SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

লেফট-রাইট-লেফট। রাজনৈতিক মিছিলে ‘মমতা’ দেখাননি পদাতিক মৃণাল

ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮
```` Comments
একটি সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দিতে গিয়ে মৃণালবাবু বলেছিলেন— তিনি ‘প্রাইভেট মার্কসিস্ট’।

চলে গেলেন মৃণাল সেন। এমন শোকের দিনে স্বাভাবিক ভাবেই আলোচনায় উঠে আসবে তাঁর প্রথম ও প্রধান পরিচয়। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনকে শুধু রুপোলি চোখ দিয়েই দেখা ঠিক নয়। তাঁর ছবি থেকে জীবন— সবেতেই ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক আদর্শের সাদা-কালো ছবি! 

ফরিদপুরের ছেলে কলকাতায় আসেন পড়াশোনার জন্য। স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা। তখনই কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত হন। সেই যোগটা ছিল অনেকদিন। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তিনি কখনও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। চল্লিশের দশকে তিনি আইপিটিএ-র (ইন্ডিয়ান পিপ্‌লস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন) সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, বামপন্থী ভাবধারা নিয়ে কাজও করেছেন। কিন্তু পার্টি অফিসের রাজনীতিতে কখনও না। একটি সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দিতে গিয়ে মৃণালবাবু বলেছিলেন— তিনি ‘প্রাইভেট মার্কসিস্ট’।

কিন্তু চুপ ছিলেন কি! না, নন্দীগ্রামে গণহত্যার অভিযোগ আর কলকাতায় তার অভিঘাতের সময়ে তিনি পথে নেমেছেন। আর সেই সময়েই তৈরি করে দেন রাজনৈতিক বিতর্ক। তিনি ‘ডানে’ না ‘বামে’, সেই প্রশ্ন তৈরি করে দেন তিনি নিজেই। নজির গড়ে দেন দুই মিছিলে হেঁটে।

২০০৭ সালের ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিচালনা। আর তার পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজ্য রাজনীতি। আর সেই উত্তাপ নতুন করে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে নভেম্বরে। ১০ নভেম্বর নন্দীগ্রাম পুনর্দখল করে সিপিএম। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের কর্তারা নাম দেন ‘নন্দীগ্রামে সূর্যোদয়’। প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা।

সেই দিনেই ১০ নভেম্বর বুদ্ধিজীবীরা মিছিল করে যান নন্দন চত্বরে। প্রতিহত করে পুলিশ। অনেকেই গ্রেফতার হন। ১০ নভেম্বরের সেই ছোট ও প্রতিহত মিছিলটি মহামিছিল হয়ে ফিরে আসে ১৪ নভেম্বর। পা মেলান বিদ্বজ্জনেরা। মিছিলের পুরোভাগে শঙ্খ ঘোষ, তরুণ সান্যাল, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, যোগেন চৌধুরী, শুভাপ্রসন্ন, শাঁওলী মিত্র, ঋতুপর্ণ ঘোষ, জয় গোস্বামী, কৌশিক সেন, সুমন মুখোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসুরা। সেই সঙ্গে হাজারে হাজারে সাধারণজন। মৌনমিছিলে থমকে গিয়েছিল কলকাতার রাজপথ। অবাক করে দিয়েছিল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারকে।

১৪ নভেম্বর, ২০০৭। সরকার বিরোধী মিছিল। — ফাইল চিত্র

তবে সেই মিছিলে অংশ নিয়ে সব থেকে বেশি যিনি অবাক করেছিলেন, তিনি মৃণাল সেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মৃণাল সেন চলে আসেন সেই সময়ের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিসরে। কিন্তু তা বলে বাম সরকারের বিরোধিতায় কোনও মিছিলে হাঁটবেন ‘কোরাস’-এর পরিচালক মৃণাল সেন! অবাক হয়েছিল বাংলা ‘পদাতিক’-কে মিছিলে হাঁটতে দেখে।

কিন্তু তখনও বাংলা জানত না, আরও অবাক হওয়ার বাকি রয়েছে। ১৪ নভেম্বরের মিছিল কোনও রাজনৈতিক ব্যানারে না হলেও তা ছিল একশো শতাংশ রাজনৈতিক। পরের দিনও পালটা মিছিল ছিল অরাজনৈতিক ব্যানারে রাজনৈতিক। ১৫ নভেম্বর বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা মিছিল করলেন কলকাতা। আর তাতেও সামিল হলেন মৃণাল সেন। সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের হাতে ধরা মাইক্রোফোনে বক্তব্যও রেখেছিলেন ‘দুই মিছিলে হাজির’ মৃণাল সেন। সেদিন কলকাতায় তুমুল বৃষ্টি হয়েছিল। তার থেকেও তুমুল কলরব হয়েছিল একটি প্রশ্নে— মৃণাল সেন কোন পক্ষে?

১৫ নভেম্বর, ২০০৭। পালটা সমাবেশ। — ফাইল চিত্র

বাম সরকারের চাপেই কি সেদিন পালটা মিছিলে হাঁটতে বাধ্য হয়েছিলেন মৃণাল? নাকি, বাম-বিরোধী মিছিলে হাঁটার গ্লানি মুছতেই দ্বিতীয় দিনে পথে নামা? প্রশ্নে, প্রশ্নে জর্জরিত হয় বাংলা।

তবে আর কোনও বিতর্ক তৈরি হয়নি। আর কখনও তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে অঙ্ক কষতে হয়নি। দ্বিতীয় দিনের মিছিলে হাঁটা অনেকেই পরে ‘পরিবর্তন’-কে নিজেদের জীবনেও এনেছেন। সরকারি কবি, সাহিত্যিক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু মৃণাল সেন সে পথ মাড়াননি।

বামফ্রন্টের মনোনয়নে রাজ্য‌সভার সদস্য‌ হয়েছিলেন। কিন্তু সত্য‌জিৎ রায় প্রয়াত হওয়ার পরে তাঁকে নন্দনের চেয়ারম্য‌ান হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও, তিনি তা গ্রহণ করেননি। আবার ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার মৃণাল সেনকে সম্মানিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, রাজি হননি। আবার এমনটাও জানা যায় যে, একবার সব ব্যবস্থা করার পরেও মৃণাল সেনের রেট্রোস্পেকটিভ নবান্নের অপছন্দের কারণে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা পায়নি। তবে কোনও কিছুই সংঘাতের চেহারা নেয়নি।

সেই দূরত্ব রেখে গেলেন মৃত্যুর পরেও। তাঁর দেহ রাখা থাকছে না নন্দন বা রবীন্দ্রসদনে। সরকারি গান স্যালুটও নয়। আগেই যে ‘সরকারি’ সব কিছুকে ‘খারিজ’ করার মানসিকতা দেখিয়ে রেখেছেন ‘ভুবন সোম’।

পিনাকপাণি ঘোষ: রাজনীতি থেকে ঠেকবাজি, ধুলোগড় থেকে ধুলোঝড়, সবেতেই স্বচ্ছন্দ। ভালবাসেন টিপ্পনি কাটতে।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -