SEND FEEDBACK

English
Bengali

রাজীব কুমার বনাম নারদ কুমার

নিজস্ব সংবাদদাতা | জুন ১৯, ২০১৬
Share it on
নবান্ন থেকে তদন্তের অভিমুখ ঠিক করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। ‘চক্রান্তের’ কথা বলে দিয়েছেন। তাই কলকাতা পুলিশও মোটামুটি ঠিক করে নিয়েছে, ওই তদন্তে এবার ‘নিশানা’ করা হবে ‘নারদনিউজ ডটকমে’র সিইও ম্যাথুকে।

তদন্তের স্বার্থে রাজীব কুমার তাঁকে লালবাজারে ডেকে পাঠালে তিনি আসবেন? জবাবে শনিবেলায় ম্যাথু ‘নারদ’ স্যামুয়েল লিখলেন, ‘বিষয়টা আদালতের বিচারাধীন। আমি হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষা করছি’। 
কিন্তু হাইকোর্টের রায় বেরনোর আগেই যদি তাঁকে তলব করা হয়?লিখিত জবাব এল, ‘আমি এখন দেশে নেই’। 
অস্যার্থ, কলকাতায় আসার কোনও পরিকল্পনা তাঁর নেই। 
কিন্তু কলকাতা পুলিশের কমিশনার কি ‘নারদ’কে তদন্তের জন্য ডেকে পাঠাবেন? 
শনিবেলায় রাজীবের ঘনিষ্ঠমহল জানাচ্ছে, পাঠাতেই পারেন। তদন্তের স্বার্থে যে কাউকে ডেকে পাঠানো যায়। বস্তুত, সে তোড়জোড় শুরুও হয়ে গিয়েছে। 
অর্থাৎ, খেলা জমে গিয়েছে। নারদ-নারদ! 
নবান্ন থেকে তদন্তের অভিমুখ ঠিক করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। ‘চক্রান্তের’ কথা বলে দিয়েছেন। তাই কলকাতা পুলিশও মোটামুটি ঠিক করে নিয়েছে, ওই তদন্তে এবার ‘নিশানা’ করা হবে ‘নারদনিউজ ডটকমে’র সিইও ম্যাথুকে। শুক্রবার সন্ধ্যায় সরকারি আদেশ লালবাজারে পৌঁছতেই ওই তদন্তে কীভাবে ম্যাথুর বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের জাল’ বিছানো যায়, তার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। যার প্রথম ধাপ হল— শনিবারই জনৈক ব্যক্তি নিউ মার্কেট থানায় নারদ-কাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ নিয়ে ‘অজ্ঞাতপরিচয়ে’র বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। তার ভিত্তিতে পুলিশ একটি মামলা রুজু করেছে। এবার সেই মামলায় ‘অনুসন্ধান শুরু হবে। 
লালবাজারের এক কর্তার বক্তব্য, ‘অনুসন্ধান’ই (এনকোয়ারি) হোক বা ‘তদন্ত’ (ইনভেস্টিগেশন)— ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে পুলিশ কাউকে সমন পাঠাতে পারে জেরা করা এবং বয়ান নেওয়ার জন্য। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হাজিরা দিতে বাধ্য! তবে তিনি আইনজীবী মারফত জানতে চাইতে পারেন, কী কারণে তাঁকে ডাকা হয়েছে। ম্যাথুর আইনজীবী যেমন জানাতে পারেন, নারদ-কাণ্ড এখন বিচারাধীন। তাই তাঁর মক্কেল যেতে বাধ্য নন। হাজিরা না দিলে কী হতে পারে, তা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যও জানতে চাইতে পারেন তিনি। পুলিশের জবাব পেলে সেটি তিনি উচ্চ আদালতে পেশ করে বলতে পারেন, বয়ান নেওয়ার জন্য তাঁকে পুলিশ ডেকেছে। তিনি যেতে ‘বাধ্য’ কি না, তা আদালতই ঠিক করে দিক। তবে সেক্ষেত্রে উচ্চ আদালত যে আদেশ দেবে, তা মানতে বাধ্য থাকবেন ম্যাথু।
লালবাজার সূত্রের খবর, ‘অনুসন্ধানে’র পর রাজ্য সরকারের কাছে কলকাতা পুলিশ রিপোর্ট পাঠাবে। তাতে ম্যাথুর বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রে’র অভিযোগ আনলে সরকার তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে পুলিশই ‘স্বতঃপ্রণোদিতভাবে’ এফআইআর দায়ের করে অভিযুক্ত হিসাবে ম্যাথুকে ডেকে পাঠাতে পারে বা গ্রেফতার করে তদন্ত চালাতে পারে। 
পুলিশ সূত্রের খবর, ওই মামলার তদন্ত করবে গোয়েন্দা বিভাগ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না-হলেও জালিয়াতি দমন শাখাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। যে শাখা কলকাতা বন্দরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান রাজপাল সিংহ কাহালোঁর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত করছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখবেন, ২০১৪ সালে গোপন ক্যামেরায় তোলা তৃণমুলের নেতা-মন্ত্রী-সাংসদদের টাকা নেওয়ার ছবি কেন দু’বছর পর প্রকাশ করা হয়েছে। দু’বছর আগে কেন ওই গোপন ক্যামেরার ছবি তোলার জন্য প্রায় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল? টাকার উৎস কী? টাকার পিছনে বিদেশি হাত রয়েছে কি না। গত মার্চ মাসে অভিযানের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশের পর ম্যাথু দেশবিদেশে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তা ও খতিয়ে দেখবেন তদন্তকারীরা। ফুটেজ প্রকাশের আগে ম্যাথু কাউকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করেছিলেন কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আসবে (প্রসঙ্গত, এদিন নেতাজি ইন্ডোরের সভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতাও ‘ব্ল্যাকমেলে’র কথা বলেছেন)।
অভিজ্ঞ অফিসারদের মতে, ষড়যন্ত্রের মামলা হয় কোনও একটি অপরাধকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে ম্যাথুকে ‘অভিযুক্ত’ হিসাবে চিহ্নিত করতে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগকে ‘প্রতিষ্ঠা’ করতে হবে। কিন্তু ভারতীয় দণ্ডবিধির ঘুষ নেওয়া (১৬১) এবং ঘুষ দেওয়ার (১৬১এ) ধারা দু’টি অধুনা বিলুপ্ত। এখন ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতিদমন আইনে (প্রিভেনশন অফ করাপশন অ্যাক্ট) মামলা হয়। সেগুলি হয় মূলত সরকারী কর্মচারী বা সরকারের বেতনভুকদের বিরুদ্ধে। বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয় না। সিবিআইয়ের দুর্নীতিদমন শাখা আকছার কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী বা আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে মামলা করে। তারা অভিযোগকারীকে ‘টোপ’ হিসাবে ব্যবহার করলেও কখনওই তাঁদের বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার জন্য মামলা করে না। বরং অভিযোগকারীকে আদালতে প্রধান সাক্ষ্য হিসাবে পেশ করে। 
ম্যাথু নিজে এখনও হাইকোর্টের কথাই বলছেন। তবে হাইকোর্টের বিচারপতি এবং আইনজীবীদের একাংশের মতে, ফুটেজের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি হাইকোর্টের বিচারাধীন হলেও রাজ্য সরকার তদন্তের নির্দেশ দিতেই পারে। তাতে কোনও আইনি বাধা নেই। তদন্তের নির্দেশ নিয়েও আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। 
আদালতের একটি সূত্রের খবর, ফুটেজের সত্যতা যাচাই সংক্রান্ত ফরেন্সিক রিপোর্ট প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুরের কাছে জমা পড়েছে। তবে আদালতের নথিতে এখনও পর্যন্ত তার কোনও উল্লেখ নেই। প্রসঙ্গত, বন্ধ খামে ফরেন্সিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একমাত্র প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চই রিপোর্টটি দেখবেন বলে জানানো হয়েছিল। রিপোর্ট দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ করবে আদালত। গত ১০ জুন হাইকোর্টে নারদ-মামলার শুনানি থাকলেও তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে হাইকোর্টেরই অন্য একটি সূত্রের দাবি, ওই রিপোর্ট এখনও জমা পড়েনি। 
রাজীবের তদন্তের সঙ্গে হাইকোর্টের মামলা বা লোকসভার নীতি (এথিক্স) কমিটির প্রক্রিয়ার কোনও দ্বন্দ্ব নেই বলেই মনে করছে সরকার। কারণ, লোকসভার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ‘সিভিল’। আর আদালত নিজে তদন্ত করে না। বড়জোর তদন্তের নির্দেশ দেয় বা তদন্তে নজরদারি করে। রাজীবকে তদন্ত শেষের জন্য কোনও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে বিরোধীদের বক্তব্য, রাজীব এসব ক্ষেত্রে ধরে আনতে বললে বেঁধে আনেন! ফলে অচিরেই ম্যাথুকে কলকাতা পুলিশের সদর দফতরে ঢুকতে দেখলে খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। 
খেলা অতএব, জমে গিয়েছে। নারদ-নারদ! 

Rajib Kumar Mathew Samuels Narada
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -