SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

সফল যৌনতা কতটা টেকাতে পারে বিয়েকে, সন্দিহান বিশেষজ্ঞরাও

অক্টোবর ২৭, ২০১৮
```` Comments
চার-পাঁচ বছর পরে শরীর অবধারিত ভাবে বাদ যায় বিবাহিত সম্পর্ক থেকে। পরাহত হয় প্রেম।

সাহিত্যিক পরশুরাম তাঁর ‘অক্রুর সংবাদ’ গল্পে বিবাহকে তিনটি কিসিমে ভাগ করেছিলেন। প্রথম, সেই রকম বিয়ে, যেখানে গিন্নি কর্তার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দ্বিতীয়, যেখানে কর্তা গিন্নির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তৃতীয়, কর্তা ও গিন্নি একত্র বাস করেন না, তাঁরা মাসে একবার পালা করে পরস্পরের অতিথি হন। কেউ কারোকে ডমিনেট করেন না। ফলে আত্মসমর্পণের কোনও প্রশ্নই নেই। পরশুরাম স্বীকার করেছিলেন, এই তিন নম্বরটি তিনি রবি ঠাকুরের কাছ থেকে ধার করেছিলেন। ‘শেষের কবিতা’-য় নাকি অমিত রায় আর লাবণ্য তাদের সম্ভাব্য দাম্পত্য এই ছকেই ছকেছিল। 

প্রশ্ন এই, কেন পরশুরাম এমন ত্রিধাবিভাজনকে দেখলেন? ‘অক্রুর সংবাদ’ গল্পের উপজীব্য ছিল সঠিক বিবাহের সন্ধান। কিন্তু সেটা যে কোনও অবস্থাতেই সম্ভব নয়, তা গল্পের শেষে বলাও ছিল। এই প্রসঙ্গে সমাজবিদ বিনয় ঘোষমশাই কালপেঁচার কলমে বিয়ে নিয়ে কী কেলেচ্ছাটাই না রচেছিলেন! বিয়ের বিবিধ ঝকমারি লিখে পাঠককে বিভীষিকা দেখিয়ে তিনি কিন্তু শেষমেশ বলেছিলেন— বিয়েটা করুন। না করলে জীবনে বড় কিছু থেকে বঞ্চিত হবেন।


পরশুরাম, ফাইল ছবি

কথাটা হল, বিয়ে নিয়ে মানুষ যতটা পজিটিভ কথা বলেছে, তার চাইতে অনেক বেশি নেতি কপচেছে। যা তা জোকস বানিয়েছে। ‘ম্যারেজ জোকস’ নামের একটা উপধারা বিশ্বের জোকস সাহিত্যে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। প্রাচ্য হোক বা পাশ্চাত্য, এগিয়ে থাকা টেকনোলজির দেশ হোক অথবা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতির মুলুক— বিয়ে নিয়ে খিটখিটেপনা নেই, এমন সমাজ পাবেন না। এমতাবস্থায় একটা ব্যাপার বার বার মনে হয়, মন নিয়ে যাঁদের কারবার, সেই মনোবিদরা কীভাবে দেখেন বিয়ে নামক প্রথা তথা প্রতিষ্ঠানটিকে। আজকের মনোবিদদের কথা থাক। তাঁরা তো প্রায়শই রেফারড হন পত্র-পত্রিকায়। ফিরে যেতে ইচ্ছে করে মনোবিদ্যাচর্চার একেবারে গোড়ায়। বিংশ শতকের প্রারম্ভে যখন সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর মনোবিজ্ঞানকে ব্যক্ত করছেন। 

কী ভাবতেন ফ্রয়েড বিয়ে নিয়ে? নিজে বিয়ে করেছিলেন ৩০ বছর বয়সে। আর জীবনে একটাই বিয়ে করেছিলেন। মার্থা বার্নেসের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সুখেরই ছিল বলে জানা যায়। প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফ্রয়েড বিবাহকে সমর্থনই করেছেন। তাঁর রচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সামাজিক স্থিতির জন্য বিবাহকে ফ্রয়েড জরুরি বলে মনে করতেন। মনে করতেন, সন্তানের মানসিক ও স্নায়বিক সুস্থিতির জন্য বাবা-মায়ের বিবাহিত জীবন সুখের হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। বিবাহবিহীন, দায়মুক্ত যৌনাচরণ যে সামাজিক বিপর্যয়কে ডেকে আনতে পারে, ফ্রয়েড তা-ও বিশ্বাস করতেন। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে বিবাহ নিয়ে তাঁর মতামত কী ছিল— এটা একলপ্তে জানা যায় না। 


সিগমুন্ড ফ্রয়েড, ছবি: শাটারস্টক

২০০৭ সালে মার্কিন আইনজ্ঞ জেড রুবেনফ্লেড ‘দি ইন্টারপ্রিটেশন অফ মার্ডার’ নামে এক উপন্যাস লেখেন। সেই উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র সিগমুন্ড ফ্রয়েড। উপন্যাসটি ফ্রয়েডের জীবনের একমাত্র মার্কিন সফরকে ভিত্তি করে লিখিত। নামজাদা ফ্রয়েড গবেষক রুবেনফ্লেড এই আখ্যানে বিবিধ কাল্পনিক এলিমেন্টের সঙ্গে ফ্রয়েড সম্পর্কে যা লিখেছিলেন, একান্ত ভাবেই গবেষণা প্রসূত, একথা বইয়ের উপসংহারে জানিয়েছেন। এই উপন্যাসেরই এক জাযগায় এক ডিনার পার্টিতে মার্কিনি হাই সোসাইটি লেডিদের দ্বারা অনুরুদ্ধ হয়ে ফ্রয়েড মন্তব্য করেছিলেন বিবাহ সম্পর্কে। রুবেনফ্লেডের তৈরি সেই মন্তব্যকেই ফ্রয়েডের বিবাহ-ভাবনার নির্যাস বলে যেতে পারে। 

ফ্রয়েডের মুখ দিয়ে রুবেনফ্লেড যা বলিয়েছেন, তার সারমর্ম এই— বিয়ে কীসে টেকে? কতদিন টেকে? সফল যৌনমিলন কি বিয়েকে টেকাতে পারে? না। পারে না। পরম তৃপ্তিদায়ক মিলনও বিবাহকে দীর্ঘস্থায়ী করে না। চার-পাঁচ বছর পরে শরীর অবধারিত ভাবে বাদ যায় বিবাহিত সম্পর্ক থেকে। পরাহত হয় প্রেম। আধ্যাত্মিক সংযোগও যদি কিছু থেকে থাকে, তা-ও লুপ্তির পথে চলে যায়। বিবাহ পর্যবসিত হয় পরমতম ব্যর্থতায়। নারী ও পুরুষ— উভয়েই যেন ঠিকরে পড়ে প্রাকবিবাহ জীবনে। খালি একটাই পার্থক্য থাকে অবিবাহিত দশার সঙ্গে এই ভগ্নবিবাহ দশার। এ ক্ষেত্রে তারা হতদরিদ্র। কারণ বিবাহ নামের এক মরিচিমায়া হারিয়ে গিয়েছে তাদের জীবন থেকে।


হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়, ছবি: শাটারস্টক

তা হলে বিয়ের স্থায়িত্ব কি ৪-৫ বছর? তার পরে? এক নিঃশেষিত সম্পর্কসূত্রকে কি কেবল বইয়ে নিয়ে যাওয়া! ফ্রয়েড নিজে তো বয়েছিলেন মৃ্ত্যুকাল পর্যন্ত। তিনি মহাপুরুষ। কিন্তু আমাদের মতো নশ্বরদের কী হবে?     

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়: ভালবাসেন কবিতা আর ভূতের গল্প। গান শোনা আর বই পড়াতেই মোক্ষ।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -