SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

সল্টলেক হোক বা হাওড়া স্টেশন, বাবা-মায়েদের কান্না থামা মুশকিল

নভেম্বর ১৪, ২০১৮
```` Comments
সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়েদের এই দূরত্ব যেন কিছুতেই মেটার নয়। কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সন্তানের আর্থিক অবস্থা, কোথাও সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সম্পত্তি নিয়ে টানাপোড়েন।

সল্টলেকের বুকে বিরাট বাড়ি। বাসিন্দা চার জন। প্রবীণ দম্পতির সঙ্গে এক জন আয়া, এক জন সব সময়ের পরিচারক। একমাত্র ছেলে বিদেশে চাকরি করেন। সত্তর পেরনো গৃহকর্তা এক সময়ে কলকাতা হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে চুটিয়ে ওকালতি করেছেন। শেষ জীবনেও তাই টাকা-পয়সার অভাব নেই। 

সল্টলেকের বিরাট বাড়িতে বসে সেই প্রবীণ মানুষটিই একদিন বলেছিলেন, ‘‘আমাদের এখানে অনেকের ছেলেমেয়েই বিদেশে থাকে। যখন তাঁরা প্রথম বার চাকরি-বাকরি পেয়ে বিদেশে যায়, গর্বে বাবা-মায়ের বুক ফুলে ওঠে। সবাইকে বড় মুখ করে তাঁরা সে কথা জানান। কিন্তু কয়েক বছর পরেই তাঁরা বুঝতে পারেন, ছেলেমেয়ের বিদেশে যাওয়াটা আসলে তাঁদের জীবনে কত বড় শূন্যতা তৈরি করেছে।’’

সল্টলেকের একাকী প্রবীণদের জন্য বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের একটি সামাজিক প্রকল্পের বিষয়ে খবর করতে গিয়ে এই প্রবীণ আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সেদিন সল্টলেকের ওই বিরাট বাড়িতে বসে থাকা একাকী সেই বৃদ্ধের সঙ্গে, মঙ্গলবার হাওড়া স্টেশনে উদ্ধার হওয়া স্বপ্না চট্টোপাধ্যায় যেন কী ভাবে মিলে যান। 

না, স্বপ্নাদেবীর ছেলে বিদেশে থাকেন না। তিনি গাঙ্গুলি বাগানে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। সেখানে মায়ের জায়গা না হওয়ায় কয়েক মাস আগে মাকে হাওড়া স্টেশনে ফেলে যান। সল্টলেকের ওই বৃদ্ধের জীবনে আর্থিক সংস্থান নিয়ে কোনও চিন্তা নেই, হাওড়া স্টেশনে পড়ে থাকা স্বপ্নাদেবীর ভরসা বলতে ট্রেনযাত্রীদের দিয়ে যাওয়া দু-দশ টাকা।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

তবু এক সময়ের ডাকসাইটে আইনজীবী সেই প্রবীণের চোখ, মুখে চেপে রাখা শূন্যতা আর হাওড়া স্টেশনে পড়ে থাকা স্বপ্নাদেবীর অসহায়তায় যেন অনেক মিল। হোক না তাঁদের দু’জনের চারপাশটা আলাদা। আসলে বাবা-মায়েদের এই হাহাকার যেন দিন দিন বাড়ছে। সল্টলেকের অট্টালিকায় বাইরে থেকে চোখে পড়ে না, স্বপ্নাদেবীর ক্ষেত্রে সহজেই মানুষের নজরে আসে।  

সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়েদের এই দূরত্ব যেন কিছুতেই মেটার নয়। কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সন্তানের আর্থিক অবস্থা, কোথাও সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সম্পত্তি নিয়ে টানাপোড়েন। আর তার সঙ্গে তো রয়েইছে ছেলে-বউমার সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ির মন কষাকষি।

সমস্যার সমাধান তবে কী? সহজ কথায় সোশ্যাল মিডিয়া বলছে, অভিযুক্ত ছেলে-বউকে আচ্ছা করে দু-চার ঘা দিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান। কেউ বলছেন, কড়া আইন চাই। মারধর, কড়া দাওয়াই, শক্ত আইন করেও তো অন্য অনেক অপরাধ বন্ধ করা যায়নি। এসব করে কি বাবা-মায়ের প্রতি উপেক্ষায় লাগাম টানা যাবে? যদি হয় তা হলে ভাল।

কিন্তু এই স্বার্থপরতার শুরুয়াত কোথায়? এমন নয় তো, ছোট থেকেই বাবা-মায়েরা সন্তানদের শুধু নিজেদেরটুকু নিয়েই ভাবতে শেখাচ্ছেন? পাড়া-প্রতিবেশী-বন্ধুরা তো থাকবেই, কিন্তু নিজেরটা না ভাবলেই ভবিষ্যত অন্ধকার, সন্তানদের মনে এই ‘স্বার্থপরতার বীজ’ বাবা-মায়েরাই বপন করে দিচ্ছেন না তো? বড় হয়ে নিজেরটুকু বলতে সন্তান যাদের বা যেটুকু বুঝছে, সেই বৃত্তে হয়তো নিজের বাবা-মাই থাকছেন না। সেই ভাবনাকে প্রশয় দিচ্ছে নানা ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি। 

কারণ যাই হোক না কেন, এই প্রবণতা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। বৃদ্ধা মাকে বাড়ির বাইরে ফেলে ছেলে-বউমা বেড়াতে চলে যাচ্ছেন, এমন খবর তাই বার বার সামনে চলে আসে। সন্তানের প্রথম শিক্ষা যেহেতু বাবা-মায়ের হাতেই, তাঁদেরই বোধ হয় আগে থেকে সতর্ক হতে হবে।

  • আরও পড়ুন :  
আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -