SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

চম্বলের ডাকাতদের মাঝে বাঙালি যুবক, উঠে এল আশ্চর্য কাহিনি

ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯
```` Comments
‘গব্বর সিং’ নামের সত্যি সত্যি ডাকাত ছিল চম্বলে। জ্যোতি বসুর বাড়ির পাইপ বেয়ে উঠে এসেছিল চম্বলের ডাকাত! চমকে দেওয়া নানা কাহিনি শুনিয়েছেন শুভেন্দু।

‘‘মাঝরাতে দরজায় ঠকঠক শব্দ। ভাবলাম, হোটেলেরই কেউ হবে। উঠে দরজা খুলতেই ঘরের মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল দশ অন্ধকার ছায়ামূর্তি। ঘুমের ঘোরে প্রবল চমকে উঠেছি। তার পরে জানলাম, ওরা ডাকাত! আমি ওদের খুঁজছি, তাই দেখা করতে এসেছে।’’

বাঙালির ছেলের শখ হয়েছিল ডাকাতের সঙ্গে মোলাকাত করার। ঠিক শখ নয়। এ তাঁর রুজিরুটি। পেশায় সাংবাদিক শুভেন্দু দেবনাথের কাছে এটাই ছিল নতুন অ্যাসাইনমেন্ট। যে পত্রিকায় চাকরি করতেন, সেখানে প্রকাশিত হবে চম্বলের ডাকাত নিয়ে কভার স্টোরি। সেই সূত্রেই বেরিয়ে পড়া। অনেকেই পুরনো বইপত্তর, সাম্প্রতিক লেখালেখি পড়েই লিখে ফেলতে পারতেন। কিন্তু শুভেন্দু সেসব করেননি। চম্বলের ডাকাতরা কেমন আছে, খোঁজ নিতে নিজেই পাড়ি জমালেন সেই এলাকায়। আর তার পরেই এই কাণ্ড। 

চম্বলের বেহড়। ছবি: শুভেন্দু দেবনাথ।

‘‘আমি তখন মধ্যপ্রদেশের ভিণ্ড শহরে। রিসার্চের জন্য ঘোরাঘুরি করছি। সেই সময়ে একটা ফাস্ট ফুডের দোকানে দেখতে পাই এক ব্যক্তি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁর কোমরে গোঁজা বন্দুক। স্বাভাবিক ভাবেই অবাক হয়েছিলাম। দোকানের কর্মচারীদের কাছ থেকে জানতে পারলাম উনিই দোকানের মালিক। আলাপ করলাম। জানালাম আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য। ডাকাতদের সঙ্গে দেখা করতে চাই, জেনে উনি স্মিত হেসে বললেন, ‘মিল যায়েগা।’ বুঝিনি, কী বলতে চাইছেন। রাতের বেলায় বুঝলাম। যখন দরজায় ঠক ঠক শব্দ হল। আসলে ওই মালিকের সঙ্গে ডাকাতদের রীতিমতো যোগাযোগ ছিল। তিনিই খবর দিয়েছিলেন।’’ 

সেই রাতে তাঁর ঘরে যারা ঢুকে পড়েছিল, সেই দলের নেতা বাবুলি কৌল ও গৌরী যাদব। গৌরী মহিলা, বাবুলি পুরুষ। ওঁরাই ওই দলের নেতা। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গেই তিনি ঘুরে বেড়ালেন ডাকাতদের ডেরা। কেবল ফোন আর ক্যামেরাটা সঙ্গে রাখা যায়নি। 

বাঙালির কাছে ডাকাত বলতে ‘দেবী চৌধুরানী’, ‘বীরপুরুষ’ কিংবা ‘বাংলার ডাকাত’। পরবর্তী সময়ে তরুণ ভাদুড়ীর ‘অভিশপ্ত চম্বল’ কিংবা ‘বেহড় বাগী বন্দুক’ । এর পরে ‘সোনার কেল্লা’-র ‘রাজস্থান মে ডাকু হ্যায় ইয়া নেহি হ্যায়?’ কিংবা রমেশ সিপ্পির ‘শোলে’। তার পরে আর কিছু নেই। 

অরিজিন্যাল গব্বর আর সিনেমার গব্বর। ছবি: শুভেন্দু দেবনাথ।

২০১৭ সালের মার্চ মাসে আজকের চম্বলকে চিনতে বেরিয়ে পড়েছিলেন শুভেন্দু। চম্বল আর আজকের দিনে তেমন বিপজ্জনক নয়— এমন একটা ধারণা রয়েছে। সেই ধারণাকে অস্বীকার করলেন শুভেন্দু। জানালেন, বছর দুয়েক আগের ওই সময়ে পুলিশ ও প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে অন্তত ২০টি গ্যাং! তবে হ্যাঁ, সেই রকম ভয়ঙ্কর আর নয় পরিস্থিতি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গেই ধীরে ধীরে কমেছে ‘গব্বর সিং’-দের দাপাদাপি। 

‘গব্বর সিং‌’-এর প্রসঙ্গ উঠতেই শুভেন্দু জানান, ‘গব্বর সিং’ নামের সত্যি সত্যি ডাকাত ছিল ওই এলাকায়। পরে আরও একজন গব্বরের আবির্ভাব হয়। তবে সেই ডাকাত ‘শোলে’ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েই ওই নাম নিয়েছিল। 

ডাকাত নীলম গুপ্তার সঙ্গে লেখক। ছবি: শুভেন্দু দেবনাথ।
 

চম্বলের ডাকাতদের সঙ্গে কলকাতার যোগও কিন্তু নিবিড়। এক সময়ে পাইপ বেয়ে উঠে এসেছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত মাধো সিং ৫৫বি হিন্দুস্থান পার্কে জ্যোতি বসুর বাড়ির অন্দরে। সঙ্গে দই-রসগোল্লার হাঁড়ি। বাঙালির মিষ্টিপ্রীতির কথা অজানা ছিল না তাঁদের। উদ্দেশ্য, জ্যোতিবাবু তাঁদের আত্মসমর্পণের বন্দোবস্ত করে দিন। যদিও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সটান জানিয়ে দেন, পলিটব্যুরোর সঙ্গে আলোচনা না করে এ বিষয়ে তিনি কিছু করতে পারবেন না। 

কেবল জ্যোতি বসুই নন, বাঙালির আর এক আইকন পিসি সরকার (সিনিয়র)-ও পড়েছিলেন ডাকাতের পাল্লায়। সেই ডাকাত মাধো সিং। তাঁর উদ্দেশ্য একটাই। ম্যাজিক শিখবেন!  

চম্বল নদী। ছবি: শুভেন্দু দেবনাথ।

শুভেন্দুর ঝুলিতে গল্পের শেষ নেই। চম্বল ও সেখানকার ডাকাতদের নিয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য দেখলে বিস্মিত হতে হয়। মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থান— এই তিন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকাই জুড়েছে চম্বলকে। রাজস্থান না গেলেও বাকি দুই রাজ্যে শুভেন্দু ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই সঙ্গে নাগাড়ে পড়াশোনা। ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছেন হিউয়েন সাং-কেও কী ভাবে ডাকাতদের পাল্লায় পড়তে হয়েছিল। 

ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে পুরাণও। উত্তরপ্রদেশের অন্তর্গত চম্বল নদীর তীরে রয়েছে ‘অটের কিলা’। বলা হয় যে পাহাড়ের মাথায় ওই কেল্লা যেখানে, সেটাই মহাভারতের দেবগিরি পর্বত। এমনকী, মহাভারতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সঙ্গেও যোগ রয়েছে চম্বলের। চম্বল নদীর পাড়েই নাকি ঘটেছিল সেই ঘটনা। দ্রৌপদী অভিশাপ দেন, যে এই নদীর জলপান করবে তার অনিষ্ট হবে। সেই থেকেই চম্বল ‘অভিশপ্ত’। ওই নদীর পাড়ে যে বসতি গড়ে উঠল না, তার পিছনে সেটাই নাকি কারণ।

লেখকের সঙ্গে মালখান সিং। ছবি: শুভেন্দু দেবনাথ।

সেই অভিশপ্ত চম্বলের কাহিনিই শুভেন্দু তুলে ধরেছেন তাঁর বই ‘আবার চম্বল’ বইতে। প্রকাশক হাওয়াকল পাবলিশার্স। বইয়ের পাতায় পাতায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ডাকাতের দল। শুভেন্দুর কলমে নতুন করে ‘হা রে রে রে’ করে তারা ঢুকে পড়তে চায় বাঙালি পাঠকের অন্দরে। তবে, ‘হা রে রে রে’ তো একান্তই বাংলার। চম্বলের ডাকাতরা কোন হুঙ্কার তুলে ডাকাতি করে? সেটা জানতে হলে আবার শুভেন্দুর শরণাপন্ন হতে হবে।   

পেশায় সাংবাদিক, নেশায় গল্পকার। ভালবাসেন রোমাঞ্চকর খাওয়া-দাওয়া। ভালবাসেন কল্পবিজ্ঞান, ভূতের গল্পও।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -