SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

বিয়ের সন্ধেয় সাতশো কোটি, হা-ভাতের দেশে ‘অশ্লীল’ আমোদ আর কত দিন

ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮
```` Comments
দেশ কাঁপছে তিনটি বিগ বাজেট বিয়ের গমকে। এই আড়ম্বর কি আসলে শবসাধনা? কোন পথে চলছে ভারতবর্ষ, ভাবার বিষয়।

অরুণ নাগ মহাশয় ‘চিত্রিত পদ্মে’ গ্রন্থে আমাদের পরিচয় করিয়েছিলেন হাবু পাগলার সঙ্গে। হাবু পাগলা দুপুরের রোদ পিঠে মেখে নানা গল্প বলে। বাবু রাজেন মল্লিকের বিয়ের গল্প। রাজেন মল্লিক হাজার টাকার আতর কিনে ঘোড়ার ল্যাজে মাখিয়ে সেই ঘোড়াকে সারা শহরে ঘোরান। ঘোড়া ঘুরবে, খুশবু উড়বে শহরের রাজপথে। মুড ভাল থাকলে হাবু বাবার বিয়ের গল্পও করে। চন্দননগরে হাবু পাগলার বাবার বরযাত্রী কাদায় পথে আটকে পড়লে হাবুর বাবা নাকি পাঁচ মন সন্দেশ বিছিয়ে দিয়েছিলেন তার উপরে যাতে বরযাত্রীর অসুবিধে না হয়!

উনিশ শতকীয় কলকাত্তাইয়া বাবু-বাড়ির শেষ উত্তরাধিকারী হাবুর বাবার গল্প আমরা পড়তে পেরেছি। ২০১৮ সালে আমরা গোটা তিনেক বিয়ে দেখলাম, যা ধারে-ভারে হার মানাবে হাবুর বাবার মতো উনিশ শতকীয় কলকাত্তাইয়া বাবুদের ঠমক-ঠামককে। 

ফিরিস্তিতে আসা যাক। বলিউডের রাজকন্যা-রাজপুত্র দীপিকা পাডুকোন ও রণবীর সিংহ-র বিয়ে হয় ইতালির লেক কোমোতে গত ১৪-১৫ নভেম্বর। সাত দিনের জন্য লোক কোমোর প্রাসাদ ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁরা। ভাড়া বাবদই মোট খরচ হয় এক কোটি তিয়াত্তর লক্ষ টাকা। সিন্ধ্রি মতে বিয়ের দিন দীপিকা নয় লক্ষ টাকার একটি ডিজাইনার লেহেঙ্গা পরেছিলেন। তাঁর গায়ে উঠেছিল এক কোটি টাকার গয়না। এ ছাড়া, মঙ্গলসূত্রের দাম ছিল কুড়ি লাখ টাকা। রাজকীয় বিবাহের সুরক্ষাও রাজকীয় হওয়া জরুরি। ১৪ ও ১৫ নভেম্বরের আড়ম্বরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে নিরাপত্তা সংস্থাকে দীপবীর মোট ১ কোটি টাকা দিয়েছেন, এমনও শিরোনাম হয়েছে।
 

সাত সাগর পেরিয়ে  লেক কোমোতে আনন্দে মশগুল দীপিকা-রণবীর। ফাইল চিত্র


আসা যাক, আরও এক মেগা বিয়ের কথায়। প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরে পড়ে কে জানে। প্রিয়ঙ্কা চোপড়া ধরা পড়েছিলেন সেই সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ৭৩ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রি-ওয়েডিং পার্টি সেরে পড়িমরি দেশে ফিরে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন পিগি চপস। যোধপুরের উমেদ ভবনে গাঁটছড়া বাঁধার জন্য ভাড়া বাবদ খরচ হয় তিন কোটি তিরিশ লক্ষ টাকার কিছু বেশি।
 

উমেদভবনে আনন্দে মশগুল নিক প্রিয়ঙ্কা। ফাইল চিত্র


আসরে শেষ প্রতিযোগী ছিলেন মুকেশ অম্বানী। বণিকের মাণদণ্ড বলে কথা। শেষ দেখে ছাড়ব, এই কায়দায় মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেন মুকেশ। অতিথিদের নিমন্ত্রণ করতে যে কার্ড বানানো হয়েছিল, তার প্রতিটির দাম ছিল তিন লক্ষ টাকার কিছু বেশি। লেক কোমোতে এক প্রস্থ উৎসব সেরে দেশে ফেরেন অম্বানী-পিরামল পরিবার। বলিউডে এমন কোনও রাজা বাদশা খান বাহাদুর নেই যাঁরা এই বিয়ের সন্ধেয় মঞ্চে খেপ খাটেননি। তাতেও সম্রাটের আশ মেটে না। বিয়ন্সে-কে গান গাইতে বিয়ের আসরে গাইতে উড়িয়ে আনা হয় ১৪ কোটি টাকা খরচ করে। মোট একশোটি চার্টার্ড ফ্লাইট আগে থেকে ভাড়া করা ছিল দেশ-বিদেশের অতিথিদের উড়িয়ে আনতে। সব মিলে ওই সাতশো উনিশ কোটি টাকা মতো খরচ।  
তাহলে সব মিলে কত খচ্চা হল, হিসেব করার ধৈর্য নেই। গুস্তাকি মাফ। কিন্তু কিছু সওয়াল রয়েছে।

তেল মাখতে কড়ি খরচ হয়। আনন্দ নামক তৈলমর্দনটিও তার ঊর্ধ্বে নয়। গরিব আনন্দ করে তার তরিকায়। বড়লোকেরও তরিকা নিজস্ব। তুবড়ি ফাটবে, বাইজি নাচবে। জায়েজ। কিন্তু আনন্দ আর আদেখলেপনার মধ্যে কি কোনও পার্থক্য নেই? বড়লোক কোমর দোলাবে, আলো ঝোলাবে আলবাত, কিন্তু গরিবের মুখে জুতো ঘষে দেওয়াটাও কি আনন্দের মধ্যেই পড়ে?

আবার তথ্যের রাজ্যে কাদা ঘাঁটা যাক। বিশ্ব ব্যাঙ্ক ২০১৬ সালে জানিয়েছিল, মাথা পিছু আয়ের ভিত্তিতে ১৬৪টি দেশের মধ্যে ১১২তম আমাদের দেশ। ভারত সরকারের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ২৭ কোটি ভারতীয় পরিবারের দৈনিক আয় ৮৯ টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ জনপ্রতি ২০ টাকার মতো। আইপিএসওএস নামক সমীক্ষক সংস্থার সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ৭১ শতাংশ ভারতীয়র শরীরে প্রোটিন ডেফিসিয়েন্সি আছে।

প্রশ্ন এখানেই। যে দেশে দিন আনি দিন খাই-এর চক্করে মানুষের হাড়-মাস কালি হয়ে যায়, সেখানে সাতশো কোটির জগঝম্প কি দৃষ্টিকটু নয়? ৫১০০ গরিব মানুষকে খাইয়েছেন অম্বানী, সম্ভবত বিবেকের দায়ে। কেন না ঘাগু ব্যবসায়ী জানেন এক দিনের আমোদে সাতশো কোটি খরচ হলে কত মানুষের পেটে তালা পড়ে।

আনন্দের সঙ্গে নাচাগানা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বিশেষত ভারত গানবাজনারই দেশ। জাকির হোসেন তবলা বাজান। আল্লারাখা রহমান এখনও কনসার্ট করেন। কিন্তু অম্বানীরা উড়িয়ে এনেছেন বিয়ন্সেকে। সব মিলে খরচ হয়েছে ২১ কোটি টাকার কিছু বেশি। অভিরুচির দোহাই যেতে পারে। বলিউডি তারকাদের দিয়ে খানা পরিবেশন থেকে তাঁদের পিছনের সারিতে নাচতে বাধ্য করা, তাও কি অভিরুচির কারণেই, নাকি তিন সত্য হয়ে আছে অর্থের গরিমা? আর সকলেই কেন লেক কোমোতে বিয়ে করতে যান, এ প্রশ্নও গলায় বিঁধে থাকে। দেশে কি সুন্দর কিছু কম পড়িয়াছে? 
 
সম্প্রতি পি সইনাথ ডি এস ব্রোকার মেমরিয়াল লেকচারে বলেছেন, ‘‘বৈষম্য ভারতে অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে। যাঁরা দেখতে পান না তাঁরা মায়োপিক।’’ সইনাথ এক হাত নিয়েছেন গণমাধ্যমের দায়কেও। তবে একই সঙ্গে সইনাথ চিহ্নিত করেছেন, বৈষম্যের স্বীকার কৃষক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক মানুষ আর একা হয়ে আত্মহত্যা করবে না, বরং জোট বেঁধে পথে নামবে। সইনাথ মিথ্যে নন, নভেম্বরেই ১ লক্ষ কৃষকের লং মার্চ দেখেছে ভারতবর্ষ। আশা করা যায়, শীতকালীন বিয়ে-মোচ্ছব ও তজ্জনিত বৈষম্য দিনে দিনে আরও বাড়বে। বাড়বে পায়রা ওড়ানো বাবুয়ানিও। সমাজবিদ বিনয় ঘোষ সেই কবেই এই খাদক সমাজকে চিহ্নিত করে তার ফ্যাশান প্যারেডকে কটাক্ষ করেছিলেন ‘বিজ্ঞাপন ও মন’ প্রবন্ধে।

আত্মহত্যা নয়, পথে নেমে প্রতিবাদ। এই দৃশ্য এই বছরে বার বার দেখেছে ভারত। ফাইল চিত্র


ফলে এমন চললে, দেশ জুড়ে কালের নিয়মেই ১৯৪৩ ফিরে আসবে। হয়তো কৃষকের কঙ্কালে বসে বড়লোকির, বাবুয়ানির গল্প শোনাবে অন্য এক হাবু পাগলা।
 
শেষ কথার পরেও একটি কথা থাকে। অর্বাচীন সে কথাতে ধুলোও ওড়ে না, আগুনেও তাকে পোড়ায় না। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সাইনা নেহওয়ালও বিয়ে করেছেন গত ১৬ ডিসেম্বর। চল্লিশ জন মতো অতিথি উপস্থিত ছিলেন। খরচ জানা যায়নি, খুব বড় সংবাদ শিরোনাম হয়নি।

চর্চিত হয়নি, অথচ শিরোনাম হয়েছে, বাবার মৃত্যুতে মধ্যবিত্ত ছেলে তিন হাজার গাছ লাগিয়েছেন। অথবা, বিয়ের দিনে সাধ্য মতো শুধুই দুঃস্থ লোককে খাওয়ার খাইয়েছেন মধ্যবিত্ত দম্পতি। আমরা পারি, ‘ওঁরা’ পারেন না।

অর্ক দেব: সাংবাদিক। গ্রন্থনির্মাণ ও সম্পাদনার কাজে উৎসাহী।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -