশন ওয়েস্ট এন্ডের সময় আমি ম্যাথু স্যামুয়েল পরিচয়েই গোপন ক্যামেরা অভিযান করেছিলাম। কিন্তু তখন কেউ আমাকে কেউ চিনতেন না। আমি জনপ্রিয়ও ছিলাম না। এখানে তা করলে কয়েক সেকেন্ডে আমার নাম-গোত্র-পরিচয় বেরিয়ে যেত। সেটা খুব ঝুঁকির হতো।’’ 
বস্তুত, যে কোনও সাংবাদিকই গোপন ক্যামেরা অভিযান চালানোর সময় নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখেন। এমন ধরনের অভিযানে সেটাই দস্তুর। ম্যাথুও পরিচয় গোপন রাখতেই যা করার করেছিলেন।  এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতের সময় ভুয়ো নথি দিয়ে টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু তদন্তকারীরা সেই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁদের পাল্টা বক্তব্য, পরিচয় গোপন রাখতে অন্য কোনও পন্থা অবলম্বন করতে পারতেন ম্যাথু। নিজের ছবি লাগিয়ে সরকারি নথি জাল করা ‘গুরুতর অপরাধ’। সরকারি নথি জাল করে গোপনীয়তার আশ্রয় নেওয়ার পর কেউ অপরাধ করে অন্যত্র (এমনকী, দেশ ছেড়েও) পালালে তাঁকে ধরার ক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়তে হয়। জঙ্গি গোষ্ঠীর লোকজন নাশকতা করার জন্য জাল নথি ব্যবহার করে বিভিন্ন শহরের হোটেল বা লজে ওঠে। পরে তা জানতে পারলেও জাল নথি জমা দেওয়ায় সেসব জঙ্গিদের খোঁজ পাওয়া কঠিন হয়। 
এক গোয়েন্দাকর্তা জানিয়েছেন, ষড়যন্ত্রের তদন্তে নেমে তাঁরা জানতে পারেন, গত ১৪ মার্চ গোপন ক্যামেরায় তোলা ভিডিও ফুটেজ প্রকাশের ঠিক একমাস আগে ম্যাথু কলকাতায় এসে পার্ক স্ট্রিট লাগোয়া একটি হোটেলে চার ঘণ্টা ছিলেন। তার পরেও আরও কয়েক ঘণ্টা তিনি শহরে কাটিয়েছিলেন। যা ম্যাথুর মোবাইল ফোনের ‘কল ডিটেল্‌স’ খতিয়ে দেখে জানা গিয়েছে। পুলিশের কাছে খবর, ব্ল্যাকমেল করে বিভিন্ন লোকের কাছে টাকা তুলতেই ম্যাথু গত ফেব্রুয়ারি মাসে শহরে এসেছিলেন। তবে ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে গোপন ক্যামেরা অভিযান চালানোর সময় এবং তার আগে ম্যাথু দু’বার শহরে এসে থেকেছিলেন। 
প্রসঙ্গত, ম্যাথু নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি পরিচয় গোপন রাখতে ‘ইমপেক্স কনসালটেন্সি সলিউশন’ নামে একটি কোম্পানি তৈরি করেন। নিজেকে সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট সন্তোষ শঙ্করণ হিসাবে পরিচয় দিয়ে চেন্নাইয়ে একটি অফিসও নেন। সংস্থার একটি ল্যান্ডলাইন, মোবাইল এবং ওয়েবসাইটও ছিল। [email protected] নামে একটি ইমেল আইডি-ও খুলেছিলেন ম্যাথু। এছাড়া, একটি ‘লিঙ্কড্‌ ইন’ প্রোফাইলও ছিল তাঁর। সংস্থায় একজন রিসেপশনিস্ট রাখা হয়েছিল। ল্যান্ডলাইনে যাবতীয় ফোন তিনিই ধরতেন। গোপন ক্যামেরা অভিযানের পর ল্যান্ডলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মোবাইলের সিমকার্ডও নষ্ট করে ফেলা হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে ম্যাথুর প্রতিক্রিয়া, ‘‘আসলে ওরা (কলকাতা পুলিশ) যেন তেন প্রকারে আমার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে চাইছে। এসব ছেঁদো তথ্যপ্রমাণ আইনের চোখে কল্কে পাবে না। সত্য উদ্ঘাটনে সাংবাদিকতার ধর্ম মেনেই আমি কাজ করেছি। ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আর্থিক উদ্দেশ্যসাধনে নয়। ওই অভিযান ছিল মা-মাটি-মানুষের স্বার্থে!’’ 
সোমবার ম্যাথু ইমেল করে লালবাজারের সমনের জবাব দেওয়ার পর এদিন গোয়েন্দাকর্তারা আইনি পরামর্শ নেওয়া শুরু করেছেন। সূত্রের খবর, দু’একদিনের মধ্যেই লালবাজার থেকে ম্যাথুকে ফোনে অথবা ইমেল করে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানতে চাওয়া হবে, তিনি দ্বিতীয় সমনটি কীভাবে পেতে চান। সেইমতো ক্যুরিয়র, ফ্যাক্স অথবা বিশেষ দূত মারফত সমন পাঠানো হবে। তবে এবার সমনের বয়ানের কিছু পরিবর্তন হতে পারে। এদিন যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ দমন) বিশাল গর্গও বলেছেন, ‘‘আমরা আইনি পরামর্শ নিচ্ছি। ফের সমন করা হতে পারে ম্যাথুকে।’’ 

 

Mathew Samuels Narada Rajib Kumar
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -