SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

নকল কিশোরের দাপট আর রাজার জালিপনা, পুজোয় কেমন সিনেমা দেখল বাংলা

অক্টোবর ৩০, ২০১৮
```` Comments
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তো শুধুমুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সেসব গানে ঠোঁট নাড়তে পারেন না, সেজন্য গানগুলোকে সিচুয়েশন মাফিক ‘প্লেস’ করতে হয়। আর রাজার কেসটা টোটালি আলাদা।

তাঁর গান শুনতে বাংলার শহর থেকে গ্রাম হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। আর তিনি ব্যাকস্টেজে বসে পাঁইট বা নিপ-এর ছিপি খুলে ঢকাঢক ‘নিট’ গলায় ঢালেন। তার পর তাঁর সেক্রেটারি-কাম-মিউজিক হ্যান্ড-কাম-ছায়াসঙ্গী-কাম-চুপচাপ খিস্তি-থাপ্পড় হজম করার পাবলিক তাঁকে ধরে-পাকড়ে ঠেলেঠুলে স্টেজে তুলে দেয়। আর এক বার কোনও রকমে তাঁকে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারলেই তিনি কিশোর কুমারের বরপুত্তুর! তখন পেটে মাল পড়লেও তাঁর তাল কাটে না বিলকুল। তবে তাঁর গলায় কিশোর কুমারের গানগুলো কখনও কুমার শানু, কখনও বাবুল সুপ্রিয়, কখনও বয়েসের ড্যাম্প ধরে ব্যাটারি ডাউন গৌতম ঘোষের মতো শোনায়। কখনও চড়ায় গিয়ে ফড়ফড় করে কাগজ ছেঁড়ার মত আওয়াজ বেরোয়— কখনও ‘ইয়লডিং’-এ সুরটা একটু কম লাগে।

এই কিশোরকুমার ‘জুনিয়র’ (ভাগ্যিস জাদুসম্রাট প্রদীপচন্দ্র কপিরাইট-এর মামলা করেননি)-এর এত হাই-নামডাক, হাই-ইনকাম, হাই-সুগার, হাই-প্রেশার, তবু কীসের ফাস্ট্রেশনে দাদা এত হাই-ড্রিঙ্ক করে রোজ রাতে বাড়ি ফিরে হাই-বাওয়াল করেন, সেটা ঠিক ‘ক্লিয়ার’ হল না। অথচ ঘরে তাঁর এঁটেল মাটির চেয়েও সহনশীলা মিষ্টি বউ, লেখাপড়া,বাংলা ব্যান্ড করা সাবালক ছেলে। আসলে কৌশিক গাঙ্গোপাধ্যায় নামে পরিচালক ভদ্রলোকটি ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’ নামে যে প্রোডাক্টটি পুজো-রিলিজ বলে বাজারে ছেড়েছেন, সেখানে কখন-কী-ঘটে-যায় তার অনেক কিছুই ‘ক্লিয়ার’ হয় না। যেমন ধরুন, এই জুনিয়র কিশোরবাবুর ‘কন্ঠী’-গানের খ্যাতি স্টেট-লেভেল ছাপিয়ে কী ভাবে যে ন্যাশনাল লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে গেল, ঠিক ক্লিয়ার হল না। কেন্দ্রের এন-ডি-এ (রকম সকম দেখে তেমনই লাগছিল) সরকারই বা খামোখা কেন ভারত-পাক সম্পর্কের টেনশন কমাতে দু-দেশের সীমান্তে গানের জলসা বসাতে যাবে? তো বসালেনই যখন, তখন সেই হাই-প্রোফাইল জলসায় আমন্ত্রিত সস্ত্রীক কিশোরকুমার জুনিয়র আর তার মিউজিসিয়ান সঙ্গীদের পাতি পাকিস্তানি ডাকুর দল কীভাবে টেররিস্টদের চেয়েও ‘চাম্পি’ অ্যাকশনে হাইজ্যাক করে নিয়ে যায়? 


‘কিশোর কুমার জুনিয়র’-এর একটি দৃশ্যে প্রসেনজিৎ ও অপরাজিতা আঢ্য, ছবি: ইউটিউব থেকে

কে জানে? এটাও তো ঠিক জানা গেল না, ওই পাক ডাকুদলের এক জন, যার ‘আব্বু’ কিশোরকুমারের ব্যাপক ফ্যান, তাকে টেররিস্ট বললেই কেন তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। পাকিস্তানে টেররিস্টদের স্টেটাস কি ডাকাতদের চেয়েও খেলো? অগ্নিযুগের বাংলায় তো শুনেছি গনধোলাইয়ের মতো পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে গেলে বিপ্লবীরা পাবলিককে চেঁচিয়ে বলতেন— আমরা স্বদেশী ডাকাত! স্বদেশী ডাকাত! তবে সেসব অন্য প্রসঙ্গ। কৌশিক গাঙ্গোপাধ্যায়ের কেসটা আলাদা, তিনি আসলে বিভিন্ন শিল্পীর গলায় খান কুড়ি কিশোরকুমারের হিট গান শোনাতে চেয়েছেন। আর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তো শুধুমুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সেসব গানে ঠোঁট নাড়তে পারেন না, সেজন্য গানগুলোকে সিচুয়েশন মাফিক ‘প্লেস’ করতে হয়। সেটার জন্য একটা গপ্পো বা চিত্রনাট্যের চালচিত্তির লাগে। কৌশিক সেটাই বানিয়েছেন। অনেককাল আগে বিবিধভারতীতে এরকম একটা অনুষ্ঠান হতো— ‘কিছু গল্প,কিছু গান’-টান গোছের নাম-টাম ছিল বোধ হয়।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

তো কৌশিকও সেই লাইনেই হেঁটেছেন। এখন তাঁর গল্পের গরু যে গাছে চড়তে গিয়ে হাত-পা ছিরকুটে, মরুভূমিতে ঘুরে কাঁটাঝোপ চিবিয়ে বিস্তর জখম হয়েছে, সেটা গরুর আনাড়িপনা। তা ছাড়া আমাদের গাঙ্গুলীসাহেব ঠিক মুখুজ্যেমশাই মানে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো নন। সৃজিত খুব চট করে,সরাসরি ‘অনুপ্রাণিত’  হয়ে পড়েন। ফলে ধরা পড়ার চান্স বেশি। সেখানে এক ‘অপুর পাঁচালি’ ছাড়া, কৌশিকের অনুপ্রেরণা আসে ঘুরপথে, দূর থেকে। তাই সোর্স-এর ব্র্যান্ড-নামটা চট করে ঠাহর হয় না। এখানে যেমন পুরো জয়শলমির-মরুভূমি পর্বটার ‘প্রেরণা’ বলিউডের ‘ফিল্মিস্তান’। কৌশিক সেটাকে কিশোর-রফি সেন্টু-মেন্টু দিয়ে মেখে-ঘেঁটে ওই এক রকম বানিয়ে নিয়েছেন।

মুশকিল হল, পরিচালক হাই সেন্টুর মিশেল দেওয়া এমন একটা গাঁজাখুরি প্লট বানাচ্ছেন, যেখানে গানের দলটাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, নাকি বাগানবাড়ির (থুড়ি দুর্গ)পিকনিকের আসর জমাতে ভাড়া করা হয়েছে, সেটাই গুলিয়ে যায়। এখানেও একটা জিনিস ক্লিয়ার হল না। ‘টিম জুনিয়র কিশোরকুমারের’ বাঁশিওয়ালা সঙ্গীটি এত ভাল রফি-কন্ঠী হয়েও কেন কিশোরের দলে পড়ে আছে? মাচায় কি ওরা দু’জনে মিলে ‘দোস্তানা’-র ডুয়েট পারফর্ম করে? আসলে আমরা ভেবেছিলাম, ছবিতে বোধ হয় এই ধরনের কপি-সিঙ্গার বা কন্ঠী-গায়কদের নিজেদের আইডেন্টিটির সংকট, অন্যের ধার করা পরিচয় বয়ে চলার ট্র্যাজেডির কথাই আসবে। কিন্তু সেসব জায়গা একটু আধটু ওপর ওপর খামচে গল্প গেল রেগিস্তানে। জটায়ু থাকলে বলতেন, ‘রেগিস্তানে রাগারাগি’ করতে। আর চামচাকুল দু’হাত তুলে বললেন— জাঁহাপনা তুসি গ্রেট হো— এই তো ক্যামেরার দিকে পিছন ফিরে প্যান্ট নামিয়ে দিয়েছি— আপনি আমাদের নজরানা গ্রহণ করুন।


‘কিশোর কুমার জুনিয়র’-এর একটি দৃশ্যে প্রসেনজিৎ, ছবি: ইউটিউব থেকে

আমাদের অনেকেরই বন্ধু অদ্রীশ বিশ্বাস স্বনির্বাচিত মৃত্যুবরণের রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতেই একটা আশ্চর্য গবেষণার কাজ শেষ করে গিয়েছিলেন বা বলা যায় গবেষণার ব্যাটনটা শূন্যে ঝুলিয়ে রেখে চলে গিয়েছেন, ভবিষ্যতে কেউ পেড়ে নেবেন, সেই আশায়। ‘জাল’ নামে তাঁর ওই বইটা গত ১০০ বছরে বাঙালির ‘মাস’ বা ‘পপুলার’ সংস্কৃতির জায়গায় জাল বা ‘ফেক’ এর প্রভাব নিয়ে একটা স্যাম্পল স্টাডি। ভীষণ মেধাবী সেই কাজটায় ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা আর সেই প্রসঙ্গে ‘সন্ন্যাসী রাজা’ সিনেমা ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘এ প্রিন্সলি ইমপস্টার?’ বইটার কথা আছে।কিন্তু ‘কপি সিঙ্গার’, ‘কন্ঠী’ বা নকল গায়ক নিয়ে কোনও আলোচনা নেই।

তবে কৌশিক আর সৃজিতের দৌলতে বাঙালির মাস কালচারের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট এই পূজোর মরশুমে এবার ‘ফেক’ বা জাল নিয়ে দু-দুটো ছবি ছিল। সেখানে কৌশিক কী ছড়িয়েছেন সে ব্যাপারে তো আগেই কথা হয়ে গেল। সৃজিত বরং অনেকটাই, বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই, পার্থবাবুর বইয়ের পাতা উলটে উলটে চিত্রনাট্য লিখেছেন। সেখানে হয়তো ভাওয়াল রাজার প্রাইভেট চিড়িয়াখানায় দুটো জেব্রা বেশি হয়ে গিয়েছে। বা ভাইবোনের ভালবাসা আরও ঘন দেখাতে ভাওয়াল রাজার বড় দিদিকে ছোট বোন বানানো হয়েছে। এই রাজার মদ, মেয়েছেলের দোষ, সিফিলিসের ঘা— সবই আছে। তবে সৃজিতের রাজার ‘রেশমীবাঈ’ ঢাকাইয়া বাঙাল ভাষায় কথা বলে, কামসূত্র কায়দায় ‘এরোটিক’ দাবা খেলে। লখনউয়ি ঘরানায় ঠুংরি গায়,কত্থক নাচে। রাজার বিয়ের রাতে মুজরো করতে এসে চোখের জল ফেলে।আবার ‘লুচ্ ক্যারেকটার’র রাজা সন্ন্যাসী সেজে ফিরে এলে তার হয়ে কোর্টে সাক্ষীও দেয়।যাকে বলে ফাইভ-ইন-ওয়ান।


‘এক যে ছিল রাজা’ ছবিতে যিশু সেনগুপ্ত ও অন্যান্য শিল্পী, ছবি: ইউটিউব থেকে

এ বার আদালতে বাদী সন্ন্যাসী রাজা আর বিবাদী রানীসাহেবার তরফে যথাক্রমে এক হঠাৎ-জাতীয়তাবাদী ও আরেক লড়াকু নারীবাদী ব্যারিস্টার খাড়া হয়ে যান, যাঁদের আবার পুরনো প্রেম ট্রাম-ডিপোয় বাড়ে। কিন্তু সন্ন্যাসীকে আসল রাজা প্রমাণ করার চক্করে পড়ে সৃজিত জাল-রাজার কিস্‌সার আসল মজাটাই মিস করে গেছেন। ছবিতে নকল রাজা তাই সবক’টা আদালতে মামলা জিততে জিততে জনতার আদালতে পৌঁছতে ভুলেই যান। পুরনো গাঁজাখুড়ি ‘সন্ন্যাসী রাজা’ কিন্তু কী করে যেন সেটা পেরে গিয়েছিল। সৃজিতের রাজা ইতিহাস মোতাবেক প্রিভি-কাউন্সিলে মামলা জিতেই ফট্ করে মরে যান। আর পাবলিক, কেসটা কেন জমল না, ভাবতে ভাবতে বাড়ি চলে যান। খেল্ খতম, পয়সা হজম। 

এই রচনায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এর জন্য এবেলা.ইন দায় বহন করবে না। 

শান্তনু চক্রবর্তী: প্রায় তিন দশক ধরে সিনেমা, টেলিভিশন, খেলা, রাজনীতি-সহ জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা গলি-ঘুঁজিতে ঘোরা ফেরা করছেন। প্রথম শ্রেণির একাধিক দৈনিকে সিনেমা, নাট্য সমালচনা এবং উত্তর সম্পাদকীয় কলাম লিখে থাকেন। 

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -