SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

যৌনগন্ধে ভূত পালায়, তারানাথ কোন ছার, কেমন হল ওয়েব সিরিজ

জানুয়ারি ২১, ২০১৯
```` Comments
‘তারানাথ তান্ত্রিক’-এ তোলার দক্ষতা পরতে পরতে থাকলেও কোথায় যেন গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল তারানাথের জগৎ। 

বিভূতিভূষণ এবং তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি এবার কিউ অথবা কৌশিক মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায়। পালার নাম ‘তারানাথ তান্ত্রিক’। এর আগে তারানাথ মুখ দেখিয়েছেন সিরিয়ালে। উঠে এসেছেন জনপ্রিয় এফএম চ্যানেলের অডিও নাটকে। এ বারে তাঁর তিন নম্বর অবতার। তিনি আবির্ভূত ওয়েব সিরিজে। 

‘হইচই’-এর সাম্প্রতিক ওয়েব সিরিজ ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ ঘিরে কৌতূহল দানা বেঁধেছে যথেষ্ট। কারণও রয়েছে বিপুল। বিভূতিভূষণের মতো দিকপালের সৃষ্ট এই চরিত্রটিকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে সিরিজ লেখেন তাঁর পুত্র তারাদাস। তারানাথ হয়ে ওঠেন বাংলার হরর-অতিলৌকিক সাহিত্যের অন্যতম প্রধান অভিমুখ। গত কয়েক বছরে তারানাথের প্রতি মিডিয়ার একটা ঝোঁক লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এর কারণ বিবিধ হতে হতে পার। এই লেখায় তার বিশ্লেষণের চেষ্টা থাকার কথা নয়। তবু, যেটুকু না বললেই নয়, তা হল এই— বাংলা রোমাঞ্চ সাহিত্য অনেকদিনই বদ্ধ ডোবা হয়ে পড়েছে। অন্তত এই বাংলায় তাকে ‘শিশু সাহিত্য’-এর বেড়ায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদেরও যে রোমাঞ্চপ্রীতি থাকতে পারে, সুশীল বং সোসাইটি তা সহজে মানে না, মানতে চায় না। এই বিন্দু থেকে রেডিমেড সমাধান তারানাথ তান্ত্রিকের মতো সিরিজ, যাতে ভূত আছে, পিশাচ আছে, সামাজিক উথাল-পাতাল রয়েছে, সেই সঙ্গে রয়েছে বাঙালির হারিয়ে যাওয়া সময়ের এক অনন্য বিবরণ। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

সে দিক থেকে দেখলে, তারানাথ ওযেব সিরিজে আসতেই পারেন। আর তা নিয়ে যদি ভাবিত হন কিউয়ের মতো ‘অল্টারনেটিভ’ পরিচালক, তা হলে কৌতূহল খানিকটা বেশি হতেই পারে। কিন্তু কেমন তারানাথ তুললেন কিউ? ট্রেলার উন্মোচনেই বেশ ধামাকা ধামাকা ভাব এনেছিল এই সিরিজ। তারানাথ-ফ্যানরা উৎকণ্ঠিত ছিলেন তাঁদের প্রিয় এই চরিত্র ও সিরিজকে দক্ষ হাতে তোলা চলচ্ছবিতে কেমন লাগে তা দেখার জন্য। (হ্যাঁ, কিউ যে ছবি তোলায় দক্ষ, তা প্রমাণ করতে নতুন কোনও কসরতের দরকার নেই, এটা বুঝদাররা জানেন।)


তারানাথের শ্মশান-সাধনা, ছবি: ট্রেলার থেকে

ওয়েব সিরিজ ‘তারানাথ তান্ত্রিক’-এ তোলার দক্ষতা পরতে পরতে থাকলেও কোথায় যেন গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল তারানাথের জগৎ। 

বিভূতিভূষণ মাত্র দু’টি তারানাথ-কাহিনি লিখে থেমে গিয়েছিলেন। অনেক পরে সেই চরিত্রকে ফিরিয়ে আনেন তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতা ও পুত্রের তারানাথের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। বিভূতিভূষণের তারানাথ একজন পতিত তান্ত্রিক। তার তার উদ্দেশ্য থেকে চ্যুত। কোথাও সে ক্রুর, লোভীও বটে। কিন্তু তারাদাস যখন তাঁর সিরিজ লিখেছেন, সেখানে তারানাথ এক তান্ত্রিক মাত্র নয়। সেখানে ক্যানভাস অনেক বড়। সে এক সময়ের, এক বিশেষ ভাবনার প্রতিভূ। সে একই সঙ্গে তান্ত্রিক, ১৯৩০এর দশকের বাঙালি নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি এবং এক স্নেহময় পিতা, নির্ভরযোগ্য বন্ধু। সব মিলিয়ে এক মধুর মানুষ। তারানাথ অতিপ্রাকৃতের সঙ্গে যেমন নিজেকে যুক্ত করতে পারে, তেমনই সে নিজেকে নিয়ে আসতে পারে সহজ আড্ডায়, যেখানে হারিয়ে যাওয়া বাংলা আর তার সমাজ আজকের পাঠকের পাশটিতেও ঝুপ করে বসে পড়তে পারে।

কিউয়ের তারানাথ কিন্তু এমনটা নয়। এবেলা.ইন-কেই কিউ জানিয়েছিলেন যে তাঁর তারানাথ অনেকটাই বিভূতিভূষণের। আন্তর্জাতিক খ্যাতসম্পন্ন অভিনেতা জয়ন্ত কৃপালনী এই সিরিজে তারানাথের ভূমিকায়। তারানাথের চেনা গোঁফদাড়ি কামানো চেহারটিও নেই। তার বদলে সে জটা-দাড়ি সম্বলিত এক রহস্যপুরুষ। তার বাড়ির দেওয়ালে আঁকিবুঁকি সব তান্ত্রিক গ্রাফিত্তি। আর তার মেয়ে চারি এখানে এক ‘এনিগমা’। সে কেমন একটা যৌন যৌন দৃষ্টিতে তাকায়। তার সঙ্গে তারানাথের সম্পর্কটা ঠিক কী— এই তিন এপিসোডে কিছুতেই বোঝা গেল না। চারি ক্লিভেজ-শোভনা হয়ে দরজা খুলল আর ড্যাবডেবিয়ে তাকিয়ে রইল। মাঝে তারানাথকে ম্যাসাজ করল আর সব শেষে গল্পের রেশ ধরে খানিক রহস্য ছড়াল। এর মানে কী— কিউয়ের ‘অল্টারনেটিভ’  দর্শনে ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকল সে, জানা হল না।


মাতু পাগলি। ছবি: ট্রেলার থেকে

তারানাথ বাঙালি। কিন্তু জয়ন্তবাবুর উরুশ্চারণে কেমন একটা বড়বাজার বড়বাজার গন্ধ। সে থাকগে! যুবক তারানাথ কিন্তু পরিষ্কার বাংলা বলে। তা হলে কি বয়সে পৌঁছে তারানাথের ‘অল্টারনেটিভ’ চে়ঞ্জ? বীরভূমের শ্মশানে মাতু পাগলি নামের জনৈকা সাধিকা তারানাথকে শবসাধনা শিখিয়েছিলেন। বিভূতিভূষণের কলমে সেই কাহিনি আজ অমর। সেই কাহিনিকেই যখন কিউ তোলেন তাঁর ক্যামেরায়, তখন বারে বারে ভিরঘুট্টি লাগে। এই ছবিতে শ্মশানবাসিনী মাতুকে ‘হাকিনী’ বলেছে তারানাথ। অথচ মাতুকে ‘ডামরী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তারাদাস। ‘হাকিনী’ আর ‘ডামরী’-তে গোল পাকালে বোঝা যায়, কিউ বা তাঁর পরামর্শদাতারা তন্ত্রের এবিসিডিটুকু না মকশো করে তারানাথ তান্ত্রিক তুলতে এসেছেন। কিশলয় ঠাকুরের বিভূতিজীবনী ‘পথের কবি’ পড়লেই জানা যায়, বিভূতিবাবু নিজে কী গভীর ভাবে তন্ত্রকে জানতেন। আর তারাদাস তো রীতিমতো তন্ত্রাধ্যায়ন সেরে লিখতে বসেছিলেন তাঁর সিরিজ। তা হলে তার চলচ্চিত্র-রূপকাররা কেন মিনিমাম শ্রমটুকু দেবেন না?

বিভূতিবাবুর গল্পে তারানাথের শবসাধনার সিকোয়েন্স বাংলা সাহিত্যের এক সম্পদ। বিভূতিবাবু যে ‘ভয়’-কে এখানে নিয়ে এসেছিলেন, তা বিলিতি গথিক ভয় থেকে বহু দূরের ব্যাপার। সেই সিকোয়েন্সকে যখেন কিউ তোলেন, দেখা যায় শ্মশানে ধ্যানরত তারানাথের সামনে কানি পরিহিতা কৃকলাসিনী মাতু চার হাত পা তুলে নেত্য করছে। এতে কোন পরামোক্ষ গজালো তা কিউ-ই জানেন। দর্শকের দিত্তে বোম্বাচাক ছাড়া অন্য কিছুই যে বুড়বুড়ি কাটল না, তা হলফ করে বলা যায়।

 
তারানাথ-কন্যা চারি যা হইয়াছে, ছবি: ট্রেলার থেকে

সর্বোপরি, এই ছবির নারীরা। চারির কথা তো আগেই বলেছি। বাকিরাও কেমন একটা সেক্সি সেক্সি লোগ বোলে-গোছের। আর এটাও আশ্চয্যি, ১৯৩০-এর দশকের শেষ বা ১৯৪০-এর দশকের গোড়ায় বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা ব্লাউজ পরত না— এই জ্ঞান কিউ কোত্থেকে পেলেন! সে যাই হোক। সবে কলির সন্ধে। কিউ আরও এগোবেন। আমরাও অপিক্ষেয় রইলেম। তিনি ভাল ‘তোলেন’। তাঁর তোলার গুণে তারানাথ এপিক হয়ে উঠতে পারে। ভিস্যুয়ালাইজেশন অন্তত সে কথাই বলে। একটু যদি হোমওয়ার্ক করে এগোন কিউ, তা হলে বাংলা ছবির সুদিন ঘনাতে বেশি দেরি হবেনা, বলাই যায়।   

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়: ভালবাসেন কবিতা আর ভূতের গল্প। গান শোনা আর বই পড়াতেই মোক্ষ।
 

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -