SEND FEEDBACK

English
Bengali

মমতাকে রুখতে কেন সিবিআই অস্ত্রে শান মোদীর? বঙ্গ রাজনীতিতে কোন রহস্য?

পিনাকপাণি ঘোষ, এবেলা.ইন | জানুয়ারি ১০, ২০১৭
Share it on
মোদী চোর, গুন্ডা, তুঘলক। অনেক বিশেষণে প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবু কেন চুপ মোদী? কোন রহস্য এই চুপ থাকার পিছনে?

নোট বাতিলের পর থেকেই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী। কিন্তু সেই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়ে যায় রোজ ভ্যালি-কাণ্ডে তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ তথা লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিবিআই গ্রেফতার করার পরে। কিন্তু এখনই কেন সিবিআই তৎপর হল? শুরু থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, নোট বাতিল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরব হওয়াতেই সিবিআই দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের উপরে চাপ তৈরি করছে কেন্দ্র। যদি সত্যিই সেটা হয়ে থাকে তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই অভিযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সুযোগ করে দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

আবার বিজেপিকেও সহযোগিতা করে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এখন রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধী দল হিসেবে সব থেকে বেশি আলোচিত নাম বিজেপি। লোকসভায় দুই, রাজ্যসভায় দুই সাংসদ এবং তিন বিধায়কের শক্তি নেওয়া বিজেপিকে প্রধান বিরোধী দল বানিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বও দাবি করতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করার পর মুহূর্তেই রাজ্য বিজেপি অফিসে হামলা চালিয়ে বিজেপিকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। 
এর পরে কখনও বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়র সাংসদ-মেলা বন্ধ করার চেষ্টায়, কখনও তাঁকে পুলিশের তলব করায়, কখনও রাহুল সিংহের পথ আটকানোর মধ্য দিয়ে বিজেপিকে রাজ্য রাজনীতির আলোর বৃত্তে রেখে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্য দিকে, প্রতি দিন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুঙ্কার করে বঙ্গ রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকাকে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর করে চলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো।

আরও পড়ুন

মোদীর বিরুদ্ধে চরম আন্দোলন মমতার, পরিণতি মারাত্মক হতে পারে

নোট বাতিলের দ্বিতীয় দফা, কেরানি থেকে কোটিপতি— সবার আতঙ্ক বাড়ালেন মোদী

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আক্রমণেই জয় দেখছেন নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর দল। একটা বিষয় স্পষ্ট যে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেও সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের মোকাবিলা করার জায়গাতেই নেই রাজ্য বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে বিপুল মোদী হাওয়াও থমকে গিয়েছে। তখন সারদা কেলেঙ্কারির চাপ তৃণমূল কংগ্রেসের উপরে থাকা সত্বেও পদ্ম-ঝড় রুখে দিয়েছে ঘাসফুল। তবু সেই মোদী হাওয়াতে ভর করেই আসানসোল কেন্দ্র থেকে জিতে যান গায়ক বাবুল সুপ্রিয়। অন্য দিকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থন নিয়ে দার্জিলিং আসন থেকে জেতেন সুরিন্দর সিংহ আলুওয়ালিয়া। এর পরে রাজ্য বিজেপি-র প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্যসভায় গিয়েছেন, জর্জ ফার্নান্ডেজ ও রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। অর্থাৎ চার সাংসদের মধ্যে একজন গায়ক, একজন অভিনেতা, একজন অভিনেত্রী। এই শক্তি নিয়ে বিজেপির পক্ষে ক্ষমতায় আসা দূরে থাক, প্রধান বিরোধী দল হওয়াই যে স্বপ্নাতীত তা ভালই জানেন নরেন্দ্র মোদী।

এখন রাজ্যে বিজেপির তিন জন বিধায়ক থাকলেও সেই শক্তি একেবারেই বিচ্ছিন্ন। খড়্গপুরের বিধায়ক তথা রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে বাদ দিলে উত্তরবঙ্গের দুই বিধায়কের রাজ্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এর পরেও বিজেপিতে রয়েছে অসংখ্য গোষ্ঠী কোন্দল। রাহুল সিংহ গোষ্ঠী, সঙ্ঘ পরিবার গোষ্ঠীর মধ্যেও মিলেমিশে বিজেপিকে দ্বিতীয় শক্তিতেও পরিণত করার ক্ষমতা নেই। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বকে খুব একটা গুরুত্বই দেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করেন। এটাও এই রাজ্যে বিজেপির ও রাজনৈতিক পরিসর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক বড় বাধা।

এমনই এক পরিস্থিতিতে এই রাজ্যে যদি বিজেপিকে রাজনীতির প্রথম সারিতে আসতে হয় তবে ভরসা একমাত্র নরেন্দ্র মোদী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে এখন বিজেপিকে আলোচনার বৃত্তে নিয়ে এসেছেন তার পিছনেও রয়েছেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী কালো টাকা উদ্ধার, ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা ইত্যাদি নোট বাতিলের যত কারণই বলুন না কেন তার পিছনে যে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে তা স্পষ্ট। দেশের সব ছোট রাজনৈতিক দলই নোট বাতিলের পরে সমস্যায়। এর পরে যদি রাজনৈতিক দলকে অনামি দাতা হিসেবে টাকা দেওয়ার পরিমাণ ২০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২ হাজার টাকা করে নির্বাচন কমিশন তবে আরও সঙ্কট বাড়বে। কমিশনের সেই প্রস্তাবে যে কেন্দ্রীয় সরকার সহমত তা আগেই স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং, দেশের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক দল তৃণমূল কংগ্রেসও বিজেপির টার্গেটে।

নোট বাতিল পর্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভাবে কেন্দ্রের বিরোধিতা করেছেন তাতে নরেন্দ্র মোদীর রাগ থাকতেই পারে। কিন্তু শুধুই তার জন্য সিবিআই অস্ত্র প্রয়োগ করেছে কেন্দ্র এতটা সহজ করে ভাবা সম্ভবত ঠিক হবে না। রাজনৈতিক বা সাংগঠনিকভাবে বিজেপিকে তৈরি করে ২০১৯ সালের নির্বাচনে এই রাজ্য থেকে আরও বেশি সাংসদ নিয়ে যাওয়ার থেকে অনেক সহজ তৃণমূল কংগ্রেসকে দুর্নীতিপরায়ণ দল হিসেবে পরিচিত করে তোলা। 

সারদা বা রোজ ভ্যালির মতো অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া একান্তই জরুরি। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে এই কোটি কোটি টাকার দুর্নীতিতে দোষীদের সাজা হওয়াও জরুরি। এটা বাংলার মানুষের দাবি। আর কালো টাকা, কালো সমাজ থেকে মুক্তি দেওয়ার স্লোগান তুলে ইতিমধ্যেই ‘অন্যরকম’ তকমা পাওয়া মোদী যদি সেই কাজ করতে যান তবে সমর্থন পাবেন বলেও আশা। আর সেই আশাতেই এমন সিবিআই অস্ত্রে শান দেওয়া।

এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতের যে পরিবেশ তাতে বিরোধীদের মন্ত্র হয়ে উঠেছে ‘মোদী-নাম।’ আর বিজেপিতে তো মোদীই ‘সর্বেশ্বর।’ তাই বঙ্গ-রাজনীতির রহস্য সন্ধানের এই অভিযানেও মুখ্য চরিত্র ‘ফেলুদা’র ভূমিকায় অবশ্যই নরেন্দ্র মোদী। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বা প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়রা নেহাতই সহকারী ‘জটায়ু’ বা ‘তোপসে।’

Narendra Modi CBI Mamata banerjee
Share it on
আরও যা আছে
আরও খবর
ওয়েবসাইটে আরও যা আছে
আরও খবর
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -