SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

বিয়ে বনাম পরকীয়া, কে জিতল ২০১৮-র ভারতীয় বাজার 

জানুয়ারি ১৪, ২০১৯
```` Comments
মেগা বিয়ে বনাম মেগা পরকীয়া— ২০১৮-এ উত্তাল ছিল মিডিয়া। কোন ‘প্যাকেজ’-এ কিস্তি মাত হল?

২০১৯-এ কী হবে কে জানে। তবে ২০১৮টা অবশ্যই ছিল বিয়ে বনাম পরকীয়ার নেক-টু-নেক ফাইট-এর বছর। মাঝপথে সুপ্রিম কোর্টের একটা রুলিং, পরকীয়া নিয়ে এতকালের সরকারি আইনি তথা রাষ্ট্রীয় শুচিবাই, দাদাগিরি আর গুরুমশাইপনা ব্যাপারটাকে বেশ ঘেঁটে দেয়। সুপ্রিম কোর্ট পরকীয়ার গা থেকে শুধু ফৌজদারি অপরাধের ছমছমে ব্যাপারটা ঘষে তুলে দেয়নি— পুরো জিনিসটার মধ্যে যে জেন্ডার বায়াসের টক টক গন্ধটা ছিল, সেটাকেও তাড়িয়ে ছেড়েছে। এখানটায় বোধ হয় পাঠকের জন্য একটু ‘রি-ক্যাপ’-এর দরকার আছে।পরকীয়ার আইনটা আগে যা ছিল, সেখানে থানা-পুলিশ-জেল-হাজত, যা হবে, প্রেমিকটির কপালেই জুটবে। মেয়েটিকে ধরে নেওয়া হবে নির্দোষ, নিষ্কলঙ্ক।অনাঘ্রাত বেচারি ফুলটির মতো সে শ্বশুরবাড়ির ‘সাংসারিক বাগানে’ দিব্যি ঝুলে থুড়ি ফুটে ছিল। এই ব্যাটাচ্ছেলে পাষণ্ড, পাপী পুরুষ খ্যাপা ষণ্ডের মতো নাকি মত্ত হস্তীর মতো সেই নিষ্কাম কমলবনে ‘ট্রেসপাস’ করে আপন মস্তিতে মেয়েটিকে ‘নষ্ট’ করেছে। পোরো ব্যাটাকে ফাটকে। তার মানে দ্বাপরে যদি ইন্ডিয়ান পেনাল কোড থাকত, তা হলে বৃন্দাবন-লীলায় যত দোষ নন্দর ছেলে কেষ্ট ঘোষেরই হতো। সে কেন সময়ে অসময়ে বাঁশি ফুঁকে শ্রীরাধাকে ফুসলেছে! আর রাধা তার ঢলানিপনার জন্য বাড়িতে শাশুড়ি-ননদের হাতে যত ক্যালানিই খাক, কংসরাজার কোতোয়াল সেপাই তাকে ছুঁতে পারত না।

তবে এখানেও একটা কথা আছে। শ্রীরাধিকার বর আয়ান ঘোষ যদি মথুরার দরবারে গিয়ে স্টেটমেন্ট দিতেন যে, শ্রীমতী আর শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে যা কিছু ইয়ে টিয়ে চলছে, সে ব্যাপারে তার পূর্ণ সম্মতি আছে— তা হলে শ্রীকৃষ্ণের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কেসটা দাঁড়াত না। আইনের এই ব্যাখ্যাটা সম্পর্কেই নারীবাদীদের প্রবল আপত্তি ছিল। তা হলে কি পরকীয়া করার জন্যেও মেয়েদের স্বামীর অনুমতি লাগবে?


দীপ-বীর,  ছবি: ফেসবুক থেকে

তার মানে পরকীয়ার ত্রিভুজেও মেয়েরা সবচেয়ে নড়বড়ে বাহু। বর আর প্রেমিকের টেবিলটেনিস ম্যাচে পিংপং বল? প্রেমিক স্ম্যাশ করে বরের টেবিলে পাঠাচ্ছে, বর আবার টপস্পিন মিশিয়ে প্রেমিকের কোর্টে আলতো করে ছেড়ে রাখছে। তা ছাড়া, কোন স্বামী যেচে বউকে পরপুরুষের সঙ্গে মহব্বত করতে পাঠাবে? বরং চৌকাঠ পেরতে গেলেই খপ করে চুলের মুঠি ধরে ঘরে পোরাটাই দস্তুর। নতুন রুলিং তাই এই হাস্যকর ব্যাপারটাও বাদ দিয়েছে। তবে এখানেই আয়ান ঘোষের প্রসঙ্গটা উঠে আসতে পারে। দ্বাপরের গসিপওয়ালারা বৃন্দাবনের গোষ্ঠে কান পেতে যেটুকু ফিসফাস শুনে এসেছেন, তাতে আয়ানের ‘মর্দাঙ্গি’ নিয়ে খানিকটা সংশয় তো রয়েছেই। পুরাণ বলবে— পরমভক্ত আয়ানবাবু জেনেশুনেই রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলা ‘অ্যালাও’ করেছিলেন। কলির চ্যাংড়া ছোঁড়া ‘ধ’ বা ‘ঢ’-বাচক খিস্তি মেরে বলবে ‘শালা ইয়ে……’। তবে কারোকে কারোকে উপরতলার ক্ষমতার চাপে অনেক সময়ে আয়ান ঘোষের ভূমিকা পালন করতে হয়। নিজের বউয়ের সঙ্গে যাঁকে জড়িয়ে নিয়ে কেচ্ছার চোটে কান পাতা দায়, তাঁর ব্যাপারেই ‘পাবলিকলি’ সোনামুখ করে বলতে হয়— ‘অমুকদা আমাদের পারিবারিক বন্ধু’।
    
সে যাই হোক,পরকীয়া প্রেমে আয়ানবাবুদের ভূমিকাটা ঠিক কোন জায়গায়, সে ব্যাপারে আমরা পরে আসব। তার আগে ২০১৮-র ভারতে বিয়ে বনাম পরকীয়া— কোন দিকের পাল্লা বেশি ভারী হল, তার একটা হিসেব মেলানো যেতে পারে। সেখানে উপর উপর দেখলে ২০১৮ বলিউডের মেগা বিয়ের বছর। রণবীর সিংহ আর দীপিকা পাডুকোনের অনেক দিনের ঝুলিয়ে রাখা বিয়েটা শেষ পর্যন্ত গত বছরের সবচেয়ে মেগা-ইভেন্ট হয়ে ফাটল। বিয়ে যেন সিরিয়ালের মতো। রোজ রোজ নতুন নতুন পর্ব বেড়েই চলেছে। ফুরোতে ফুরোতেও ফুরোচ্ছে না। এদিকে বিয়ের ফুল ফুটল প্রিয়ঙ্কা চোপড়ারও।এখানে বর আবার দুনিয়া কাঁপানো ব্যান্ড-গায়ক নিক জোনাস। ফলে পুরো ব্যাপারটাই গ্লোবাল ইভেন্ট। বিয়েও এক বার খ্রিস্ট মতে,একবার হিন্দু মতে। একই জোড়ার ডবল বিয়ে। তাই প্রচারের আলো,ধামাকাও ডবল-ডবল।


নিকিয়াঙ্কা, ছবি: নিজস্ব

আসলে বিয়ের এত এত প্রচার, সেলেব বর-কনের এত এত ফ্যাশনদার গয়না-পোশাক, সোশ্যাল, আনসোশ্যাল সব রকম মিডিয়ায় নবদম্পতির গাদা গাদা ছবি— সবটা একসঙ্গে একটাই ‘প্যাকেজ বার্তা’ দেয়— বিয়ের চেয়ে ভাল আর কিছু হয় না। সিঁথেয় ডগডগে সিঁদুর দেওয়া দীপিকা পাডুকোনের আহ্লাদে আটখানা মুখের ক্লোজ-আপ কিংবা নিকের সঙ্গে গলা জড়াজড়ি করে প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার ‘পৃথিবী-তাকিয়ে-দেখ-আমরা-দুজন-কত-সুখী’-মার্কা সেলফি, বিয়ে নামের প্রতিষ্ঠানটাকে ‘শ্যাম স্টিল’, ‘লাফার্জ সিমেন্ট’ ইত্যাদি দিয়ে মহা পোক্ত বানায়। তার পর রণবীর সিংহের মতো কোনো প্রাক্তন ‘ক্যাসানোভা’ যদি সেই পুরনো বিজ্ঞাপনী ক্যাচলাইন ‘অনুভব করেছি তাই বলছি’-গোছের লাজুক ভঙ্গিতে বলতে থাকেন— বিয়ে না করলে জানতেই পারতাম না, বিয়ে ব্যাপারটা কী মধুর স্বর্গীয় একটা অভিজ্ঞতা, তখন তো সোনায় ডবল সোহাগা! রণবীর দুনিয়ার সমস্ত ‘এলিজিবল ব্যাচেলর’-দের ডাক দিয়েছেন এক্ষুনি বিয়ে করে নেওয়ার জন্য। এমনকী যথেষ্ট ‘এলিজিবল’ নয়, এ রকম ব্যাচেলরদেরও ‘শাদি’ নামের দিল্লি কা লাড্ডু চেখে দেখার ঢালাও অফার। মোটমাট, ‘বিবাহ যুগ যুগ জীয়ে’গোছের একটা ভরপুর ফিল-গুড আবওহাওয়া।

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

এখন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ের এই যে হাসিখুশি বোলবোলাও, পরকীয়া এই জায়গাটাতেই অন্তর্ঘাতটা ঘটায়। রণবীর সিংহরা বিয়েকে যেমন দুধ, মধু, জোৎস্নার মায়াভরা হান্ড্রেড পার্সেন্ট সুখ বলে চালাতে চাইছেন, পরকীয়াই সেখানে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এই দ্যাখো— বিবাহিত সম্পর্কের মাঝে কত রকমের ফাঁক, দাম্পত্যের ফ্যান্সি চাদরে কতগুলো করে ফুটো। তা ছাড়া, ২০১৮ যেমন জাতীয় ও গ্লোবাল সেলেব বিয়ের ভরভরাট-জমাটি মিডিয়া-কভারেজ দেখেছে, তেমনই একেবারে ঘরোয়া আঞ্চলিক রাজনীতির ব্যাপার হয়েও জাতীয় মিডিয়ার আলোচনার খোরাক বা কেস-স্টাডি হয়ে উঠেছে একটা ‘পরকীয়া’ প্রেমই।


শোভন-শাখী, ছবি: নিজস্ব

বুঝতেই পারছেন, আমরা এখানে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা বাংলার প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়ের কথাই বলছি। পরকীয়ার ‘বৈশাখী ঝড়ে’ তিনি যেভাবে তাঁর সুনাম, ইমেজ, রাজনৈতিক কেরিয়ার— সব কিছু হেলায় উড়ে-পুড়ে যেতে দিয়েছেন,তাতে সর্বভারতীয় মিডিয়া এক কথায় তাঁকে ‘ট্র্যাজিক হিরো’-র সম্মান দিয়েছে। স্রেফ প্রেমের খাতিরে তিনি যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দাপুটে নেত্রীর মোকাবিলা করেছেন, সেজন্যে এদেশি ইংরেজি সাহিত্যে ‘অ্যাডাল্ট’ যৌনতার বেস্ট-সেলার কথাকার স্বয়ং শোভা দে পর্যন্ত টুপি নামিয়েছেন। শোভনকে ‘বীরপুরুষ’ বলেছেন।

কিন্ত শোভনের এই রোম্যান্টিক বীরত্বপনার চোটে আর একটা পরিবারের সামাজিক সম্মানের হাল কী দাঁড়াচ্ছে, মিডিয়া তার হিসেব রাখতে যায়নি। কিছু রাজনৈতিক পাওনা-গন্ডার কিছু দায় হয়তো ও তরফেও ছিল। তাই বাড়ির কর্তাটিকে ‘শোভনের প্রেম নিকষিত হেম (কাম-গন্ধ নাহি তায়)’-গোছের একটা স্ট্যান্ড রাখতে হয়েছে। করারও কিছু নেই। আমাদের পপুলার কালচারও বলছে, এসব কেস-এ বিয়ে-পরিবার টিকিয়ে রাখার দায়িত্বটা আয়ান ঘোষদেরই নিতে হয়। সেটা শরৎচন্দ্রের সেই কবেকার নভেলেট ‘স্বামী’-তেও সত্যি, আবার ‘বলিউডের বিপ্লবী’ অনুরাগ কশ্যপের ২০১৮-র ছবি ‘মন-মর্জিয়া’-র বেলাতেও একই। সেখানে পরকীয়া প্যায়ার যতই বেপরোয়া, আগুন-আগুন ফ্যায়ার হোক, স্বামীটিকে সেই বলতেই হয়— “আমি জানি তুমি আমারই আছ, বাড়ি চল”। পাবলিক ডিমান্ড এহি হ্যায় বস্!

শান্তনু চক্রবর্তী: প্রায় তিন দশক ধরে সিনেমা, টেলিভিশন, খেলা, রাজনীতি-সহ জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা গলি-ঘুঁজিতে ঘোরাফেরা করছেন। প্রথম শ্রেণির একাধিক দৈনিকে সিনেমা, নাট্য সমালচনা এবং উত্তর সম্পাদকীয় কলাম লিখে থাকেন। 

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -