SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

চোখের সামনে হারিয়ে যাবে কলকাতা, আমরা কি ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে দেখব

অক্টোবর ২৪, ২০১৮
```` Comments
এমতাবস্থায় এই বিরল হেরিটেজ বিল্ডিংটিকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৃথিবীর অন্য যে কোনও দেশ হলে সরকারই নিত। কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিং সংস্করণের শুরুয়াতেই তো বোঝা গিয়েছিল, এই ধরনের স্থাপত্যের সঠিক পরিচর্যার পরিকাঠামো এই শহরে নেই। আর ইতিহাস সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগে যে ঔদাসীন্য চরম, সে ব্যাপারে নীরব থাকাই ভাল।

বনেদি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বাড়িঘর বললে চোখের সামনে কোন দৃশ্য ভেসে ওঠে? ইতালিয়ান সিংহ-ওয়ালা সিংহদরজা পেরিয়ে বিরাট সদর, বেলজিয়াম টাইলস-এর মেঝে, বার্মাটিকের আসবাব, সাতরঙা শার্সি যেন কোনও বড় শিল্পী সাজিয়ে দিয়েছেন। বসুশ্রী সিনেমার পাশেই কালীঘাটের ৪৭/এ, গুরুপদ হালদার রোডের মুখে প্রাসাদোপম বাড়িটি ঠিক তাই। এক বিঘা তিন ছটাক জমির উপরে ৪০টি ঘর, ৪টি ছাদওয়ালা বাড়িটি কলকাতার অন্যতম হেরিটেজ বিল্ডিং। এই বাড়ির দালান-গম্বুজে যেভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে হুতোমের কলকাতা, তাকে জানতে বুঝতে গেলে ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের দু’দিন সময় লাগত। লাগত বলতে হচ্ছে কারণ, বাড়িটি ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে অন্তিম শ্বাস নিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসস্থান থেকে হাঁটাপথের দূরত্বে প্রোমোটারের থাবায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে ৪৭/এ, গুরুপদ হালদার রোডের গুরুপদ হালদার নির্মিত স্বপ্নের খাসমহলটি। ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

প্রায় ২০০ বছর আগে কালীঘাট মন্দিরের অন্যতম সেবায়েত কেনারাম হালদার এই বাড়িটি তৈরি করেন। তাঁর ছেলে গুরুপদ হালদার বাড়িটিকে তিলে তিলে সাজিয়েছিলেন। বিদেশ-বিভুঁই থেকে আনিয়েছিলেন শৌখিন সামগ্রী। সে সময় গ্রেকো-রোমান স্থাপত্যের সিংহ সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বাড়িতে লাগানোর চল ছিল। চল ছিল, ইংল্যান্ড থেকে ডেকোরেটিভ সানলাইট গ্রিল আনার। কার্পণ্য করেননি গুরুপদ। খাস কলকাতার অন্যতম প্রধান স্থাপত্যটিকে তিনি নির্মাণ করেন অতি যত্নে। মৃত্যুর আগে উইলে ‘স্ত্রী-ধন’ করে দিয়ে যান গোটা সম্পত্তিটিকে। অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী ছাড়া সম্পত্তিটি সম্পর্কে কেউ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। গুরুপদবাবুর স্ত্রী ১৯৫৬ সালের ৩১ জানুয়ারি ২ ছেলে ও নাতিকে বেশ কিছু বিষয় সম্পত্তি দেন। শুধু বাড়িটিকে ‘ট্রাস্ট’ সম্পত্তি করে দেন। অর্থাৎ বিনা খাজনায় বসবাস, রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলেও তা বিক্রয় করতে পারবেন না কেউ।
 

বাড়ির লাগোয়া শিব মন্দির। নিজস্ব ছবি

 

এমতাবস্থায় এই বিরল হেরিটেজ বিল্ডিংটিকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৃথিবীর অন্য যে কোনও দেশ হলে সরকারই নিত। কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিং সংস্করণের শুরুয়াতেই তো বোঝা গিয়েছিল, এই ধরনের স্থাপত্যের সঠিক পরিচর্যার পরিকাঠামো এই শহরে নেই। আর ইতিহাস সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগে যে ঔদাসীন্য চরম, সে ব্যাপারে নীরব থাকাই ভাল। ফলে কলকাতাবাসীর চোখের সামনে বাড়িটি ধুঁকছিলই।

সেই সুযোগই নিয়েছেন বাড়ির শেষ প্রজন্ম। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবিটিরই বাস্তব দৃশ্যায়ন যেন। প্রোমোটারের হাতে বাড়িটি তুলে দিয়েছেন গুরুপদ হালদারের বংশধরেরা। কিন্তু তা কি আইনত সম্ভব? এই জিজ্ঞেসা নিয়েই ২০১৫ সালের ২০ মার্চ নিম্ন আদালতে খোদ বাবার বিরুদ্ধেই সিভিল মামলা দায়ের করেন এই বংশের কনিষ্ঠতম সন্তান প্রিয়জিৎ হালদার। ২০১৮ সালের গোড়ায় নিম্ন আদালত জানান দেয়, কোনও ভাবেই এই বাড়ি বিক্রয়যোগ্য নয়। প্রিয়জিৎ-এর বাবা হাইকোর্টে মামলা নিয়ে যান। সেই মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই বাড়ির কফিনে শেষ পেরেক।

পুজোর সময়ে যখন আদালতের কাজকর্ম পুরোপুরি বন্ধ, হঠাৎ হামলা চালায় প্রোমোটার। দু’দিনের মধ্যে ভেঙে ফেলা হয় বাড়িটির ষাট শতাংশ। প্রোমোটারের যুক্তি, মিউনিসিপ্যালিটি অনুমতি দিয়েছে। স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই বোঝা যায় কুযুক্তি, আইনের এক্তিয়ারে থাকা বিষয়ে পুরসভা নাক গলাতেই পারে না।

তবে কি জোর যার মুলুক তার? এই যুক্তিতেই এই শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্যে হাত বসাচ্ছে প্রোমোটার-চক্র? প্রিয়জিৎ চেষ্টার কসুর করেননি, আইনের পথে সমাধান চাইছিলেন তিনি। কিন্তু সিন্ডিকেট-প্রোমোটার-পরিবার— এই ত্রয়ীর বাহুবলের সঙ্গে লড়ার জোর তাঁর নেই। তাঁর থাকার অংশের জল ও বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। স্নান-খাওয়ার জন্য তাঁকে বাধ্য হয়ে প্রোমোটারের দেওয়া সাময়িক ভাড়াবাড়িতে যেতে হয়। বাকি সময় আলো-বিদ্যুৎহীন ভাবে কাটে।

এত বড় শহর, এত শিল্পরসিক, এত সমঝদার, সর্বোপরি ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা প্রশাসন, কারও চোথেই পড়ল না এই ধ্বংসের নির্মাণ! আশ্চর্য হতে হয় বৈকি। নাকি রাজনীতির নীল সাদা রঙের ধারের কাছে ফিকে হয়ে হয়ে যায় সাতরঙা বেলজিয়াম কাচের ভার? জানা নেই। তবে কিছু আশা এখনও অবশিষ্ট আছে। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক অমিত চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ক্যালকাটা আর্কিটেকচারাল লিগ্যাসির উদ্যোগে সাড়া দিয়েছেন বহু মানুষ। সামান্য হলেও টনক নড়েছে প্রশাসনেরও। হেরিটেজ কমিশন এই জায়গাটিকে ‘হেরিটেজ সাইট’-এর তকমা’ দিয়েছে। পুলিশি প্রহরাও বসেছে। আপাতত সকলেই তাকিয়ে আছে হাইকোর্টের রায়ের দিকে।

কালীঘাটের এই বাড়িটির ব্যাপারে এখনও ক্ষীণ আশার আলো আছে। ওয়েস্টবেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন এটিকে হেরিটেজ আর্কিটেকচারের মান্যতা  দেওয়া যায় কি না, সেটি খতিয়ে দেখছে।আপাতত আইনি সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনও অংশ ভাঙা চলবে না। যদিও বাড়িটির বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ক্যালকাটা আর্কিটেকচারাল লেগ্যাসি-র কাজ করতে নেমে বুঝেছি মানুষ কিন্তু যথেষ্ট সচেতন। তাঁরা চান না এমনটা হোক। গত ২৫ বছরে বহু এমন বাড়ি বিক্রি হয়েছে। তারপর তাকে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রোমোটারের হাতে। বাড়ির মালিকের এক্তিয়ার আছে তার নিজের সম্পত্তি বিক্রি করার। কিন্তু প্রোমোটারকে বাড়িটি দিয়ে দেওয়াই একমাত্র সমাধান নয়। বাড়ির মালিক সবসময় যে অর্থের প্রয়োজনেই বাড়িটি প্রোমোটারের তুলে দেন তাও কিন্তু নয়। আসল কথা ঔদাসীন্য। বাড়িগুলিকে অন্য ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি শহরের তো কিছু চিহ্ন থাকে, তা দিয়েই সেই শহরকে চেনা যায়। কলকাতার এই বাড়িগুলি তাঁর চিহ্ন। সেগুলিকে নষ্ট করলে কলকাতার কোনও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন আইন তৈরি করা, বলবৎ আইনগুলিকে শ্রদ্ধা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।



জানা নেই, এই প্রতিবেদন আসলে এপিটাফ কি না। তবে আশা আছে, এক আশ্চর্য নির্মাণ বুলডোজারের ক্ষত বুকে নিয়েও শেষমেশ টিকে থাকবে। আর স্বপ্নটুকু থাক পরিশেষে, এক দিন এই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই হয়তো শতকান্তে বৃদ্ধ নাগরিক শ্লাঘা নিয়ে প্রপৌত্রকে বলবেন, ‘‘দেখো কালচার ক্যাপিটাল একদিন কীভাবে বুক পেতে, বাজি ধরে বাঁচিয়েছিল সময়ের চেয়েও বড় মহাসময়ের স্মারককে।’’ শিশুটির চোখে থাকবে জাতিস্মরের বিস্ময়। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ (২০১২) ছবিতে কিন্তু শেষ হাসি হাসেনি প্রোমোটার।    

অর্ক দেবঃ  সম্পাদনায় স্বচ্ছন্দ, প্রিয় শখঃ বই পড়া, ছবি তোলা।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -