SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

হনুমান, তুমি কার, জাত-বেজাতের তর্কে বজরঙ্গবলীর অবস্থান ঠিক কোথায়

ডিসেম্বর ৩, ২০১৮
```` Comments
যোগী আদিত্যনাথ কিছুদিন আগে হনুমানকে ‘দলিত’ বলে উল্লেখ করার পর থেকেই খেলা জমেছে। রাজনীতির বলীবর্দ পুরুষরা স্বেচ্ছাসেবী হয়ে হনুমানের জাত নির্ণয়ে নেমে পড়েছেন।

সাহিত্যিক লীলা মজুমদার সেই কোন কালে তাঁর ‘লঙ্কাদহন পালা’ নাটকে লিখেছিলেন— ‘‘রামায়ণের বাহাদুর রামচন্দ্র নয়/ দু’হাত তুলে বলো সবাই হল্লুমানের জয়।’’ সেই ছড়াকে সত্য প্রমাণিত করেই রাম বা অযোধ্যা নয়, ভারতের জাতীয় ডিবেটের কেন্দ্রে এই মুহূর্তে হনুমান। পবননন্দন শ্রী হনুকে ঘিরে এই মুহূর্তে উত্তাল বিতর্ক। কে তিনি? কী তাঁর জাতি-পরিচয়? এই নিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন রাজনীতিবিদরা। 

গেরুয়া রাজনীতির অন্যতম মুখ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ কিছুদিন আগে হনুমানকে ‘দলিত’ বলে উল্লেখ করার পর থেকেই খেলা জমেছে। ভারতীয় রাজনীতির বলীবর্দ পুরুষরা স্বেচ্ছাসেবী হয়ে হনুমানের জাত নির্ণয়ে নেমে পড়েছেন। ন্যাশনাল কমিশন অফ শিডিউলড ট্রাইবস-এর চেয়ারপার্সন নন্দকুমার সাই সোজাসুজি জানিয়েছেন, হনুমান ‘দলিত’ নন। তিনি ‘ট্রাইবাল’। তাঁর মতে, কানওয়ার উপজাতির মধ্যে ‘হনুমান গোত্র’ প্রচলিত রয়েছে। সুতরাং হনুমান ‘তাঁদেরই লোক’।

এমন চাপান-উতোরের মাঝখানে নাক গলিয়েছেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী সত্যপাল সিংহ। তাঁর মতে, রামচন্দ্রের আমলে ‘কাস্ট সিস্টেম’ সে ভাবে চালু ছিল না। তাঁর মতে, হনুমান নির্ঘাত আর্য ছিলেন। তিনি আর্য সমাজেরই কোনও মহাপুরুষ ছিলেন।


সত্যপাল সিংহের যুক্তির পিছনে রয়েছে আর্যায়ন তত্ত্ব, ছবি: উইকিপিডিয়া

আদিত্যনাথের ‘আদারাইজেশন’, নন্দকুমারের ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন’ আর সত্যপালের ‘এরিয়ানাইজেশন’— এই তিন কীর্তিতে ঘোল খেয়ে যেতে পারেন ঘাঘু নৃতাত্ত্বিকরাও। সত্যিই তো, মহাকাব্য-বর্ণিত এই মহাবানরের পরিচয় কী? 

আমাদের পরিচিত হনুমানের মূর্তি বা ছবিতে অনেক সময়েই তাঁকে আমরা পৈতে পরিহিত অবস্থায় দেখি। সেদিক থেকে দেখলে তাঁর একটা ‘ব্রাহ্মণ’ পরিচয় বাজারে চলিত রয়েছেই। দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘লোকায়ত দর্শন’-এর ফর্মুলা মানলে উপনয়ন আর্যায়ন প্রক্রিয়ারই উপজাত। তাঁর মতে, ট্রাইবাল দেবতা শিবকে পৈতে পরিয়েই ব্রাহ্মণ্যধর্মের ‘মহাদেব’ করে তোলা হয়েছিল। সেই যুক্তিতে দেখলে হতেই পারে, বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে বাসরত ‘বানর’ হনুমানের গলাতেও উপবীত ঝুলিয়ে তাঁকে টেনে আনা হয়েছে তথাকথিত হিন্দু দেবলোকে। 


পৈতে পরিহিত হনুমান মূর্তি, ছবি: শাটারস্টক

নর ও বানরের সখ্য নিয়ে ‘রামায়ণ’ যাই বলুক, নতুন কিছু যে বলেনি, তার প্রমাণও রয়েছে হাতের কাছেই। ‘ঋগ্বেদ’-এর ১০.৮৬ সূক্তে এক ‘দৈব বানর’-এর কথা উল্লিখিত রয়েছে। তাকে ‘বৃষকপি’ বলে উল্লেখ করেছেন স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র। সেই ‘বৃষকপি’-ই যদি ভোল বদলে মহাকাব্যের যুগে এসে হনুমানে পরিণতি পেয়ে থাকেন, তো সত্যপালই সত্য। তিনি আর্য। 

কিন্তু সমস্যা এই, প্রাচীন দ্রাবিড় সভ্যতাতেও উল্লেখ পাওয়া যায় মহাপরাক্রান্ত বানরের। ১৯ শতকের ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ ফ্রেডেরিক এডেন পারগিটার ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ-সহ দেখিয়েছেন, হনুমান আসলে এক প্রটো-দ্রাবিড় দেবতা। তামিল ভাষায় ‘আনা-মান্ডি’ শব্দটির অর্থ ‘পুরুষ বানর’। সেখান থেকেই নাকি ‘হনুমান’ শব্দটির উৎপত্তি। এই মত মানলে হনুমান ‘ট্রাইবাল’। কারণ তিনি ‘প্রটো-দ্রবিড়’ সমাজ থেকে আগত। সেই সমাজ তখনও পূর্ণ ‘দ্রাবিড়’ হয়ে ওঠেনি। এই মত মানলে নন্দকুমার সত্য। 


খেলা শুরু করেছেন যোগীজিই, নিজস্ব চিত্র

বাকি থাকলেন যোগী আদিত্যনাথ। তাঁর মতে, হনুমান দলিত। এখন যোগীজির অন্তরে ভোট না শাস্ত্র— ঠিক কোন ব্যাখ্যা কাজ করেছে, তা বর্তমান কলমচির জানা নেই। কিছু অনুমান এই অবসরে করা যেতে পারে। ‘রামায়ণ’-এর কহিনিতে হনুমান ক্ষেত্রজ সন্তান। তাঁর মা বানরী অঞ্জনা, পিতা বানর কেশরী। কিন্তু তিনি পবনদেবের ঔরসজাত। তাঁকে কি সেই কারণেই জাত-কাঠামোর মধ্যে তাঁকে ফিট করাতে পারছেন না যোগী? তাই কি তিনি তাঁকে ‘দলিত’ বলে পেন্ট করতে তৎপর? নাকি, শ্রীরামচন্দ্রের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শনকারী এক ‘অবমানব’ বলেই তিনি ‘দলিত’? নাকি, যোগীর মন্তব্যের পিছনে রয়েছে গেরুয়া শিবিরের অন্দরমহলের শ্রেণি বিভাজন। মস্তিষ্ক স্বরূপ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা আরএসএস ‘ব্রাহ্মণ’, কর্মেন্দ্রিয় ভারতীয় জনতা পার্টি ‘ক্ষত্রিয়’ আর ভাবী রাম মন্দিরের ইট-পাথর বহনকারী বজরঙ্গ দল ‘দলিত’। এমন কিছু বোঝাতে চাইছেন না তো গেরুয়া থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক? কে জানে, হনু-রাজনীতির শিরা-উপশিরায় কোন অভিসন্ধি খলবল করছে!


জাতপাতের ঊর্ধ্বে ‘অমর’ বজরঙ্গবলী, রাজনীতি তাঁর কী করবে? ছবি: শাটারস্টক 

এতে অবশ্য হনুমানের কিছু যায় বা আসে না। তিনি জানেন, ‘রামায়ণ’-এর বাহাদুর রামচন্দ্র কিছুতেই নন। তিনিই যুগে যুগে কালে কালে রামকথায় নমক জুগিয়েছেন। তাঁকে হিরো ওয়ারশিপ করছে আসমুদ্রহিমাচলের আবহমান। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ব তাঁকে অবমানব হিসেবে দেখায়। তাতে তার কাঁচকলা। তিনি অমরত্বপ্রাপ্ত এক সত্তা। তিনি বেঁচে রয়েছেন ভারতবাসীর স্মৃতি ও সত্তায়। ‘রামায়ণ’-এ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় রামচন্দ্র যদি পরমতত্ত্ব হয়ে থাকেন, তবে তিনি কর্মভাগ। যাকে না পেরলে পরমে পৌঁছনোই যায় না। তিনি বেঁচে আছেন হ্যাজাক জ্বলা ‘রামায়ণ-যাত্রা’-র আসরে। তিনি বেঁচে আছেন ‘হনুমান চল্লিশা’-র একান্ত ছন্দে। তিনি বেঁচে থাকবেনই। কারণ তাঁর মৃত্যু নেই, এ কথা ‘রামায়ণ’-ই জানায়। সর্বোপরি তিনি জাতপাতের ঊর্ধ্বে। তিনি বিরাজ করেন ‘মৌলা আলির পালা’-তেও। ভারতীয় সমাজের ঘাসরুট (‘তৃণমূল’ লিখতে চাই না) তিনি সম্প্রদায়-জাত-গোত্রের বাইরে বিরাজনাম এক সত্তা। তাঁকে ভালবাসে এই উপমহাদেশের সাধারণ। তিনি বেঁচে থাকেন বলিউডি রি-ইনকারনেশনেও। দারা সিংহের মধ্যে যেমন তিনি ছিলেন, তেমনই সলমান খানের মধ্যেও তিনি থাকছেন। যোগী বা তাঁর দলবলের হিসেব নিকেশে সেই বিরাট সত্তার সত্যিই কিস্যু যায় আসে না।   

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়: ভালবাসেন কবিতা আর ভূতের গল্প। গান শোনা আর বই পড়াতেই মোক্ষ।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -