SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

বন‌্ধের নামে মিলল ছুটি, টাক ডুমাডুম ডুম, মমতা তৃপ্ত, বাঙালি আহ্লাদিত

জানুয়ারি ১০, ২০১৯
```` Comments
এ বারের ৪৮ ঘণ্টা বাম-বন‌্‌ধে কাজে এসেছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য এখনও কোনও সুখবর মুখ্যমন্ত্রী দেননি। কিন্তু আশা ছাড়ার কোনও কারণ নেই।

বন‌্ধ মানে ছুটি। বাঙালির অভিধানে একটাই মানে। এই বাঙালির দৌলতেই তো একদিন ‘Bandh’, ‘Gherao’ ইত্যাদি শব্দ অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে জায়গা করে নিয়েছিল। সে কী আনন্দের দিন বাঙালির! এত বড় অবদান আর কোন জাত রাখতে পেরেছে! কিন্তু বাঙালির সেই বন‌্ধ-আনন্দ আর তেমন করে নেই। বাম জমানায় বামেরাই ব‌ন‌্ধ ডাকত। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বন‌্ধ। সুতরাং, কিছু বলা যাবে না। মেহনতি মানুষের পক্ষে সরকারি বন‌্ধ আক্ষরিক অর্থেই ছিল সরকারি ছুটির দিন।

আহা, কী আনন্দ! — ফাইল চিত্র

সেই সব দিনে বিরোধীদেরও বন‌্ধ ডাকার আনন্দ ছিল। ডাকলেই হল। রাস্তায় রাস্তায় ক্রিকেট খেলা, বাড়িতে বাড়িতে পিকনিক। খবরের কাগজে পরদিন সকালে শুনশান হাওড়া ব্রিজের ছবি। এখন আর তেমনটা হয় না। কারণ, একদা বন‌্ধপ্রেমী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পরে উপলব্ধি করেছেন এ হল ‘কর্মনাশা’। ছুটির দিনে কাজ না হলে, কর্ম নাশ না হলেও, বন‌্‌ধের দিনে অবশ্যই হয়। তাই নবান্নে খিচুড়ি, চিলি চিকেন রেঁধে কর্মীদের রেখে দিতে হয়। রাতে টেবিলে ফাইলে মাথা রেখে ঘুম। আবার সেই কৃচ্ছসাধনের জন্য পরে এক দিন ছুটি।

এ বারের ৪৮ ঘণ্টা বাম-বন‌্‌ধে কাজে এসেছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য এখনও কোনও সুখবর মুখ্যমন্ত্রী দেননি। কিন্তু আশা ছাড়ার কোনও কারণ নেই। অতীতে যখন দিয়েছেন, তখন বর্তমান ও ভবিষ্যতেও নিশ্চয়ই দেবেন। ঠিক পুষিয়ে দেবেন। সপ্তাহান্তিক ছুটি লম্বা করে দিঘা-যাপনের মহার্ঘ সুযোগ দেবেন ঠিক। অথবা পুজোর ছুটি এগিয়ে আসবে। যা হোক কিছু একটা হবে।

দাদার শহর। মহারাজের শহর। — ফাইল চিত্র

কিন্তু এই দু’টো দিন, মানে, ঘুমের সময় ধরে ৪৮ ঘণ্টা কী করল বাঙালি? যাঁদের কাজে যোগ দিতেই হয়েছে, তাঁদের কথা বাদ। বাকিরা? কী করলেন? ছুটি কাটালেন। বন‌্ধ ডাকিয়েরা বলবেন— ওঁরা তাঁদের ইস্যুকে সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু বুক ঠুকে বলতে পারবেন কি ঘরে বসে শীতের দুপুর সপরিবারে কম্বল-সুখ নেওয়া বাঙালির ক’জন জানে এই বন‌্ধ কেন? কী সেই দাবি? এই প্রতিবাদ কার বিরুদ্ধে? মোদীর কেন্দ্র, নাকি মমতার রাজ্য?

না, এ সব ভাবে না বাঙালি। অনেক দিন ধরেই বাঙালির কাছে বন‌‌্ধ মানে বাড়তি ছুটি কাটানোর অধিকার। গণতান্ত্রিক অধিকার। আর যাঁদের ঘর ছেড়ে পথে বের হতেই হবে তাঁদের কাছে স্বস্তির অধিকার। হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই উলটো পথের যাত্রীরা লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে উঠে পড়বে না। বরং, অফিস টাইমেও ট্রেনে উঠে ‘উইন্ডো সিট’-এর অনেক অপশন মিলবে। ই-ওয়ানের কন্ডাক্টর ‘সিট নেই’ বলে নামিয়ে দেবেন না। বরং, চিৎকার করে যাবেন— ‘‘যাদবপুর, সিট খালি, যাদবপুর, সিট খালি...।’’

একেবারে উলটো দিকের কথা তো বলাই হল না। শাসকপক্ষ। তার হাতে আবার পরিসংখ্যান। সে সব জটিল অঙ্ক দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যাবে— কত কর্মী, কত কাজ করলেন। কত বাস চলল। কত বাসে কত যাত্রী, কত দোকানে কত কেনাকাটা হল। 

বিপদের পথ। — ফাইল চিত্র

কোনটা যে সত্য! জানে শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা। মঙ্গল-বুধ ওরাই দেখেছে কলকাতার পথ-ঘাট। দেখেছে আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ো বাসেরা অনেক দিন পরে টার্মিনাস-ছাড়া হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ছুটেছে। ঘোষণা মতো, সরকারি বাস বাড়াতে ওরাই তো ভরসা! পলিউশনকে তোয়াক্কা না করে কালো ধোঁয়া পিছনে রেখে এগিয়ে গিয়েছে। প্রশাসনের লাল চোখের ভয়ে একটুও না থেমে ‘সংখ্যা’ হয়ে ছুটেছে। এখন শাসক লালবাড়ি মহাকরণে থাকে না। সিসিটিভি-র ক্যামেরাই শাসকের ‘লাল চোখ’।

বন‌্ধ মানেই এক দূষণ। সে দূষণ দিন দিন বাড়ছে। পুরনো গাড়ির ধোঁয়া শুধু নয়, দূষণ অনেক রকমের। এক দিন যা ছিল রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদের অস্ত্র, তা-ই এখন বার্ষিক কর্মসূচি। ডাকতে হয়। ডাকতেই হয়। আর এক দূষণ— বন‌্ধ ব্যর্থ করতে রাষ্ট্রশক্তির প্রয়োগ। বন‌্ধ বিরোধিতা ভাল উদ্যোগ। কিন্তু অফিস কামাই হলে মাইনে কাটা যাওয়ার ভয় নিয়ে ছোটার ঝুঁকিটা দিন দিন বাড়ছে। 

দোহাই, বন‌্ধ দিয়ে বাঙালিকে আর আহ্লাদিত করতে হবে না। বরং এবার একটা পাক্কা নীতি হোক। হয় ধর্মঘট পুরোপুরি ‘সিদ্ধ’ কিংবা পুরোপুরি ‘নিষিদ্ধ’ হোক।

পিনাকপাণি ঘোষ: রাজনীতি থেকে ঠেকবাজি, ধুলোগড় থেকে ধুলোঝড়, সবেতেই স্বচ্ছন্দ। ভালবাসেন টিপ্পনি কাটতে।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -