SEND FEEDBACK

English
Bengali

শুক্রবেলার রেড রোড ‘মমতা-সরণি’। রোদে শপথ-সঙ্গী জনতা

দেবাশিস ঘড়াই | মে ২৮, ২০১৬
Share it on
রেড রোডে শপথ অনুষ্ঠান তখনও শুরু হয়নি। ভিড় জমতে শুরু করেছে। বৃদ্ধ পুস্তকবিক্রেতার অদূরেই সবুজ পাঞ্জাবি পরে জয়ধ্বনি দিচ্ছিলেন একদল যুবক। কপালে সবুজ আবির। তাঁদের চিৎকার। সঙ্গে রাস্তার দু’পাশের ল্যাম্পপোস্টে লাগানো মাইকে যন্ত্রানুষঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত। উপস্থিত মানুষের কোলাহল। সবমিলিয়ে অদ্ভুত এক ‘ক্যাকোফোনি’ দুপুরের রেড রোডে।

রাস্তায় পাতা প্লাস্টিকের উপর জড়ো করে রাখা বই। পিছনে ব্যানার ঝুলছে— ‘জঙ্গলমহল বুক স্টোর’। তার নীচে একটু মোটা হরফে, ‘এখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত সব বই পাওয়া যায়’। শুক্রবার বেলা সওয়া ১১টা নাগাদ বৃদ্ধ বইবিক্রেতা বলছিলেন, ‘‘জঙ্গলমহল থেকে এসেছি। না-এসে কি আর থাকতে পারি!’’ 
রেড রোডে শপথ অনুষ্ঠান তখনও শুরু হয়নি। ভিড় জমতে শুরু করেছে। বৃদ্ধ পুস্তকবিক্রেতার অদূরেই সবুজ পাঞ্জাবি পরে জয়ধ্বনি দিচ্ছিলেন একদল যুবক। কপালে সবুজ আবির। তাঁদের চিৎকার। সঙ্গে রাস্তার দু’পাশের ল্যাম্পপোস্টে লাগানো মাইকে যন্ত্রানুষঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত। উপস্থিত মানুষের কোলাহল। সবমিলিয়ে অদ্ভুত এক ‘ক্যাকোফোনি’ দুপুরের রেড রোডে।
নাকি ওটা রেড রোড নয়? আসলে ‘মমতা-সরণি’?
নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর মমতার ছবি, কাট আউট, ব্যানার। মমতার সঙ্গে জনতা। চলচ্চিত্র উৎসবকে যে দক্ষতায় ‘নন্দন’ থেকে টেনে বার করে নেতাজি ইন্ডোরে এনে তাকে ‘জনতার উৎসব’ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা, দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে সেই একই অনুভবে তিনি রাজভবনের ঘেরাটোপ থেকে শপথ অনুষ্ঠানকে নিয়ে এসেছিলেন রেড রোডে। যার পোশাকি নাম ইন্দিরা গাঁধী সরণি (ঘটনাচক্রে, এদিন ইন্দিরার নাতি রাহুল গাঁধী টুইট করে মমতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন)। যাতে শপথ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে কোনও বাধা না-থাকে। রইলও না। 
হতে পারে গনগনে সূর্য মধ্যদিনের প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিল অভ্যাগতদের মাথার উপর। হতে পারে আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯১ শতাংশ (যা ‘অস্বস্তিসূচক’ বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ)। 
হতে পারে রাজ্যের কোনও বিরোধীদলই এদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। হতে পারে প্রবল গরমে দর্শকাসনের প্রথম সারিতে বসে কুলকুল করে ঘামলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, সঞ্জীব গোয়েন্‌কা, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তেরা। হতে পারে রোদ এবং গরমে জ্ঞানই হারিয়ে ফেলেছিলেন কলকাতা পুরসভার ১০ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান প্রবীণ তপন দাশগুপ্ত এবং ৯৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর মিতালি বন্দ্যোপাধ্যায়। হতে পারে অনেকে ছাতাই খুলে ফেলেছিলেন। অনেকে হাতপাখা বানিয়েছিলেন হাতের আমন্ত্রণপত্রকে। কিন্তু তাঁরা শেষপর্যন্ত ভগ্নাংশই। তাঁদের বাইরের জনতাই মমতার আসল ‘মা-মাটি-মানুষ’। যাদের জন্য তিনি এদিন নবান্নে দ্বিতীয়বার পা রাখলেন। তীব্র গরমে যাঁরা দর্শকাসনের প্রচুর চেয়ার ফাঁকা রেখে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তার দু’পাশে গাছের ছায়ার তলায়। 
মমতা বিলক্ষণ জানতেন, অত গরমে টানা বেশিক্ষণ অনুষ্ঠান চালানো যাবে না। ফলে ২৫ মিনিটের মধ্যে গোটা বিষয়টা শেষ করে ফেলেছেন। যে কারণে এই প্রথম মন্ত্রীরা শপথ নিলেন পাঁচজনের ঝাঁকে-ঝাঁকে। এক ঝলকে মনে হচ্ছিল, মহাষ্টমীর অঞ্জলি হচ্ছে। রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর বলা ‘আমি’ এবং তারপরে হবু মন্ত্রীদের নিজেদের নামোচ্চারণ ছাড়া বাকি কিছু বোঝা যায়নি। কিছু সময় ধরে বিভিন্ন রকমের পরদায় বাঁধা গলার গুঞ্জন। হরেক উচ্চারণ। বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষা। কিন্তু তাতেই বা কী? শপথবাক্য পাঠ তো স্রেফ ঔপচারিকতা। ভেবে দেখুন, যদি ৪১ জন মন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর মতো আলাদা এবং একা শপথ নিতেন একে-একে? 
শপথ এবং স্বাক্ষরের জন্য ন্যূনতম দেড়মিনিট করে বরাদ্দ থাকলেও অনুষ্ঠান একঘণ্টা পেরিয়ে যেত। হয়তো আরও মানুষ অসুস্থ হতেন। হয়তো অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যেতেন। 
মমতা তা বুঝতে পেরেছিলেন। যেমন ‘স্পন্দন’ তিনি বুঝে থাকেন। যে জনতা অভিনব শপথের দৃশ্য মোবাইল ক্যামেরায় ধরে রাখতে উৎসাহী হয়ে পড়ল। 
কাঁটায়-কাঁটায় দুপুর পৌনে ১টায় শপথ নেন মমতা। তারপরে তাঁর সহকর্মী মন্ত্রীরা। পাশের ভিভিআইপি আসনে তখন বসে রয়েছেন দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ জেটলি ও বাবুল সুপ্রিয়, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোগবে, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এবং আরজেডি প্রধান লালুপ্রসাদ, জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা, ডিএমকে নেত্রী তথা করুণানিধি-কন্যা কানিমোঝি-সহ অভ্যাগতেরা।
মন্ত্রীরা যে ক্রমপর্যায়ে শপথ নিয়েছেন, তার মধ্যেও আলাদা ‘ইঙ্গিত’ লক্ষ করেছেন শাসকদলের বিভিন্ন নেতা-কর্মী। প্রবীণ অমিত মিত্র, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায় যেমন একসঙ্গে শপথ নিয়েছেন, তেমনই একসঙ্গে শপথবাক্য পাঠ করেছেন তরুণ ব্রিগেডের ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, শোভন চট্টোপাধ্যায়। সওয়া ১টার মধ্যেই শপথগ্রহণের অনুষ্ঠান শেষ। ততক্ষণে শপথ নিয়ে মঞ্চেই মমতার পা ছুঁয়ে প্রণাম সেরে মন্ত্রী হয়ে গিয়েছেন অধিকাংশ। 
অনেকে বলছিলেন বটে, পাঁচবছর আগে আবেগ এবং উচ্ছ্বাস ছিল। এদিন তা ছিল না। তবে এদিন ছিল পেশাদারি দক্ষতা। বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে অনুষ্ঠান সাজিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তারা ব্যবস্থাপনায় কসুর করেনি। রেড রোডের প্রায় আধ কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার দু’পাশের ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা ৮০টি মাইক, শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেখার জন্য ৩০টি বিশাল এলইডি স্ক্রিন। পানীয় জলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ভিড় বা গরমে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে আপৎকালীন ব্যবস্থাও। 
একদিকে মঞ্চাসীন রাজনৈতিক ওজনদারেরা। অন্যদিকে, মঞ্চের নীচে শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, খেলোয়াড় থেকে শুরু করে টলিউডের মেগা-প্রযোজক প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতার সাংগঠনিক দক্ষতায় জড়ো হওয়া বাহিনী। যেখানে রাজ চক্রবর্তী, দীপঙ্কর দে থেকে শুরু করে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, কোয়েল মল্লিক, নিসপাল সিংহেরা হাজির। তৃণমূলের সাংসদ অভিনেতা দেব এবং বিধানসভা ভোটে প্রার্থী-হওয়া সোহম তো ছিলেনই। এসেছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মিঠুন চক্রবর্তীর স্ত্রী যোগিতাবালি এবং তাঁর পুত্রও। এসেছিলেন মোর্চা-নেতা বিমল গুরুঙ্গ। সঙ্গী রোশন গিরি।
শপথ অনুষ্ঠানের শেষে ভিতরের শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বিশাল ঘরে চা-চক্র। সেখানে রাজনীতিকদের মধ্যে আলাপচারিতা এবং কিঞ্চিৎ আড্ডা হল। তারপরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা রওনা হলেন নবান্নের দিকে। তখনও তাঁর হ্যাচব্যাকের চাকায় জড়িয়ে যাচ্ছে মাটি এবং মানুষ!

Red Road Mamata banerjee TMC Oath
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -