SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

ভারতে এখনও রয়েছে নারী-প্রধান সমাজ। কেন তাদের পিছিয়ে রাখা হল

নভেম্বর ১১, ২০১৮
```` Comments
এক সময়ে ভারতের বেশ কিছু অঞ্চল ছিল নারী-প্রধান। সেই সব মাতৃপ্রধান গোষ্ঠীর অধিকাংশই আজ পুরুষতন্ত্রের ভারে চাপা পড়ে গিয়েছে।

নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের স্বার্থে বিশ্বের বহু মানুষ লড়ছে। প্রগতির দিকে সমাজ এগোলেও রাস্তা-ঘাটে-বাসে-ট্রামে রোজ যাতায়াত করতে করতেই মহিলারা বোঝেন সমাজের সিংহভাগই পুরুষতন্ত্রে ভরা। খবরের কাগজের পাতা ওলটালে বিজ্ঞাপনের পরিমাণের মতোই বেড়ে চলছে কখনও বধূহত্যা, কখনও ধর্ষণ করে খুন, কখনও শ্লীলতাহানি। এছাড়া বহু ক্ষেত্রেই চোখে আঙুল দিয়ে হোক বা পরোক্ষ ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় মহিলা মানেই ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’। 

এমনকী, একান্নবর্তী পরিবার হোক বা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, স্বামী-স্ত্রী দু’জনে কর্মরত হলেও রান্নাঘরের দাঁড়িপাল্লায় স্ত্রীর ভারই বেশি থাকে। বিয়ের আগে ‘বিবাহযোগ্যা’ খেতাব বজায় রাখতে আর বিয়ের পরে মাতৃত্বের পিছনেই প্রাণপাত করতে সময় কেটে যায়। কিন্তু সভ্যতার গোড়াপত্তন থেকে কি চিত্রটা এমনই ছিল? 

উনিশ শতকে লিউইস এইচ মরগ্যান তাঁর বই ‘অ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি’-তে অন্তত তেমন লেখেননি। বরং তিনি জানাচ্ছেন, গোড়ার দিকে মাতৃতন্ত্রের আধিপত্যই জোরালো ছিল। মরগ্যানের এই তত্ত্বই নিয়ে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস তাঁর ‘দ্য অরিজিন অফ দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড দ্য স্টেট’ বইতেও আলোচনা করেছেন। পরিবার প্রথা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে সম্পত্তির উত্তরাধিকার মাতৃবংশধারা অনুযায়ী হতো। কিন্তু এতে সমস্যা হয়ে যায় সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণ নিয়ে। তার পর থেকেই শুরু হয় পরিবার স্থাপনের উদ্যোগ। আর এই সময় থেকেই মাতৃতন্ত্রের অবসান শুরু হয়। ধীরে ধীরে লিঙ্গবৈষম্য জায়গা করে নিতে থাকে সমাজে। 

আজকের ভারত মায়ের পদবি ব্যবহার করতে শিখছে। কিন্তু  যাঁরা করছেন, তাঁরা থেকে গিয়েছেন ব্যতিক্রমীদের তালিকায়। আর যে স্বামীরা সন্তান নিয়ে স্ত্রীর মা-বাবার সঙ্গে থাকেন, তাঁরা হয়ে গিয়েছেন ‘ঘরজামাই’। কিন্তু আজ থেকে বহু বছর আগে এই দেশের বেশ কিছু অংশেই মায়ের পরিচয়েই পরিচিত হতো সন্তান। বাড়ির রুজিরুটির প্রধান উৎসও ছিলেন মহিলারা। এমনকী, কিছু গোষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন স্বামী! সন্তানদের প্রধান ঠিকানাও হতো সেই মায়ের বাড়িই। 

সেই সব মাতৃপ্রধান গোষ্ঠীর অধিকাংশই আজ পুরুষতন্ত্রের ভারে চাপা পড়ে গিয়েছে। কিন্তু এই অস্তমিত মাতৃতান্ত্রিক সমাজের মধ্যে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের দুই গোষ্ঠী— খাসি ও গারো। 

খাসি— মেঘালয়, অসম ও বাংলাদেশের কিছু অংশ জুড়ে এই সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। খাসি গোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের ‘কুটিরের সন্তান’ বলে ডাকেন। এই গোষ্ঠীতে শুধু উত্তরাধিকার সূত্রেই মাতৃতন্ত্র চালকের আসনে নয়, সেই সঙ্গে স্ত্রীর বাড়ির ঠিকানাই হয় স্বামীর বাসস্থান। মায়ের পদবিই ব্যবহার করেন সন্তানরা। 

গারো— খাসি গোষ্ঠীদের পাশেই বাস গারো সম্প্রদায়ের মানুষের। মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও অসমের পাহাড়ের কোলে বসবাস এঁদের। এই গোষ্ঠীর পুত্র সন্তানরা মা-বাবার বাসস্থান ছেড়ে স্ত্রীর বাড়িতে থাকেন। 

এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও মাতৃতন্ত্র বর্তমান। কিন্তু শুধু উত্তর-পূর্ব ভারতেই নয়। মাতৃতন্ত্র দক্ষিণ ভারতের কেরল ও কর্ণাটকের কিছু গোষ্ঠীতেও মহিলাদের আধিপত্য বেশি ছিল। 

কেরলের নায়ার ও কর্ণাটকের বান্ত সম্প্রদায়েও মাতৃতন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। ইতিহাস ঘাঁটলে এমনই দেখা যায়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ‘জয়েন্ট ফ্যামিলি সিস্টেম’ অ্যাক্টের মাধ্যমে মাতৃতন্ত্র অবসান হয়। 

মনে করা হয়, কেরলে এক সময়ে মহিলাদের আধিপত্য ছিল বলেই এই রাজ্যে মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার হার পুরুষদের মতোই।

কিন্তু নজর কাড়ার মতো বিষয় হলো, যে দু’টি গোষ্ঠীর মধ্যে এখনও মাতৃতন্ত্রের অস্তিত্ব রয়েছে, তাদেরকে ‘আদিবাসী’ করে রাখা হয়েছে। তথাকথিত আধুনিক সমাজের থেকে এই সম্প্রদায়ের মানুষের ধরাছোঁয়া অনেকটাই দূরে। ক্রমশ ডিজিটাল আড্ডায় মেতে ওঠা মানুষের কাছে এঁরা খানিকটা ভিনগ্রহের প্রাণী। 

প্রথমত ভারতে আজও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি গুরুত্বের বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি। আর দ্বিতীয়ত, এই দুই সম্প্রদায়কে ‘আদিবাসী’ তকমা দিয়ে রাখা হয়েছে। ‘আদিবাসী’ কথার আভিধানিক অর্থ, একেবারে আদিতে বা আরম্ভে যাঁদের বাস। কিন্তু ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের যুগে আমজনতার কাছে এই ‘আদিবাসী’ কথাটা নেতিবাচক বললে খুব একটা ভুল হবে না। 

পাড়ার রকে বা চায়ের দোকানে সাধারণ মানুষের কথোপকথনে বেশির ভাগ সময়ে ‘আদিবাসী’ বলতে যা বোঝায়, তা হল— 

• এঁরা আদি। আর তার মানেই তাঁদের গা থেকে একটা যেন পুরনো গন্ধ বের হয়। তবে এই গন্ধ নাকে আসে না। ‘আধুনিক’ মানুষ এই গন্ধ মানসিকতার মাধ্যমেই পেয়ে থেকেন। 

• আদিবাসী মানেই তাঁরা এখনও ‘সভ্য’ হননি। এই মিথও প্রকট ভাবে রয়েছে মানুষের মধ্যে। তাই আদিবাসী বললেই অনেকের নাক শিঁটকে যায়। 

• আদিবাসী মানেই তাঁরা এখনকার আদব-কায়দার সঙ্গে অভ্যস্ত নন। 

• আদিবাসী মানেই ‘সংরক্ষণ পদ্ধতিই ওঁদের বাঁচিয়ে দেবে’। 

তাই ‘গারো’ ও ‘খাসি’— এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষও সমাজের তলানিতে। তাই তাঁরা কতটা কম পুরুষতান্ত্রিক আর কতটা বেশি মাতৃতান্ত্রিক, তা নিয়ে দেশের সিংহভাগ খুব একটা চিন্তিত নন। বরং তাঁদের এই ধরন-ধারণ বাকিদের কাছে ব্যতিক্রমী হিসেবেই প্রকাশ পায়। 

স্বরলিপি দাশগুপ্ত: শুরু থেকেই ওয়েব সাংবাদিকতার প্রথম প্রজন্ম। লেখালিখির জন্য সব সমঝোতায় রাজি কিন্তু গানের জন্য নো কম্প্রোমাইজ।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -