SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

বাঙালির জীবন থেকে কি হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী, নাকি কোথাও তারা আছেই

নভেম্বর ১৭, ২০১৮
```` Comments
উত্তর কলকাতায় গোয়াবাগানে যেমন, সেই রকমই ওই রিফিউজি কলোনিগুলোতেও মানুষ মানুষের জন্যে ছিল। জীবন জীবনের জন্যে ছিল। একটু সহানুভূতি ছিল।

আমাদের কলকাতায় প্রতিবেশীরা, পাড়ার লোকজন সবাই ছিল যেন আত্মীয়ের মতো। সবাই সবাইকে চিনতো, সবাই সবাইকে বিপদে আপদে সাহায্য করতো। এ বাড়ির ছেলে ও বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে যেত। আর ও বাড়ির কিশোরী মেয়ে এ বাড়ির বান্ধবীর কাছে যেত বিকেলবেলা স্কুলের ছুটির পর। সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসার ঠিক আগে পর্যন্ত চলত তাদের ঘুড়ি ওড়ানো আর গল্পগাছা।

বিজয়ার পরে, আর পয়লা বৈশাখে আমরা কত বার বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে বড়দের প্রণাম করে বেশ সন্দেশ রসগোল্লা লেডিকেনি খেয়ে এসেছি।

বিশেষ করে উত্তর ও মধ্য কলকাতায়। দক্ষিণ কলকাতায় যে ছিল না, তা বলছি না। কিন্তু পুর নো কলকাতা বলতে যেহেতু ওই শ্যামবাজার, বাগবাজার, হাতিবাগান, কলেজ স্ট্রিট, ঝামাপুকুর, সিমলা, যেখানে বাংলার এক বীর সন্ন্যাসীর জন্ম হয়েছিল, কিছুটা পশ্চিম ঘেঁষা জোড়াসাঁকো, যেখানে বাংলার এক সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের সৃষ্টি শুরু হয়েছিল, আর ও দিকে আহিরীটোলা, কুমোরটুলি, শ্যামপুকুর— এসব জায়গায় পুরনো দিনের সমাজব্যবস্থা খুব বেশি দেখতে পাওয়া যেত।

আমরা বড় হয়েছি সেই পুরনো সমাজব্যবস্থা কিছুটা অবশিষ্ট থাকতে থাকতে। আমার স্মৃতিকথায় যেমন লিখেছি, এক একটা পাড়া ছিল যেন এক একটা ছোট ছোট গ্রাম। আমাদের বিলাসিতা ছিল না, আর তার জন্যে কোনও আক্ষেপও আমাদের ছিল না। আমরা আমাদের সেই গ্রাম গ্রাম পাড়া পাড়া কলকাতায় আমাদের ভাঙা ক্রিকেট ব্যাট আর শীতের দুপুরের গলির সোবার্স নাদকার্নি ব্যারিংটন কাউড্রি কালীচরণ গাওস্কর চন্দ্রশেখর হানিফ মহম্মদ সিম্পসন লরি টমসন লিলি, গরমকালের ইস্কুল ছুটির সময়ে নারকেল দড়ি দিয়ে টাঙানো গোলপোস্ট আর পাড়ার তুমুল সমাজপতি চুনী বলরাম লিগ, আর ঝুমঝুমাঝুম নাচ রে বর্ষাকালে একহাঁটু জলে প্যান্ট গুটিয়ে চটি হাতে অনেক বেশি দেরি করে বাড়ি ফেরা, আর হাতে টানা রিকশার সামনের ত্রিপল ঝুলিয়ে দিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে হাতে হাত দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফেরা নিয়ে দারুণ খুশি ছিলাম।


উত্তর কলকাতা— প্রতিবেশীরা ভাল আছেন তো? ছবি: শাটারস্টক

বেশি দেরি হয়ে গেলে পাড়ার বন্ধুরা অপেক্ষা করে থাকত। বাড়ি ঢোকার পরে তারা রুমাল দিয়ে রক মুছে বাড়ি যেত।

শহুরে কলকাতায় বড় হওয়া আমরা কখনও গ্রামের জীবন দেখিনি। ওই মাঝে মাঝে একদিন দু’দিন বা একবেলার জন্যে ওই আমাদের সেই সময়কার গ্রাম গ্রাম ভাটপাড়া, রাজপুর, কিংবা চন্দননগর, বালি।

আমার গ্রামের জীবন দেখা হলো অনেক পরে, আমার চার বছর সুন্দরবন কলেজে অধ্যাপনা। সেখানে থাকা। হ্যারিকেনের আলোতে বোটানির বই, আড্ডা, আর শেষে জি আর ই-র বই পড়া লুকিয়ে লুকিয়ে।

যাদবপুরের গাঁধী কলোনিতে থাকতেন আমার মাসি আর তার ছেলেমেয়ে। মেসোমশাই পার্টিশনের পর উৎখাত হয়ে এসেছিলেন যৌথ পরিবার সমেত। ঠিক যেমন এসেছিল আমার বউয়ের মা মাসি, আর বাবা কাকার দল। ওঁদের শরণার্থী জীবনের দুঃখ, দারিদ্র, অভাব আর ভিটেমাটি ছাড়ার কষ্ট কিছুটা ভুলিয়ে দিত ওদের সেই কলোনিতে একসঙ্গে থাকার ভালোবাসা। এর বাড়ি একদিন রান্না না হলে ওর বাড়ি থেকে ভাত আসত।

আমি অনেক বার সেসব গল্প শুনেছি। আর গাঁধী কলোনি তো ছিল আমার বেড়াতে যাবার সবচেয়ে প্রিয় একটা জায়গা।

ওই উত্তর কলকাতায় গোয়াবাগানে যেমন, সেই রকমই ওই রিফিউজি কলোনিগুলোতেও মানুষ মানুষের জন্যে ছিল। জীবন জীবনের জন্যে ছিল। একটু সহানুভূতি ছিল। পাড়ার কেউ চাকরি টাকরি নিয়ে অনেক দূরে চলে গেলে আত্মীয় বিয়োগব্যথার মতো অনুভূতি হতো।

আর যে বাচ্চা ছেলেটা পাশের বাড়ির রমা মাসির কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে, সেই মাসি যখন বিয়ে হয়ে ধানবাদ না জামশেদপুর কোথায় চলে গেলো শ্বশুরবাড়ি, তখন সেই বাচ্চা ছেলেটা কেঁদে কেঁদে টাইফয়েড বাধিয়ে বসত।

তাকে কেউ কখনো বলে দেয়নি, রমা মাসি আসলে তার নিজের মাসি নয়, ‘প্রতিবেশী’ মাত্র। 

আমাদের নতুন শরণার্থী জীবন এই আমেরিকায় গত তেত্রিশ বছর। প্রথমে মধ্য ও দক্ষিণ ইলিনয়ের জনশূন্য গ্রাম, তার পর ছ’মাস শীত আর বরফের দেশ উত্তর নিউ ইয়র্কের ছায়া ছায়া এক ঘুমন্ত শহর, আর তার পর গত কুড়ি বছর এই নিউ ইয়র্ক মহানগরী। প্রতিবেশী আর সমাজ সেরকম এদেশে আর নেই। ওই ইমিগ্রেন্ট বাঙালি আর ইন্ডিয়ানদের মধ্যে কিছুটা আছে হয়তো। বাংলাদেশি বাঙালিদের মধ্যে অনেক বেশি আছে। ওরাও আমাদের সেই গাঁধী কলোনির গরিব রিফিউজিদের মতো।

একই গল্প, একই ইতিহাস। শুধু স্থান কাল আর পাত্র আলাদা।

নিম্নবিত্ত লাতিনো ইমিগ্র্যান্টদের মধ্যে সমাজ অনেক বেশি আছে। ওরা ওদের হাড়ভাঙা খাটুনি, নথিবিহীনতার ভীষণ অনিশ্চয়তা ও ভয়, আর তার মধ্যেই শনি-রবিবারের দুপুরে পার্কে উদ্দাম ফুটবল খেলা আর সন্ধেবেলা বার্থডে পার্টিতে গিটার বাজিয়ে গুয়ান্তানামেরা গান গেয়ে ভালই আছে। ক্যারিবিয়ান বা হাইতিয়ানরাও তাই।

আর কিছুটা ভাল আছে আমেরিকার কালো মানুষরা। তাদের সংগ্রামের ইতিহাসও অনেকটা একই রকম। তাই তাদের ভালবাসার তাগিদও একরকম। ওরা ওদের নিজেদের সমাজ, নিজেদের চার্চ, আর নিজেদের জ্যাজ আর ব্লুজ নিয়ে বেঁচে আছে।


আমাদের ব্রুকলিনের বাড়ির দুইপাশের দুই কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিবেশী। এদিকে রোগা ক্ষয়াটে চেহারার হোজে। আর তার সামান্য ঘরের বাড়িওয়ালা ব্রাদার ফিলিপ। ব্রাদার ফিলিপের সঙ্গে কথা বললে আগে আদ্ধেক কথা বুঝতে পারতাম না। এতকাল পরেও তার ‘থিক দক্ষিণী উচ্চারণ’— স্থূল অ্যালাবামা অ্যাক্সেন্ট।

দেশে আসার সময়ে যার কাছে আমাদের বাড়ির চাবি দিয়ে আসি।

হোজে আমার বউয়ের নানা ফাইফরমাশ খেটে দিত। গরম শেষ হয়ে গেলে এয়ার কন্ডিশনার খুলে বেসমেন্টে রেখে দিত। আর শীতের শুরুতে আমাদের বাড়ির পিছনের ছোট্ট বাগানটা পরিষ্কার করে, বসার চেয়ার টেবিলগুলো মজবুত করে টার্পোলিনের চাদর দিয়ে বেঁধে এক কোণে রেখে দিত। তুষারঝড় শুরু হলে যাতে সেগুলো উড়িয়ে নিয়ে না যায়।


নিউ ইয়র্কের প্রতিবেশী— আন্তরিকতা একই, প্রকাশ আলাদা, ছবি: লেখক

আর এদিকের বাড়িতে থাকত পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা হেলেন। এই পাড়াটা আগে যেহেতু ব্ল্যাক অধ্যুষিত ছিল, তাই আমাদের প্রতিবেশীরাও প্রায় সবাই ব্ল্যাক। হেলেন একাই থাকত। আমার বউ মাঝে মাঝে খোঁজ নিত। অসুখ বিসুখ করলে একটু এটা সেটা রান্না করে দিত। আর, থ্যাংক্সগিভিংয়ের উৎসবে হেলেন আমাদের জন্যে একটু টার্কি, একটু কেক, এসব দিয়ে যেত দরজার বেল বাজিয়ে।

স্বাধীনচেতা মার্কিন নাগরিক। নিজের হাতে ওই ভীষণ বরফ পরিষ্কার করত রাস্তার ধারে দাঁড় করানো নিজের গাড়ির থেকে। বলত, কাজ করছি তাই বেঁচে আছি, হানি। কাজ না করলে মরে যাব।

ছেলেরা নিয়ে যেতে চাইত। যেত না।

মাস ছয়েক আগে গরিব হোজে মাত্র কয়েক মাস ব্রেন ক্যানসারে ভুগে মরে গেল। আর ক’দিন আগে গেল হেলেন। রাত দুটো না তিনটের সময়ে। একেবারে আমাদের গায়ে লাগানো বাড়ি। ওর বাড়ি রেডিও বাজলে, ফোন বাজলে আমরা শুনতে পেতাম।

প্রতিবেশী। দেশ থেকে বহু বহু দূরে, সাগরপারের নতুন দেশে নতুন প্রতিবেশী।

আত্মীয় বিয়োগব্যথা এখানেও।

ওদের রেডিও, ওদের ফোন আর বাজবে না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়: আমেরিকায় তিরিশ বছর আছেন। বর্তমানে নিউ ইয়র্ক শহরে শ্রমিক-শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী। সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার জগতে তিনি বহু বছর ধরে কাজ করছেন। তাঁর অনেক রচনা ভারত এবং আমেরিকার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখার বাইরে শখের মধ্যে পড়ে গান গাওয়া ও শোনা। প্রকাশিত গ্রন্থ— ‘ঘটিকাহিনি’।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -