SEND FEEDBACK

English
Bengali

শান্তির শপথ

মোহিত রণদীপ | মে ২৬, ২০১৬
Share it on
দ্বিতীয়বার রাজ্যের অভিভাবকত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার আশু জরুরি শান্তি ফেরানো। অশান্তির মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন মোহিত রণদীপ

মনে হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠিন হাতে তাঁর দলের রাশ ধরতে চাইছেন। বিপুল জনসমর্থনে তাঁর দল ফের ক্ষমতায়। তবে দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি করতে না-পারলে তার মাসুল গুনতে হয় রাজ্যবাসীকে এবং দলকেও। 
রাজ্য খুব শান্তিতে আছে, এ কথা বললে অনৃতভাষ হয়। সিন্ডিকেট-রাজ থেকে নানা কিসিমের হিংসায় জর্জরিত রাজ্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ডিকেট নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আশা করা যায়, নতুন সরকার সর্বগ্রাসী হিংসা নিয়েও ভাববে। ভাবনাটি খুব জরুরি। কারণ, রাজ্যের দিকে দিকে সন্ত্রাসের গরম হাওয়া। তাতে বিরোধীর ঘর পুড়ছে। উঠোন জ্বলছে। রক্ত ঝরছে। রক্ত ঝরছে শাসকদলের কর্মীদেরও। এসবের উৎস ক্ষমতার এক উৎকট প্রবণতা, যা ঘুরেফিরে ভুল পথেই পরিচালিত করে। মানুষের স্বাভাবিক যাপন আশা করে, জীবনে শান্তি থাকবে। আশা করে, প্রশাসন শান্তিরক্ষায় প্রকৃত রাজধর্ম পালন করবে।

কেন এই অশান্তি? এ বোধ হয় এক অবধারিত ভবিতব্যের দিকেই পথ হাঁটা। উনিশ শতকের শেষার্ধে ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও নীতিবিশেষজ্ঞ লর্ড অ্যাক্টন বলেছিলেন, ক্ষমতার প্রবণতাই দুর্নীতির দিকে ধাবিত হওয়া। একচ্ছত্র ক্ষমতা একচ্ছত্র দুর্নীতির জন্ম দেয়। লক্ষ করা গিয়েছে, ক্ষমতাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের নৈতিকতার বোধ ক্রমশ কমতে শুরু করে। ক্ষমতা মনের মধ্যে জন্ম দেয় দম্ভের। সেই দম্ভ থেকেই মানুষ হারাতে থাকেন ন্যায়-অন্যায়ের বোধ। সুনীতি ও দুর্নীতির পার্থক্য তখন অস্পষ্ট হয়ে যায়। যে কোনও প্রকারে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা আর ক্ষমতার পরিধিকে প্রসারিত করাই তখন লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ক্ষমতাশালীর অহমিকা ভিন্নমতকে অগ্রাহ্য করার মানসিকতার জন্ম দেয়। তুচ্ছ হয়ে যায় সততা, অহিংসা, সহমর্মিতার মতো মানবিক বোধ। গুরুত্ব হারায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার মতো বৃহত্তর দায়বদ্ধতা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার ২১১টি আসন পেয়ে ক্ষমতায়। প্রায় একা লড়ে এই জয় তিনি ছিনিয়ে এনেছেন। প্রমাণ করে দিয়েছেন, মানুষ তাঁর সঙ্গে আছেন। কিন্তু কঠিন লড়াইয়ের শেষে যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এসেছে, তা মাথা ঘুরিয়ে দেবে না তো? যেমন দেখা গিয়েছিল ২০০৬ সালে? বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের বিপুল জয়ের পর সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণে বিরোধীদলের আপত্তি তুড়ি মেরে উড়িয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ‘আমরা-ওরা’র তত্ত্ব আমদানি করেছিলেন। সেই তত্ত্বে প্রকাশ পেয়েছিল ক্ষমতার দম্ভই। তার পাঁচ বছরের মধ্যেই দেখা গিয়েছে, বাংলার মানুষ বামেদের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিপুল সমর্থনে বিজয়ী তৃণমূলের এক শ্রেণির নেতানেত্রীও এখন সেই একই ভাষায় কথা বলছেন। সে ভাষা ক্ষমতার ভাষা, দম্ভের ভাষা। ‘দেখে নেব’, ‘চড়াম চড়াম ঢাক বাজবে’, ‘বদলা চাই’ জাতীয় শব্দবন্ধ যে মোটেই গণতান্ত্রিক নয়, তা ইতিহাস জানে। ক্ষমতায় আসীন হয়ে শাসকদল যদি এই ভাষা, এই ভাব নিয়ন্ত্রণ করতে না-পারে, তবে তা রাজ্যবাসীকে বিপন্নই করবে। একদা ‘খুব সিপিএম’ এবং অধুনা ‘খুব তৃণমূল’ এক কবি রাজ্যের বিরোধীদের সম্পর্কে লিখলেন, ‘৩০১৬-তেও ওরা আর ফিরবে না’। এ তাঁর নিজের ভাবনা। হয়তো ফিরবে না। কিংবা ফিরবে। কিন্তু কবির ভাবনাটির মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে দম্ভই। আশা করা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই দম্ভ থেকে তাঁর কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের সরিয়ে আনবেন। নীরব থাকবেন না। মনে পড়ে যায়, 
২০১১-য় তাঁর নির্দেশিকার কথা— ‘বদলা নয়, বদল চাই’ এবং ‘বিজয়োৎসবে সর্বত্র বাজবে রবীন্দ্রসংগীত’। সেবার হয়েছিল। এবারও তাই হচ্ছে না কেন? 

লর্ড অ্যাক্টনের ক্ষমতা সম্পর্কিত সেই উক্তির তাৎপর্য নিয়ে গবেষণা করেছিলেন বিশিষ্ট দুই মনোবিদ— ল্যামার ও গ্যালিনস্কি। ওঁদের গবেষণায় অ্যাক্টনের উক্তির মনোবৈজ্ঞানিক সত্যতা প্রমাণিত হয়েছিল। ওঁরা এর সঙ্গে অন্য একটি কথা যোগ করেছিলেন— ক্ষমতা যে দুর্নীতি ডেকে আনে, তা সত্য। বিশেষ করে ডেকে আনে তাঁদেরই মনের মধ্যে, যাঁরা মনে করেন, তাঁরা ক্ষমতাবান। আবু ঘ্রাইবে ইরাকি বন্দিদের উপর মার্কিন সেনার অত্যাচারের প্রেক্ষিতে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্বের গবেষক ফিলিপ জি জিমবার্দোর অভিমত ছিল— বন্দিদের প্রতি সেনার আচরণ কেমন হবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশিকা না-থাকার অর্থ, সেনার হিংসাত্মক আচরণকেই ছাড়পত্র দেওয়া ! 
আমাদের রাজ্যের প্রশাসন অনুগ্রহ করে জিমবার্দোর অভিমতটি অনুধাবন করুন। শান্তিপ্রতিষ্ঠাই এই মুহূর্তে সব চেয়ে বড় শপথ।

আমাদের দেশের সংবিধানে ভিন্নমতের, ভিন্নস্বরের অধিকার স্বীকৃত। এই অধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত। সেই শর্ত সম্পর্কে উদাসীনতা শুধু পরাজিত বিরোধীদেরই নয়, শাসকের কাছেও বিপজ্জনক। ইতিহাস থেমে থাকে না। তার পুনরাবর্তন ঘটে। ১৯৭২ থেকে ’৭৭ সাল— এই পর্বের সন্ত্রাসের সেইসব দিনগুলি-রাতগুলি মনে রাখলে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার গণতন্ত্র প্রসারে উদ্যোগী হতো। মনে রাখেনি বামেরা। ভুল করেছিল। বামেদের অনেক ভুল থেকেই শিক্ষা নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আশা করা যায়, এই ভুল থেকেও শিক্ষা নেবেন। তা সম্ভব হলে শুধু ভোটের জয় নয়, নৈতিকতার জয়ও নিশ্চিত হবে। 

■ কিছু আলোর রেখা অবশ্যই রয়েছে। যেখানে শাসকদলের স্থানীয় নেতৃত্বের উদ্যোগে কুমারিয়ায় বিরোধীদলের সঙ্গে সম্প্রীতির জোট গড়ে ওঠে। কালনায় বিরোধীদলের কার্যালয়ে ভাঙচুরের পর শাসকদলের স্থানীয় নেতা নতুন করে কার্যালয় গড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ইলামবাজারে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব শান্তি বজায় রাখতে ছাপানো লিফলেট বিলি করেন। এসবই দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। তবে এই দৃষ্টান্তগুলো বড় বেশি স্থানিক। বরং ভরকেন্দ্র থেকেই উচ্চারিত হোক শান্তিমন্ত্র।

(লেখক বিশিষ্ট মন-সমাজবিদ।
মতামত নিজস্ব।)

Mamata Banerjee TMC CPM Congress
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -