SEND FEEDBACK

English
Bengali

নারদকে ঘেরা হচ্ছে ব্ল্যাকমেলে

জয়ন্ত মজুমদার ও সৌরভ দত্ত | জুন ২২, ২০১৬
Share it on
শেষপর্যন্ত ব্ল্যাকমেল তত্ত্বেই ‘নারদনিউজ ডটকমে’র সিইও ম্যাথু স্যামুয়েলকে ঘিরতে চাইছে রাজ্য সরকার। মঙ্গলবারের খবর, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের অধীনে নারদ-কাণ্ডের তদন্তের গতিপ্রকৃতি সেদিকেই এগোচ্ছে। গোয়েন্দারা আপাতত ‘তৎপর’ ম্যাথুর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেলের তত্ত্ব প্রমাণে।

শেষপর্যন্ত ব্ল্যাকমেল তত্ত্বেই ‘নারদনিউজ ডটকমে’র সিইও ম্যাথু স্যামুয়েলকে ঘিরতে চাইছে রাজ্য সরকার। মঙ্গলবারের খবর, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের অধীনে নারদ-কাণ্ডের তদন্তের গতিপ্রকৃতি সেদিকেই এগোচ্ছে। গোয়েন্দারা আপাতত ‘তৎপর’ ম্যাথুর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেলের তত্ত্ব প্রমাণে। প্রসঙ্গত, গত শনিবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের দলীয় সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ম্যাথুর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগ এনেছিলেন। বিরোধীদের বক্তব্য, তখনই রাজ্য সরকারের তদন্তের ‘অভিমুখ’ স্থির হয়ে গিয়েছিল। সেই পথেই তদন্ত এগোচ্ছে।  
তবে রাজ্য সরকারের তদন্তের ভবিষ্যৎ ঝুলছে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের উপর। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মঞ্জুলা চেল্লুরের ডিভিশন বেঞ্চ সোমবার জানিয়ে দিয়েছে, নারদ-কাণ্ডের তদন্তের বিষয়ে শেষ কথা বলবে আদালতই। 
কিন্তু তাতে থেমে নেই কলকাতার পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে নারদ-কাণ্ডের তদন্ত। বস্তুত, কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ইতিমধ্যেই ময়দানে নেমে পড়েছে। তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, ম্যাথুর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেল করার বেশ কিছু তথ্য ইতিমধ্যেই তাঁদের হাতে এসেছে। ওই বিষয়ে ম্যাথুর বিরুদ্ধে আরও তথ্যসংগ্রহের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে। এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, ‘‘উনি কবে কবে কলকাতায় এসেছিলেন, কাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং কী কী কথাবার্তা হয়েছিল, তার সমস্ত তথ্যই সংগ্রহ করা হচ্ছে। উনি যা করেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসংগ্রহ করা হচ্ছে। যেভাবে ওঁকে ঘেরা হচ্ছে, তাতে ওঁর রেহাই পাওয়ার রাস্তা নেই!’’
এক তদন্তকারীর দাবি, ‘নারদনিউজ ডটকম’ তাদের গোপন ক্যামেরা অভিযানের প্রথম ভিডিও ফুটেজ ফাঁস করেছিল গত ১৪ মার্চ। সেই ফুটেজ ফাঁস করার ঠিক একমাস আগে কলকাতায় এসেছিলেন ম্যাথু। সেই সফরে এসে তিনি পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন একটি হোটেলে উঠেছিলেন মাত্র চার ঘণ্টার জন্য! তবে তাঁর মোবাইল ফোনের ‘কল ডিটেল্‌স’ বলছে, হোটেলে না-থাকলেও তিনি আরও কয়েক ঘণ্টা শহরে কাটিয়েছিলেন। ওই সময়ে তিনি কয়েকজনের কাছে মোটা টাকাও চেয়েছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। পাশাপাশিই নাকি হুমকি দিয়েছিলেন, ওই পরিমাণ টাকা না দিলে গোপন ক্যামেরায় তোলা ভিডিও ফুটেজ ফাঁস করে দেবেন! 
তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, ম্যাথু যে ফুটেজ ফাঁসের আগে টাকা তুলতেই কলকাতায় এসেছিলেন, সে ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিত। কাদের সঙ্গে ম্যাথু তখন যোগাযোগ করেছিলেন, তার নির্দিষ্ট প্রমাণও তাঁদের হাতে চলে এসেছে। ম্যাথুর হোটেলে থাকার তথ্যপ্রমাণ ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারীরা। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে গোপন ক্যামেরা নিয়ে অভিযান করার সময়েও ওই হোটেলেই উঠেছিলেন ম্যাথু।
তিনি কি সত্যিই ব্ল্যাকমেল করেছিলেন?
‘এবেলা’র তরফে স্বয়ং ম্যাথুকেই প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাঁর জবাব, ‘‘জীবনে কখনও এ ধরনের কোনও কাজ আমি করিনি। যদি আমি তেমনকিছু করেই থাকি, তাহলে তা কেন প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না? দরকারে আমাকে না-হয় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিক!’’ উল্টে ম্যাথুর বক্তব্য, ‘‘আমার মনে হয়, হায়দরাবাদের ফরেন্সিক ল্যাবরেটরি যে রিপোর্ট জমা দিয়েছে, তাতে ওই ফুটেজের সত্যতা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই তথ্য পেয়েই তিনি (মুখ্যমন্ত্রী) এ ধরনের অভিযোগ করছেন। এটাই আমার আশঙ্কা!’’ 
ম্যাথুর আরও আশঙ্কা, মুখ্যমন্ত্রী মমতা তাঁকে গ্রেফতার করতে চাইছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আসলে উনি আমাকে গ্রেফতার করতে চাইছেন! অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাকে শেষ করতে চাইছেন! বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসে তিনি ভাবছেন যা খুশি করা যায়!’’ ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারা ম্যাথুকে বিভিন্ন দিক থেকে ঘিরে ফেলার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। এক গোয়েন্দা অফিসার জানিয়েছেন, ম্যাথুকে সমন পাঠানোর আগে তাঁর সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থারও দ্বারস্থ হচ্ছেন তাঁরা। যেমন, গত লোকসভা ভোটের আগে যে সময় তিনি গোপন ক্যামেরা অভিযান শুরু করেছিলেন, তখন থেকে এখনও পর্যন্ত তাঁর বিদেশসফরের তথ্য চাওয়া হবে কেন্দ্রীয় অভিবাসন দফতরের কাছে। খতিয়ে দেখা হবে তিনি বিদেশে কোথায় গিয়েছিলেন। তাঁর কাজের সঙ্গে সেই সফরের যোগসূত্র কোথায়। গোপন ক্যামেরা অভিযানের ফুটেজ ফাঁস করার আগে এবং পরে (যতদিন পর্যন্ত পাওয়া যায়) তাঁর ফোনের ‘কল ডিটেল্‌স’ চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মোবাইল পরিষেবা সংস্থার কাছ থেকে। পুলিশের বক্তব্য, ম্যাথু কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন, তা-ও তদন্তের স্বার্থে জানা দরকার। ম্যাথুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে মোবাইল ফোনের যোগাযোগ তদন্তকারীদের অন্যতম ‘হাতিয়ার’ হতে পারে।
তদন্তকারীদের আরও বক্তব্য, ম্যাথু গোপন ক্যামেরা অভিযানে প্রায় কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই টাকার ‘উৎস’ জানাও জরুরি। তাই অভিযানের সময়ে তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জানতে তাঁর ‘ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট’ চাওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের কাছেও। পাশাপাশি, আয়কর দফতরের কাছে চাওয়া হবে তাঁর গত কয়েক বছরের ‘আয়কর রিটার্ন’ও। গোপন ক্যামেরা অভিযান চালানোর জন্য ম্যাথুকে কেউ বা কারা অর্থসাহায্য করে থাকলে তাঁর বা তাঁদের কী স্বার্থ রয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে। ষড়যন্ত্রের পিছনে অন্য কারও হাত রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখবেন গোয়েন্দারা। এক তদন্তকারী জানিয়েছেন, কলকাতার বর্তমান পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেশ এবং বিদেশের বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার কর্তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে। তাই ম্যাথু সংক্রান্ত তথ্য পেতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। ইতিমধ্যেই সরকারিভাবে না-হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদেই কিছু তথ্য তাঁর কাছে এসেছে। তারই ভিত্তিতে এগনো হচ্ছে।
ম্যাথু অবশ্য সমস্তই উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘মমতা মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত কুড়ি বছরে কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতার সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে কি না খুঁজে দেখুন। খোঁজ নিয়ে দেখুন, আমি কতবার কোনও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে দেখা করেছি। আমি তো কখনও পলিটিক্যাল রিপোর্টারও ছিলাম না! স্বাধীনতার পরে আমাদের দেশে অনেক বড় বড় মানুষ জেলে গিয়েছেন। সেই তালিকায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যেমন আছেন, তেমনই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও রয়েছেন। এটাই আমাদের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এখন মমতা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী। আগামিদিনেও হয়তো তা-ই থাকবেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তাঁর জনপ্রিয়তায় কখনও চিড় ধরবে না!’’ ম্যাথুর আরও বক্তব্য, ‘‘বিজেপি ক্ষমতায় থাকাকালীন যখন আমি প্রথম গোপন ক্যামেরা অভিযান করেছিলাম, তখন তিনি নীরব ছিলেন। এখন অভিযোগের তিরে তিনি নিজেই বিদ্ধ! তাঁর নীতি এবং মূল্যবোধই প্রশ্নের মুখে। কিন্তু সত্যকে কেউ হত্যা করতে পারবে না।’’
কিন্তু কলকাতা পুলিশ তাঁকে ডেকে পাঠালে কী করবেন? 
জবাবে ফ্যাসিস্ত আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্প্যানিশ কবি লোরকার লাইন ‘নারদে’র মুখে— ‘‘যখন তোমার চিন্তাভাবনাকে কেউ মারতে পারে না, তখন তুমিও মৃত্যুকে ভয় পাও না!’’

Mathew Samuels Narada Sting
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -