SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

‘উরি’ কি যুদ্ধের বলিউডি সেলিব্রেশন, পুলওয়ামার পরে কোন সত্য উঠে আসছে

ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯
```` Comments
প্রধানমন্ত্রী যে সারা রাত্তির ওয়াররুমে টেনশনে টানটান জেগেছিলেন, ‘উরি’ মুক্তি পাওয়ার আগে তিনি কোনও দিন সে কথা মুখ ফুটে বলেননি। ছবিটাতেই আমরা প্রথম সেটা জানতে পারলাম।

ভদ্রলোকের পরিচয়টা ছবিতে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। তবে তাঁর সাদা দাড়ির তরিবতি ছাঁট-কাট, সোনালি ফ্রেমের চশমা, চুলের কেতা দেখে পরিচালকের মন-কি-বাত অনেকটাই আন্দাজ করা যাচ্ছিল। যিনি অভিনয় করছিলেন, সেই রজিত কপূরের ৫৬ ইঞ্চি ইয়া ছাতি না থাকলেও, তিনি যে দাপট নিয়ে, গ্যাঁট হয়ে ওয়াররুমে বসে থাকছিলেন ,তাতেই পরিস্কার ইনিই ‘তিনি’! ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এ তাঁকে অবশ্য একবারও ‘মিত্রোঁ’ বলে হাঁক পাড়তে দেখা যায়নি। তবে ‘তিনি’-ই যে ইন্ডিয়ান আর্মির মিত্র নাম্বার ওয়ান— সেনাদের এমন বন্ধু যে আর কেউ নেই, সেটা চান্স পেলেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু তাঁর মুখের দিকে চেয়ে, তাঁর মুখের কথাতেই, তাঁর মুখ রাখতেই সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আগাপাশতলা ঘটানো হলেও ঘটনার পিছনে আর একজনও রয়েছেন। ছবিতে তাঁর চরিত্রটাও খুবই ব্যস্ত। আর তাঁর লুক্-টাও বিলকুল আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের মত। উরি-র সেনাঘাঁটিতে ভোররাতে জঙ্গি হামলার ‘মু-তোড়’ জবাব দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর গুজরাটি বস্-এর মতোই বা তাঁর চেয়েও ‘দাবাং’। ছবিতে তাঁর মুখেই তাই ওই বেপরোয়া-বেলাগাম জাতীয়তাবাদী ডায়ালগটা রাখা হয়েছে— ‘ইয়েহ নয়া হিন্দুস্তান হ্যায়-ইয়েহ ঘরমে ঘুষেগা ভি, আউর মারেগা ভি’।

হিন্দি সিনেমা আর হিন্দুত্ববাদীদের এ হলো বহুকালের স্বপ্ন-সাধ। জঙ্গি পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে অ্যায়সা মজা চাখানো, যাতে করে ব্যাটাদের ‘নানি ইয়াদ আ যায়েগি...’। উরি-র পরের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক প্রতিটা দেশপ্রেমিক ভারতবাসীকে সেই দাদাগিরির সুখ দিয়েছিল। আর এই নিখুঁত মোলায়েম অপারেশন কে করেছে, কে করেছে, দাদা করেছে...। দাদার হাতে ডোভাল ছিল ছুঁড়ে মেরেছে...। উফ্ পাকিদের বড্ড লেগেছে! প্রধানমন্ত্রী যে ২০১৬-র ২৮ সেপ্টেম্বর (সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-এর ঐতিহাসিক তারিখ) সারা রাত্তির ওয়াররুমে টেনশনে টানটান জেগেছিলেন, ‘উরি’ মুক্তি পাওয়ার আগে তিনি কোনও দিন সে কথা মুখ ফুটে বলেননি। ছবিটাতেই আমরা প্রথম সেটা জানতে পারলাম। ‘উরি’ দেখা ও দেখানোটা বিজেপির দলীয় কর্মসূচিতে উঠে এল। এবং তার পরেই প্রধানমন্ত্রী মাঠে ঘাটে জনসভায় তাঁর সেই বিনিদ্র রাতের গল্প বলে বেড়াতে লাগলেন।


‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ছবির একটি দৃশ্য, ফেসবুক থেকে

সিনেমার ওয়ার রুমটায় অবশ্য চেনা মুখ আরও দু-তিন পিস্ ছিল। তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পর্রীকরের মত আধা পাকা চুল ছিল। এমনকী অরুণ জেটলী আর রাজনাথ সিংহের মতো দু-রকমের টাকও দু’এক ঝলক দেখা গেছে। কিন্তু আসল ফোকাসটা সেই ‘তিনি’ আর অজিত ডোভালই নিয়ে গেছেন। বিজেপির এম.পি অভিনেতা পরেশ রাওয়ালও অমন একজন দেশভক্তের ভূমিকায় অভিনয় করে রীতিমত গর্বিত। লোকসভায় এই তো এবার বাজেট-বিতর্কের সময়ে বিশাল হট্টগোলে বিরোধীদের তোলা সব বিতর্ক চাপা দিয়ে পর্দার ডোভালজি মানে সাংসদ রাওয়ালজী সিধা প্রধানমন্ত্রীর কুরসির কাছে দৌড়ে এসে বুক বাজিয়ে বলেছিলেন— ‘স্যারজি, অপজিসন-কে একেবারে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে দেওয়া গেছে’। তখনও তাঁর মুখখানা ‘কেমন দিলাম’ গর্বে চকচক করছিল।

তবে ডোভালজির প্রধানমন্ত্রীজি বোধ হয় চক্ষুলজ্জার খাতিরে তক্ষুনি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ‘উরি’-র ওই সুপারহিট ডায়ালগটি ঝাড়তে পারেননি। যদিও ক’দিন আগেও বিজেপি-র যে কোন ইভেন্টে ওই ডায়ালগটা ‘ভারতমাতা কি জয়’ বলার চেয়েও বেশি জনপ্রিয় আর উত্তেজক ছিল। ছবিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-এর টিম-লিডার, কমান্ডো বাহিনীর মেজরের মতোই বিজেপির বড়-মেজ-সেজ নেতারা জনসভায় ভিড়ের দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার ছাড়ছেন— ‘হাউ ইজ দ্য জোশ’? পাবলিকেরও ছবিটা দেখা। তাই ভিড় থেকে চটজলদি জবাব উঠছে— ‘হাই স্যার’! রাহুল রাফাল বিমান হানায়, একের পরে এক অভিযোগের কার্পেট-বম্বিংয়ে বিজেপির পাবলিক ইমেজে যখন বড় বড় গর্ত, তখন ‘উরি’ সিনেমাটা আমাদের ভোট রাজনীতির স্টক মার্কেটে ‘ধরমেতে বীর’, ‘করমেতে বীর’ মহান প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ড কোম্পানীর পড়তি শেয়ারকে নতুন ব্র্যান্ড ওরিয়েন্টেশন দিল।

এটা হলিউডেও হয়। মার্কিন সরকার ও সেনাবাহিনীর দাপট ও কৃতিত্ব জাহির করার জন্য সত্যি বা আধা সত্যি ঘটনা অবলম্বনে অনেক ছবি বানানো হয়। সেই সব ছবিতে আমেরিকার সরকার সব সময়ে গনতন্ত্রের পূজারী আর সেনারা হেলমেটের বল্টু থেকে বেয়নেটের ডগা পর্যন্ত নিখাদ ধর্মযোদ্ধা। এই সব ছবি বানাতে সামরিক প্রশাসনের সব রকম মদত থাকে। যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্রেনিং আর টেকনিক্যাল সহযোগিতা ছাড়া ‘উরি’-র অ্যাকশন দৃশ্যগুলো এতটা বিশ্বাসযোগ্য হত না। বিজেপি-র শত্রু বা সমর্থক নির্বিশেষে আম-জনতাও ছবিটা দেখে বলত না— উরি, উরি বাবা,কি দারুন। ‘উরি’ যেমন নিজের বক্স-অফিসের ক্যাশ বাক্স উপচে বাণিজ্য ভরছিল, তেমন ভোটের আগে বিজেপির চুপসোনো মরাল-এও স্ট্র্যাটেজিক জোশ-এর পাম্প লাগাচ্ছিল।


‘উরি’ কি শুধুই ‘জোশ’ প্রদর্শনের ছবি? ফেসবুক থেকে

কিন্তু গত ১৪ ফেব্রুয়ারি, প্রেম দিবসে জইশ-ই-মহম্মদ গাড়ি বোমা ফাটিয়ে সেই জোশ-এর গ্যাস বেলুনেই পিন-ফুটো করে দিল। ‘উরি’ ছবিটা যে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-এর বলিউডি সেলিব্রেশন,(ছবি মুক্তির আগে প্রায় গোটা বলিউডের সঙ্গে মোদিজির হাসিখুশি গ্রুপফি-র কথাটা মনে করুন), এই জঙ্গি-হানা তো সেটার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিল।

ছবির কমান্ডো-বাহিনী বড়সাহেবদের কাছ থেকে যতই জামাই-আদর পেয়ে থাকুন, প্রধানমন্ত্রীজি যতই তাদের খাতির করে লাঞ্চ, ডিনার খাইয়ে থাকুন, আসলে সরকারের কাছে যে তাদের বাহিনীর জানমানের দাম কানাকড়িও নয়, এই একটা ঘটনাই সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সরকারের যদি জওয়ানদের প্রতি একটুও মমতা থাকত, তা হলে নিশ্চয়ই ২৫০০ লোককে ৭২টা ভ্যানে গরুছাগলের মতো গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে, জঙ্গি ফাঁদ পাতা রাস্তায় রওনা করিয়ে দেওয়া হতো না! এখন কেউ এই আক্রান্ত সেনাদের ‘শহিদ’ না বলে ‘নিহত’ বললেই ভারতমাতার সুপুত্তুররা লাঠিসোঁটা নিয়ে বাড়িতে চড়াও হচ্ছে। অথচ সত্যিই তো এই মানুষগুলো তো কেউই শহিদ হওয়ার বাসনা নিয়ে মৃত্যু-বাসে চড়েননি।

আসলে বলিউডের মতই এই সরকারটাও সাজানো চিত্রনাট্য আর বানানো সংলাপেই টিকে রয়েছে। এই জুমলা-রাজকে আদর করে ‘মোদীউড’-ও বলতে পারেন।এখানে দু-তরফই পালা করে একে অন্যের জোশ-কে ‘হাই’ রাখতে পারে। ডোকোলাম-এ ঝাড় খাওয়ার পরেও বলিউডি ‘পল্টন’-এ ব্যাকগ্রাউন্ডে মাও-এর ব্যানার টাঙানো চিনা গণমুক্তি ফৌজকে ভাঁড়-বাহিনী বানায়। আবার পুলওয়ামার পর সরকারী যুদ্ধ-জিগির সিনেমা হলে ‘উরি’-র মেয়াদ আরও ক-হপ্তা বাড়িয়ে দেয়! উরি বাব্বা! কি দারুন!

শান্তনু চক্রবর্তী: প্রায় তিন দশক ধরে সিনেমা, টেলিভিশন, খেলা, রাজনীতি-সহ জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা গলি-ঘুঁজিতে ঘোরাফেরা করছেন। প্রথম শ্রেণির একাধিক দৈনিকে সিনেমা, নাট্য সমালচনা এবং উত্তর সম্পাদকীয় কলাম লিখে থাকেন। 

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -