SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

কিশোরকুমারের ঐতিহাসিক চশমা বিষয়ে আমার দু’কথা: রূপম ইসলাম

নভেম্বর ৩, ২০১৮
```` Comments
কিশোরকুমারের স্মার্টনেসের স্পর্ধা বিস্মিত করে। ভাবতে বাধ্য করে, এই লোকটা এলিয়েন নয় তো?

আমি এটা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি যে, কিশোরকুমারের মতো প্রতিভা হাজার বছরে একবারই আসে। কী না কী গান গেয়ে গেছেন ভদ্রলোক। এই গায়কের গায়কী এমনই, সুর এবং কথার বিচারে নিতান্ত মামুলি গানকেও পরিবেশন এবং গায়কীর জোরে একটা জায়গায় পৌঁছে দিতে পারতেন তিনি। ছোটবেলায় অন্য সবার মতো আমারও ভগবানে বিশ্বাস ছিল। ভগবানকে বলতাম, গায়ক হলে যেন কিশোরকুমারের মতো হতে পারি। কোন জায়গাটায় ভাল লাগত, সেটা ব্যাখ্যার বয়স তখনও হয়নি। আজকে বুঝি, আমাকে সবথেকে বেশি আকৃষ্ট করত কিশোরকুমারের স্বাধীন সত্তা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা।

আসলে কিশোরকুমারের জীবনদর্শন ছিল একটু অন্য রকম। খোলা মনে বাঁচতে চাইতেন বলেই অনেক রকম আবেগ জমাতে পারতেন মনের গহনে। মনের ভিতর একটা গোটা আলমারি জুড়ে গোছানো ছিল থাক থাক আবেগ, সাজানো ছিল সব প্রশ্নের উত্তর। তাই হাসি-মস্করার গান যেমন গেয়েছেন, তেমনই প্রাণসঞ্চার করেছেন অব্যক্ত যন্ত্রণার গানে। অবলীলায় মিশিয়ে দিয়েছেন দেশ-বিদেশের ঘরানা। সব বিভাগেই শ্রেষ্ঠ, লঘুসংগীতের বিস্তৃত ক্ষেত্রটিতে এমন অলরাউন্ড পারফর্মেন্স আমি মাইকেল জ্যাকসন ছাড়া খুব একটা দেখিনি।

তেমনই, অভিনেতা হিসেবেও কিশোরকুমারের অননুকরণীয় ভঙ্গীর বাঁধন ছেঁড়া অভিনয়, যা দেখলে গুলিয়ে যেতে পারে: কোন যুগের নায়ককে দেখছি— এই হিসেব। সেই সময়ের অন্য প্রায় সব নায়কই ঈষৎ নাকিসুরে ন্যাকা ভঙ্গীমায় সুললিত ডায়ালগ বলছেন, সেখানে কিশোরকুমারের স্মার্টনেসের স্পর্ধা বিস্মিত করে। ভাবতে বাধ্য করে, এই লোকটা এলিয়েন নয় তো?

কিশোরকুমারকে নিয়ে এর আগে আমি কোনও নিবন্ধ লিখিনি। আজকেও লিখছি না। তাই তাঁর চলচ্চিত্র পরিচালনা বা সুর সংযোজনার হীরক দ্যুতির প্রতিসরণ এই লেখায় থাকবে না। আজকের লেখাটি একটি সিনেমা সম্পর্কিত। সিনেমার নাম ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’।
 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

কিশোরকুমার হাজার বছরে একবারই আসেন। এটা আমার মতো এই ছবির নায়কও বিশ্বাস করেন এবং জানান দেন। আমি কথাটি বলে যেমন অনেকটা সময় ধরে ব্যাখ্যা করলাম, তেমন ব্যাখ্যা অবশ্য ছবিটিতে নেই। কারণ ফিলমে এই কথাটা বলা হচ্ছে একটা উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার মাঝখানে। অনভিপ্রেত এই বাদানুবাদে ছবির শুরুর দিকে জড়িয়ে পড়েছিল ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র কিশোরকুমার জুনিয়র এবং তাঁর টিনএজ ছেলে। বাবা বিখ্যাত কিন্তু অসংযমী। মদ খাবেন না খাবেন না ভাবেন, কিন্তু ছাড়তে পারেন না। এই অভ্যেস ছেলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ায়। ফলে, কিশোরকুমার কেন হাজার বছরে একবার আসেন, তা বুঝে ওঠে না ছেলে।
 

ছবির ডাবিং-এ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়


প্রসঙ্গত বলে রাখি, ছেলেটিও গানবাজনা করে এবং আপনি যা ভাবছেন ঠিক তাই, ছেলেটি মজে আছে ব্যান্ডসঙ্গীতে। হালকা ভাবে দু’পক্ষকে লড়িয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল প্রথম দিকে। আমার বিচারে এর বাস্তব অস্তিত্ব নেই, থাকতে পারে না। ব্যান্ডসংগীতের বৃত্তে আমার তো কম দিন হলো না। এ জিনিস চোখে পড়েনি। তবে দুই পক্ষের লড়াই বাঁধলে নাটক জমে। আর নাটক জমিয়ে দেয় বাস্তবের খানিকটা বাইরে বিরাজ করা ফর্মুলা। তাই আমার বিচারে টিনএজ ছেলের ব্যান্ড প্রাপ্তি অপ্রত্যাশিত নয়, প্রত্যাশিত ফর্মুলা।

তবে পরিচালক ঠিক সময়েই বুঝে ফেলেন, কিশোরকুমার এবং ব্যান্ডসঙ্গীত দুই জমকালো প্রতিপক্ষ হতে পারে না। ছবির একটি পর্বে মহম্মদ রফি এবং কিশোরকুমার তাই যুযুধান সাংগীতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে আসেন। কিশোরকণ্ঠী প্রসেনজিৎ এবং রফিকণ্ঠী লামা (লামাকে মহম্মদ রফির গান গাইবার সময় খানিকটা রফির মতোই দেখতে লেগেছে) খুব দ্রুত ‘দোস্তানা’ ছবির ডুয়েট গান ‘বনে চাহে দুশমন’ গেয়ে সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। বাড়তি সাধারণ জ্ঞান হিসেবে জানিয়ে দেওয়া হয়, কোন ছবিতে নায়ক কিশোরকুমারের গলায় প্লেব্যাক করেছিলেন মহম্মদ রফি। ব্যস, ঝগড়া শেষ।

(অবশ্য ছবিতে একটি গানের কথা বলা হলেও এরকম বেশ কয়েকটি গান আছে। আমি জানতাম না। বাড়ি এসে গুগল করে জানলাম। পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ দেবো দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।)

প্রধান দুই প্রতিপক্ষ তাহলে কে? আজ্ঞে হ্যাঁ! এক এবং অদ্বিতীয় সেই ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানি উগ্রপন্থী অথবা দস্যুদলের হাতে বন্দী গায়ক এবং গায়কের দলবল। ভারতীয় গায়কের দল চলেছিলেন মরুভূমির বুকে মৈত্রী কনসার্টে গাইতে। যে ভিলেনদের কখনও মনে হয়েছে— না, এরা ডাকাত নয়, আবার কখনও মনে হয়েছে— না, এরা উগ্রপন্থীও নয়— এরাই বয়ে আনে মূল সমস্যা। ক্লাইম্যাক্সে মুক্তির সন্ধানে জয়সলমীরের মরুভূমিতে উটের পিঠে চড়ে যাত্রা। অর্থাৎ, নস্ট্যালজিয়া। বাংলা ছবির নায়ক অনেক সময় নস্ট্যালজিয়ায় আক্রান্ত হলে, স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লে উদাস চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকেন, হাতে থাকে সদ্য খুলে নেওয়া চশমা। এই ছবিতেও সব সমস্যার সমাধান হয়ে(প্রায়!) অবতীর্ণ হয় একটি ঐতিহাসিক চশমা।

আমি কিশোরকুমারের ভক্ত। তবে কিশোরকুমারের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হলো একটি গান। ‘লুকোচুরি’ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় তাঁর গাওয়া সেই বিখ্যাত গান, ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’। আমার প্লেব্যাক জীবনের গোড়ার দিকে ‘শুকনো লঙ্কা’ ছবিতে এই গানটি গেয়েছিলাম আমি, পর্দায় নেচেছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’ ছবিতে আবারও পর্দায় এসেছে এই গানটি, পর্দায় অনবদ্য ভঙ্গিমায় এতে প্রাণসঞ্চার করেছেন প্রসেনজিৎ। প্রসেনজিৎ নিজেই যে একটি প্রতিষ্ঠান, তা আমার বলবার অপেক্ষা রাখে না। প্রায় চার দশক জুড়ে নানা ঢঙের এবং রঙের চরিত্রে যেভাবে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছেন ভদ্রলোক, অচিন্ত্যনীয়। আমার সৌভাগ্য বুম্বাদার বেশ অনেক ক’টা ছবিতেই জনপ্রিয় গান গাইবার সুযোগ পেয়েছি আমি। তবে আমার নস্ট্যালজিয়াকে উস্কে দেয় বুম্বাদার ‘কাকাবাবু’ সিরিজের ছবিগুলোতে একের পর এক ‘কাকাবাবু থিম সং’ গাইবার সুযোগ। এ’ছবিতে প্রসেনজিতের জাঁদরেল গোঁফটি কাকাবাবুর মতোই, মাথাতেও কাকাবাবু কাটিং একরাশ কোঁকড়া চুল (অবশ্য চুলের কেতাটি আলাদা)। বাকি রইল মোটা ফ্রেমের চশমা। ছোটবেলায় ‘আনন্দমেলা’ পূজাবার্ষিকীতে এই মোটা ফ্রেমের চশমায় কাকাবাবুর ছবি দেখবার একটা আলাদাই রোমাঞ্চ ছিল।এই ছবির শেষের দিকে কিশোরকুমার জুনিয়রের চোখে মোটা ফ্রেমের ঐতিহাসিক চশমাটি দেখে সেসব ড্রয়িং-এর কথা মনে পড়ে গেল।

কাকাবাবুর কথা এই জন্য মনে পড়ল, ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’ ছবিটি আদতে পুজো সংখ্যায় বেরনো কিশোর রহস্যরোমাঞ্চ উপন্যাসের মতোই অ্যাডভেঞ্চার গল্প। কাকাবাবুর গল্পের মতোই এই গল্পেও রয়েছে দুষ্টুমিষ্টি গুণ্ডাদলের হাতে অপহৃত হওয়া এবং প্রধান চরিত্রের মানসিক দৃঢ়তা আর সংযমকে হাতিয়ার করে, অপরাধীর মনকে পরিবর্তন করার মতো কথার চাতুর্যে সমাধান সূত্রটি পেয়ে যাওয়া। মদের নেশায় চূড়ান্ত অসংযমী নায়ক ড্রাই মরুভূমিতে মদের সাপ্লাই বন্ধ হতেই সংযমী হয়ে ওঠেন, নির্বিচারে অনেক অসভ্যতা সহ্য করেন এবং মন ভোলানোর অমোঘ অস্ত্র প্রয়োগ করেন। কাকাবাবুর গল্পে যে অস্ত্র হলো পাণ্ডিত্য এবং উপস্থিত বুদ্ধি, এই গল্পে তাই হলো কিশোরকুমারের গান। কিশোরকুমারের ঐতিহাসিক মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে বুম্বাদার তাকানোর দৃশ্যটি এভাবেই কোথাও গিয়ে কিশোরকুমার আর কাকাবাবুকে মিলিয়ে দেয়।

এটা পুজোর ছবি। আমাদের আগের প্রজন্ম শারদ বাতাসের আবহে ছাতিম ফুলের গন্ধ মাখা সন্ধেগুলোতে অনিবার্যভাবে পেয়েছিল কিশোরকুমারের গান। সে সময়ে ধারাবাহিকভাবে হিন্দি এবং বাংলা, দুই ভাষাতেই একই সুরের গানের রেকর্ড বেরোত। এই ছবিকে সেইসব গানের একটা এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যেতে পারে। আমার প্রজন্মের ‘পুজো আসব আসব’ আবহে ছিলেন তৎকালীন কিশোরকণ্ঠী কুমার শানু। সে সময়ে একের পর এক পুজোতে অরূপ-প্রণয়ের সুরে তাঁর ক্যাসেট বেরোত। ‘সুরের রজনীগন্ধা’, ‘প্রিয়তমা মনে রেখো’ ইত্যাদি বেসিক বাংলা গানের অ্যালবাম সুপারডুপার হিট ছিল। পুজোর সন্ধেগুলোতে লাউডস্পিকারে যখন তা ভেসে আসত, ওই গানগুলোর ভাষায় সুরে এবং যন্ত্রানুষঙ্গে আমরা কোথাও কিশোরকুমারের লিগ্যাসিকেই ফেরত পেতাম। পুজোর গান, পুজোর জলসা, পুজোর রহস্য রোমাঞ্চ অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি, সব কিছুই একটা অনবদ্য মোড়কে ফিরিয়ে এনেছে ‘কিশোরকুমার জুনিয়র’। 
 

কিশোরকুমার জুনিয়র ছবির পোস্টার। ছবি: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ফেসবুক
 


ভীষণ নস্ট্যালজিক লাগল কুমার শানুকে আবার ফেরত পেয়ে। খুব বাস্তবানুগ গল্প নয়, কিন্তু পুজোসংখ্যায় আমরা তা চাইও না। আমরা চাই পুজোর ছুটিতে হারিয়ে যাওয়ার ফ্যান্টাসি। এই গল্প জলজ্যান্ত এক মিউজিক্যাল ফ্যান্টাসি।

জলজ্যান্ত যখন বললাম, তখন প্রাণসঞ্চার করলেন কে কে তাও তো বলতে হয়। পরিচালককে ধন্যবাদ দেবো, সপরিবারে দেখার মতো এমন একটি ছবি ভাববার জন্য। পারিবারিক অশান্তি দিয়ে ছবি শুরু হলেও শেষমেশ পরিবারের বন্ধন শক্তিশালী হয় এ ছবিতে। সপরিবারে দেখতে আসা দর্শক অবশ্যই সেই বার্তাটি পাবেন। সংগীত পরিচালক ইন্দ্রদীপ ক্লাসিক গানগুলোর পুনর্নির্মাণ এবং ব্যাকগ্রাউন্ড সৃষ্টিতে অনবদ্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বিশেষ করে মন ছুঁয়েছে ‘ও শাম কুছ আজিব থি’ এবং ‘এই যে হেথায় কুঞ্জছায়ায়’ গান দু’টির পরিবেশন ও চিত্রায়ণ। ছবির একটি রক কনসার্টের দৃশ্যের জন্য বাংলা রক ব্যান্ড ‘পৃথিবী’-র যে গানটি নির্বাচন করা হয়েছে, সেটির কথা এবং সুরও ছবির কাহিনির সঙ্গে সুন্দর সাযুজ্য রেখেছে। মোদ্দা কথা বলতে গেলে, সবার কনট্রিবিউশনই তারিফ যোগ্য।

তবে এত তারিফ যোগ্য টিমওয়র্ক হয়েও এ ছবি কি সমস্যায় পড়েনি? নিশ্চয়ই পড়েছে। অবধারিত ভাবে পড়েছে। তবে সেইসব সমস্যার কথা আমি এই নিবন্ধে তুলতে চাই না। বরং আমি বলব এসব সমস্যার সমাধানে আসল ভূমিকা নিল কে।

আগেই বলেছি, গল্পতে উদ্ভুত সমস্যায় ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল একটি ঐতিহাসিক চশমা। আর এবার বলছি: বেশ খানিকটা অবাস্তব প্লটের ফ্যান্টাসিতে বয়ে যাওয়ার অনিবার্য বিপদ থেকে বীরের মতো সংযমী লড়াই লড়ে ছবিটিকে রক্ষা করেছেন পর্দায় ওই চশমা পরেছেন যিনি, অর্থাৎ বুম্বাদা। অসাধারণ বললে কম বলা হয়। আরেকজন হলেন অপরাজিতা আঢ্য। তিনিও এ ছবিতে অতুলনীয়া।

বিধিসম্মত সতর্কীকরণ: ‘‘আমরা বাঙালিরা বৃহস্পতি বার চিকেন মটন খাইনা। যেমন তোমরা মুসলমানেরা শুয়োর খাওনা।’’ এ ধরনের একটা ডায়লগ আছে ছবিতে। মানছি, সমাজ মানসে ‘বাঙালি’ আর ‘হিন্দু’ গুলিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা চালু আছেই। তবে সিনেমার মতো বৃহৎ মাধ্যমে তাকে আস্কারা দিলে, বিপদ বাড়বে বই কমবে না। একটু ভাববেন।

রূপম ইসলাম:   ১৯৯০ এর দশকে যাঁরা বাংলা ব্যান্ডকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন, রূপম  ইসলাম তাঁদের অন্যতম।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -