SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

দিনবদলের দিঘায় দিনযাপনই কষ্টের, চোখের জলে ভেজে লেন্স

নভেম্বর ১৯, ২০১৮
```` Comments
দিনবদলের নিয়ম মেনে সবই কি এক রকম আছে? অনেক কিছুই বদলেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম সাগরপাড়ের এই ছবিওয়ালারা।

বাঙালির ‘সস্তায় পুষ্টি’ ভ্রমণ ভেন্যু দিঘা। বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে চলেছে নোনা বাতাস, মাছভাজার গন্ধমাখা সৈকতবিলাসের ইচ্ছে। সামান্য দু’দিনের ছুটি পেলেই খানিক তাজা হাওয়া সেবন করতে আজও ব্যাকপ্যাক কাঁধে বা ট্রলি ব্যাগ হাতে সমুদ্রের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া। 

তবু দিনবদলের নিয়ম মেনে সবই কি এক রকম আছে? সমুদ্র, বালি, দিগন্তের চেহারা একই থাকলেও পরিপার্শ্ব বদলেছে। মশলা মুড়িওয়ালারা কুপির গন্ধ, মাছভাজার গন্ধ, কাঁচা মাছের গন্ধ, উইকেন্ডে ভিড়ে ঠাসা সৈকত, সানগ্লাস পরে যুবক দলের হল্লা— আপাত ভাবে মনে হবে একই তো। তবু, বদল তো হবেই। সেটাই নিয়ম। আগের থেকে দিঘা এখন অনেক পরিষ্কার। ঝকঝকে। আলোও বেশি। বিশ্ববাংলার লোগোর সামনে সেলফি-হ্যাংলা বাঙালি খুঁজে পেয়েছে নতুন স্পট! সমুদ্র থেকে সরে এসে সেখানে দাঁড়িয়েই ‘পাউট’ করার ঢল নামে। বদল আরও আছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছবিওয়ালারা। হ্যাঁ, বাঙালির সযত্নে লালিত দিঘা-স্মৃতিতে তাঁদেরও অবদান কিছু কম নয়। পুরনো অ্যালবামে সদ্য উদিত সূর্যকে তালুবন্দি করে রাখার দুরন্ত কায়দাওয়ালা ছবি মনে করুন। কোনও ফোটোশপ-টপ নয়। স্রেফ হাতের কাজ। সেই ‘শিল্পী’রা আজ বিপন্ন। বদলে যাচ্ছে তাঁদের যাপনচিত্র। 

এখন স্নানের সময়টাই ভরসা। ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে ট্যুরিস্টদের সমুদ্রে দাপাদাপির মুহূর্তকে লেন্সবন্দি করার আর্জি নিয়ে হাজির হয়ে যান এই মানুষগুলো। — ‘‘ও দাদা, একটা স্নানের ছবি তুলবেন না।’’ 
— ‘‘ও বউদি, একটা তুলুন না দাদার পাশে, ভাল করে তুলে দেব।’’

এ সব সংলাপ আমাদের চেনা। আগে সকাল-সন্ধে তাঁদের দেখা মিলত। এখন মূলত স্নানবেলাতেই আনাগোনা। কতটা বদলেছে দিন? কথা হচ্ছিল পাড়ে দাঁড়ানো এক ফোটোগ্রাফারের সঙ্গে। জানালেন, ‘‘ফোটোগ্রাফির সেই কদর আর নেই। প্রত্যেকেরই শখ ছিল ছবি তোলানোর। কিন্তু এই সেলফির জমানায় সেই দিন আর নেই। যার ফলে আমাদের সংসার চালানো বেশ অসুবিধা হয়ে যাচ্ছে।’’

আগে কেমন দিন ছিল? বিষণ্ণ হেসে তিনি জানান, ‘‘আগে সানরাইজ দেখতে এসে যে পার্টি ছবি তুলত, দেখা গেল তারা যখনই বিচে আসছে দু’টো-চারটে ছবি তুলছে। দেখা যেত, সানরাইজ, সানসেট, স্নান— এক একটা পার্টিই দিনে দশ-পনেরোটা ছবি তুলে ফেলছে। কিন্তু এখন কেবল স্নানের সময়টুকুই ভরসা। আগে যেখানে ষাট-সত্তরটা ছবি উঠত, এখন সেখানে দশটা ছবিই সারা দিনে তুলতে দম বেরিয়ে যাচ্ছে।’’

বছর পঁয়তিরিশ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত প্রদীপ জানা। ওল্ড দিঘার সৈকতে ছবি তুলে বেড়ান। চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেছেন ট্রেন্ডটা। মোবাইল কী ভাবে গ্রাস করছে, সে কথা বলতে গিয়ে জানালেন, ‘‘যত দিন যাচ্ছে, তত অবস্থা খারাপ হচ্ছে।’’

ঘুরে ফিরে অন্য ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেল তাঁরা প্রত্যেকেই কমবেশি একমত। ব্যবসা ক্রমে খারাপ হচ্ছে। একটা স্টুডিওতে চার জনের বেশি ফোটোগ্রাফার নেওয়া যাবে না। এমনই নিয়ম।

ঠিক কত টাকা রোজগার হয় একটা ছবি তুলে? জানা গেল, একটা কুড়ি টাকার ছবিতে পাঁচ টাকা পায় ল্যাবরেটরি, পাঁচ টাকা পান স্টুডিওর মালিক। বাকিটা ফোটোগ্রাফারের। এই ল্যাবরেটরিও বেঁধে দেওয়া। ওল্ড দিঘায় একটি, নিউ দিঘায় দু’টি। যাতে ছবির কোয়ালিটি একই থাকে, তাই একই কাগজ ব্যবহার করা দরকার। তাই এ ভাবে বেঁধে দেওয়া। রেট একই। 

ক্যামেরা বদলেছে। আগে পুরনো লেন্সের ক্যামেরা। ছবি প্রিন্টে খরচ পড়ত বেশি। এখন ডিজিটাল ক্যামেরায় ভাল ছবি মেলে কম খরচে। কিন্তু খরিদ্দারেই যে ভাটা। এখন সবাই ক্যামেরাম্যান। মেগাপিক্সেল খচিত ছবির মোহে আবিষ্ট। নিত্যনতুন অ্যাপ-ট্যাপে সে সব ছবি আরও মোহময়। মোবাইলের লেন্সই সব। ক্যামেরাই ব্রাত্য। ক্যামেরাম্যানরাও।

খরিদ্দার ধরায় তাই কম্পিটিশনও মেশে। কীভাবে অন্যকে টেক্কা দেওযা যায়? একজন সেই আড্ডার মাঝে এসে হেসে জানিয়ে দিলেন, খরিদ্দার ধরার নানা কায়দা আছে। কাছে এসে ঘ্যানঘ্যান করলে পার্টি বিরক্ত হয়। তাই প্রথমে নানা ভাবে সাহায্য করতে হয়। ‘ওদিকে যাবেন না। বোল্ডার আছে। এদিকে যান।’ এই ধরনের টিপস দিলে পার্টি খুশি হয়। তাতেই বাজিমাত। খুশি হয়ে সেই ফোটোগ্রাফারের লেন্সকেই বেছে নেয় সেই পার্টি। 

ওল্ড দিঘায় স্নানের সবচেয়ে ভাল জায়গা সি হক ঘোলা। সেখানেই বেশি আসেন ফোটোগ্রাফাররা। তবে অন্য স্পটেও আনাগোনা থাকে। গলায় ঝোলানো ক্যামেরা। 

সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় লাইন অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু প্রদীপবাবুদের মতো সিনিয়ররা হার মানতে রাজি নন। চ্যালেঞ্জ হিসেবেই যেন নিয়েছেন বিষয়টা। 

আড্ডা শেষে আবার ঝাঁপিয়ে পড়া জলে। দেখছিলাম তাঁদের রণকৌশল। পার্টিকে খুশি করতে নিজের চোখের সানগ্লাস খুলে দিয়ে দিচ্ছেন। প্রত্যেকেরই মাথায় একাধিক টুপি। সেগুলিও ইচ্ছেমতো পার্টিকে দিচ্ছেন তাঁরা। টুপি, চশমায় সেজে পার্টিও খুশিমনে পোজ দিচ্ছে। সুযোগ বুঝে টকাটক ক্যামেরার বাটনে ক্লিক। 

ঢেউয়ে ক্যামেরার ক্ষতি হয় না? জানতে চেয়েছিলাম। প্রদীপবাবু সগর্বে জানালেন, ‘‘আমার কোনও দিন হয়নি। নতুনদের কারও কারও ক্ষেত্রে টুকটাক হয় দেখেছি। মালিক বলে দিয়েছে, এক বার খারাপ হলে আর পাবে না। উলটে জরিমানা দিতে হবে। আমার মতো পুরনোদের ও সব ভয় নেই। ঢেউ চিনি তো। ঠিক পাশ কাটিয়ে যাই।’’

সমুদ্র তাঁদের কাছে হাতের তালুর মতো চেনা। সেই নোনা জলের ছাপ পড়ে মনে। রোজগার কমে গেলেও অশ্রুকে সামলে রেখে ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখতেই হয়। খিদে যে বড় বালাই। রৌদ্রময় বেলাভূমিতে লড়াই চলতে থাকে। ঢেউ সামলে পার্টিকে ছবি তোলায় সম্মত করতে আবদার মেশানো কণ্ঠে বলে উঠতে হয়, ‘‘দেখুন না, কেমন ছবি তুলে দিই। ছবি দেখে পয়সা দেবেন। ঢেউ ভাঙলেই ছবিটা তুলব।’’

ঢেউয়ের পর ঢেউ ভাঙে। দিন যায়। ছবিওয়ালার চোখ সরে না লেন্স থেকে। যদি সুদিনের দেখা মেলে।

পেশায় সাংবাদিক, নেশায় গল্পকার। ভালবাসেন রোমাঞ্চকর খাওয়া-দাওয়া। ভালবাসেন কল্পবিজ্ঞান, ভূতের গল্পও।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -