SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

গালিব বার-এর 'মুন্না ভাই' থেকে দাউদের দরবার, মহম্মদ আজিজের আজিব দাস্তান

ডিসেম্বর ৩, ২০১৮
```` Comments
প্রতি সন্ধেয় রংবোতলের লোভে যাঁরা জড়ো হতেন সেদিনের গালিব বার-এ, মুন্নাই ছিলেন তাঁদের রফি।

প্রতিটি দশকেই পপুলার কালচার কিছু আইকন পায়। শেক্সপিয়র অনুসরণে ‘‘সাম আর বর্ন গ্রেট, সাম বিকাম গ্রেট...’’ তাঁদের ক্ষেত্রে বলা যায় না হয়তো। বলা যাবে না, ওই মহামানব আসে। দশক পেরোতেই রাতের ফুলের মতো ঝরে পড়েন তাঁরা, শুধু পড়ে থাকে গণস্মৃতি, আর কিছু ডোরেমিপাসোলাটিডো।

অশোকনগরের হরিপুর গ্রামের ছেলে মুন্নার গল্পটাও ঠিক এমনই। মুন্নার গলায় ছিল সুর আর হৃদয়ে ছিলেন মহম্মদ রফি। তালিম নিয়েছিলেন আজকের স্বনামধন্য গায়ক রূপম ইসলামের বাবা নুরুল ইসলামের কাছে। 

এইটুকুকে পুঁজি করেই রাতের জলসা মাতানো শুরু হরিপুরের মুন্নার। আশির দশক সেটা। পাড়ায় পাড়ায় রাতজলসা, থুড়ি মাচায় গান তখন পাখনা মেলছে। মাচা মাত করতে উঠে আসছেন ‘কণ্ঠী’রা। ঠিক এই সময়ে মঞ্চে দাপাতে শুরু করেন মুন্না। মঞ্চে তখন কাতারে কাতারে ‘কন্ঠী’ বা কপি সিঙ্গার। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়। মুন্নার ইউএসপি ছিল অন্য তুক। সকলে যখন কিশোরকুমারের স্মরণ নিয়েছে, মুন্না তখন শুধুই গাইতেন, বলা ভাল অনুকরণ করতেন মহম্মদ রফিকে।

এই তুক কাজে লেগে যায়। মুন্নার কাজ জুটে যায় ইলিয়ট রোডের গালিব বার নামে এক পানশালায়। প্রতি সন্ধেয় রংবোতলের লোভে যাঁরা জড়ো হতেন সেদিনের গালিব বার-এ, মুন্নাই ছিলেন তাঁদের রফি।
 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

‘সুলেমানি কিড়া’ মুন্নার ছিল। গালিব বার আর রাস্তার জলসা থেকে যে ঘোড়দৌড় শুরু হয়েছিল, তা আসলে এক বিরাট লম্বা রেস। টালিগঞ্জের রুপোলি পর্দায় প্লে-ব্যাকের সুযোগ আসে। আজকের বাংলা ছবির ‘দাদা’ প্রসেনজিৎ অভিনীত ‘জ্যোতি’ (১৯৮৪) থেকে শুরু করে সাগরপাড়ি। দিলীপ কুমার, জিতেন্দ্র, অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী প্রত্যেকের ঠোঁট জারিত হয়েছে মুন্নার কণ্ঠে। মনমোহন দেশাই-এর ‘মর্দ’ ছবিতে (১৯৮৫) বলিউডে পা রাখেন মুন্না। ১৯৮৯-এ ‘রাম লক্ষ্মণ’ ছবিতে মুন্নার গলায় ‘মাই নেম ইজ লক্ষ্মণ’-এ নেচে উঠেছে আসমুদ্র হিমাচল। আবার বাংলা ছবি ‘গুরুদক্ষিণা’ (১৯৮৭)-তেও মুন্নার গান বাংলা বাজার মাতিয়েছিল।
 

এই সেই গালিব বার, এখানেই ভাগ্যের শিঁকে ছিড়েছিল মুন্না আজিজের। ফাইল চিত্র


প্রসঙ্গত, আশির দশক থেকেই মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ডের টাকা ঢুকতে থাকে বলিউডে। ছোটা শাকিলের লোক রিজভিকে দেখা যেত টাকার ব্রিফকেস নিয়ে ঘুরতে। এস  হুসেইন জাইদি লিখেছিলেন, আবু সালেমের শুধু চাই- ‘ফেম-ফেম-ফেম’। ঋষি কপূরের ফ্যান বলিউডের অদৃশ্য উপছায়া দাউদ ইব্রাহিম মুন্নাকে শুনেছে, চিহ্নিত করেছে। মুন্না সাত সকালে ফোন পান। ওপাশ থেকে মন্দ্র কন্ঠ বলে, ‘‘ভাই বাত কারেগা।’’ এর পরে দাউদের বাড়িতে জলসায় তাঁর গান গাওয়া নিয়ে কম হইচই হয়নি। শরিয়তি অথচ গান গান, এই জন্যে কম অপমানিত হতে হয়নি রফিকে। মুন্নাও কোনও জবাব দেননি, হজম করেছেন।

ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও মাটিতে পা পড়ত আজিজের। সুযোগ পেলেই তিনি গাইতে চলে যেতেন গালিব বার-এ। সেই ‘গেস্ট এন্ট্রি’-র কথা মনে পড়তেই গলা ধরে আসে গালিব বার-এর বুড়ো ম্যানেজার এস কে চান্দ-এর। ‘‘আনোয়ার, সাব্বির কুমারের পরে মুন্না ভাই। তবে মুন্না সবার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। মাঝে মাঝেই অনুষ্ঠান ফেরত গাইতে আসত এখানে। পুরনো যন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর ছিল দিল কা রিস্তা।’’

নব্বই বা একানব্বই সাল হবে । এক বন্ধুর সঙ্গে এলিয়ট রোডের গালিব বারে ঢুকে দেখি একজন গান গাইছে, রফির মতো গলা। বন্ধুর কথায় চিনলাম ইনিই সেই বম্বেখ্যাত মহঃ আজিজ। মাঝে মাঝে স্মৃতির টানে গালিবে আসেন গাইতে। কারওর অনুরোধে গাইলেন, ‘তেরি আঁখো কে সিবা দুনিয়া মে রাখখা কেয়া হ্যায়’। যেন স্বয়ং মহঃ রফিই গাইছেন, এখনও কানে লেগে আছে। 


মুন্নার বাজার পড়তে শুরু করে নব্বইয়ের শুরুতে। পপ কালচারের নয়া বিস্ফোরণের সামনে দাঁড়াতে পারেননি চল্লিশ পেরোনো মুন্না। আলিশা চিনয়-এর ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ বা কুমার শানুর ‘চুরাকে দিল মেরা’-র পাশে মুন্না বেমানান হতে শুরু করেন।

এ প্রসঙ্গে দু’কথা বলার আছে। মুন্না বা তাঁর আগের সাব্বির কুমাররা ‘কন্ঠী’ হিসেবে শুরু করে, জনপ্রিয়তার নিরিখে যত দূর পৌঁছতে পেরেছিলেন, তা তাঁর পরের প্রজন্মের ‘কণ্ঠী’দের কল্পনারও অতীত। ছিলেন গৌতম ঘোষও। প্লে-ব্যাকে তেমন সাফল্য না পেলেও ‘কণ্ঠী’ হিসেবে গৌতমের খ্যাতিও পৌঁছে গিয়েছিল তুঙ্গে। কিন্তু ধীরে ধীরে সবটা বদলে যেতে লাগল। এঁদের জৌলুস শেষ হওয়ার সময়টি একটি অন্য চিহ্নও বহন করে। বলিউডের সাউন্ডস্কেপটাই বদলে যেতে থাকে। ’৬০-’৭০ এর দশকের গান গলি গলতায় যেভাবে পৌঁছে দিয়েছিল, আজও তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে মাচায়। ‘কণ্ঠী’রা আজও আশা-লতা-কিশোর-রফিই গাইছে। পরবর্তী প্রজন্মকে নকলনবিশি করার যোগ্য মনে করেনি আমজনতা-গায়ক কেউই। গণসংস্কৃতি বা তাঁর সব প্রতিনিধি বান্দাই অনেকটা সমুদ্রের মতো, সেখানে কোনও বুদবুদই স্থায়ী নয়। প্রতিস্থাপিত হতে হতে যায় আইকনের মুখ। কিন্তু এক বৃহৎ সমাজ মনস্তত্ত্বকে বুঝতে পেরেছিলেন মুন্না। চিনতে পেরেছিলেন তাঁদের নাড়িনক্ষত্র। এই দিক থেকে তাঁর মূল্যায়ন করা হবে না, কখনও। কেউ মনে রাখবে না, তিন অক্টেভে গলা খেলে বেড়াত আজিজের।

যাই হোক, গল্পে ফিরি। যেখান থেকে শুরু সেখানেই শেষ। যে মাচা তাঁকে এক  দিন ‘কণ্ঠী’ করেছিল, ‘বোম্বে কাঁপিয়ে, ভারত মাতিয়ে’ সেখানেই ফেরেন মুন্না। মৃতদেহকে যেমন ছুঁয়ে থাকে আত্মীয়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুন্নাকে ছুঁয়ে রেখেছিল মাচা। গত ২৭ নভেম্বর ‘মাচা’র অনুষ্ঠান সেরে ফেরার পথেই মুম্বই বিমানবন্দরে মুন্নার মৃত্যু হয়। মুন্নার চড়াই-উতরাই এর গল্পটা এমনই।
 
মুন্নার মৃত্যুর পরে, কেউ বলবে না সালাম কমরেড। শুধু যদি গণস্মৃতি বলে কিছু থেকে থাকে, যত দিন ‘কণ্ঠী’রা থাকবেন, রাত জেগে মানুষ মাতোয়ারা হয়ে থাকবে জীবনের কার্নিভ্যালে, ‘মাচার মাস্তান’ হয়ে থেকে যাবেন মহম্মদ আজিজ।

অর্ক দেব: পেশায় সাংবাদিক। সম্পাদনা ও গ্রন্থনির্মাণ সংক্রান্ত কাজে আগ্রহী।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -