SEND FEEDBACK

হক কথা

পর পর দুর্ঘটনায় সাক্ষীরা নিহত, প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে চুপ থেকেছে সব সরকারই

জানুয়ারি ১৩, ২০১৯
```` Comments
রাশিয়ানরা কি শাস্ত্রীর শরীরে বিষপ্রয়োগের সম্ভাবনার কথা জানত?

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

গল্প কিন্তু শেষ হয়েও শেষ হলো না৷ সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন মোড় নিতে লাগল৷ ১৯৭৭-এ জনতা পার্টির ঐতিহাসিক জয়ের পরে সংসদের চেহারা যখন বদলে গেল, কংগ্রেস পার্টি বিরোধীদের আসনে বসল, তখন নতুন সরকার লালবাহাদুরের মৃত্যুর তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি তৈরি করলেন। অধ্যক্ষ হলেন সেই রাজনারায়ণ৷ কমিটি কিছু লোককে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে, কমিটির তলবে সাক্ষী দিতে যাচ্ছিলেন ডাঃ চুঘ, কিন্তু পথেই একটি ট্রাকের ধাক্কায় নিহত তিনি নিহত হলেন৷ তাঁর  স্ত্রী ও এক পুত্রও মারা গেল, কিশোরী কন্যাটি প্রাণে বাঁচলেও মারাত্মক জখম হয়৷ সাংসদ জ্যোতির্ময় বসু বলেছিলেন, ট্রাক প্রথমে গাড়ির পিছনে আঘাত করে, ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাপ করতে চালকের আসন থেকে নেমে আসেন চুঘ, তখন ট্রাকটি ঘুরে এসে তাঁকে মারে৷ অর্থাৎ তাঁর বাঁচার কোনও উপায় ছিল না৷ 

পড়ুন আগের কিস্তি

ওই দিনই কমিটির ডাক পেয়েছিলেন বৃদ্ধ রামনাথও৷ কমিটির কাছে যাওয়ার আগে তিনি বরাবরের অভ্যাস মতো ১ নম্বর মোতিলাল নেহরু মার্গে ললিতা শাস্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন— ‘‘আম্মা, অনেকদিন ধরে বুকের মধ্যে বোঝা নিয়ে ঘুরছি, আজ সব বলে দিয়ে হালকা হব৷’’ কিন্তু তাঁকে হালকা হতে দেওয়া হয়নি৷ মোতিলাল নেহরু মার্গ থেকে সংসদ ভবন হাঁটা পথ৷ পথেই একটি বাস তাঁর উপর দিয়ে চলে যায়৷ শক্ত প্রাণ রামনাথের৷ তিনি বেঁচে রইলেন, কিন্তু তাঁর দু’টি পা কেটে ফেলতে হলো৷ কিন্তু শকে বৃদ্ধের স্মৃতিভ্রংশ হয়ে গেল— রামনাথ আর কোনও দিন তাসখন্দের গল্প বলতে পারলেন না৷

দু’টি ঘটনা যে সমাপতন বা নিছক পথ দুর্ঘটনা নয়, তা বুঝতে রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না৷ সেই জন্যই প্রশ্নটা থেকে যায়— ডাঃ চুঘ বা রামনাথ এমন কী জানতেন, যার জন্য তাঁদের এত মূল্য দিতে হলো?

দু’দশক পরে আবার এমন একটা ঘটনা ঘটল, যাতে গল্পে অন্য মাত্রা যোগ হয়ে গেল৷ ১৯৯৮-এর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ান পত্রিকা ‘কমসোমলস্কায়া প্রাভদা’-তে একটি ছোট্ট খবর বেরোয়৷ খবরটি হল— ১৯৬৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী তাসখন্দে মারা যাওয়ার পরে আহমেদ সাত্তারভ নামক এক রাঁধুনিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল৷ সাত্তারভ শাস্ত্রীর ডাচা-য় তাঁর জন্য রান্না করত৷ কোনও ভারতীয় সাংবাদিক, এমনকী ভারতের রাজদূতাবাসও খবরটি লক্ষ্য করেনি৷ কিন্তু ‘লন্ডন টেলিগ্রাফ’-এর মস্কো সংবাদদাতা খবরটি দেখে তাঁর কাগজের জন্য পাঠিয়ে দেন৷ পরের দিনই খবরটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে৷ ললিতা শাস্ত্রীর প্রশ্নটা আবার মাথা চাড়া দেয়— রাশিয়ানরা কি শাস্ত্রীর শরীরে বিষপ্রয়োগের সম্ভাবনার কথা জানত?


বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে লালবাহাদুর শাস্ত্রী, ছবি: নিজস্ব

এরও প্রায় পনেরো বছর পরে, ২০১৩-র অক্টোবরে ‘রাশিয়া বিয়ন্ড’ ওয়েবসাইটের এক সাংবাদিক সাত্তারভের সাক্ষাৎকার নেন৷ সাত্তারভ বলেছিলেন— ১১ জানুয়ারি খুব ভোরে কেজিবি-র লোকেরা তাঁকে ও তাঁর তিন সহকর্মীকে গ্রেফতার করে৷ তাঁরা বলেন যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে৷ তাঁদের চার জনকে হাতকড়া লাগিয়ে তাসখন্দ থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে একটি ছোট শহরে নিয়ে যাওয়া হয়৷ খানিক পরে সেখানে জান মহম্মদকেও হাজির করা হয়৷ জেরা শুরু হয়৷ ছ’ ঘন্টা জেরা চলছে, সাত্তারভের ভাষায়— ‘‘আমরা এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে, আমার এক সহকর্মীর জুলফি আমাদের চোখের সামনে সাদা হয়ে গেল আর আমি সেই থেকে কথা বলতে গেলে তোতলাই৷ হঠাৎ কোসিগিন সেখানে উপস্থিত হন ৷ তিনি আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বললেন, মেডিক্যাল পরীক্ষায় ধরা পড়েছে যে, শাস্ত্রী হৃদরোগেই মারা গিয়েছেন৷ তোমরা কোনও ভাবেই দোষী নও৷’’ তার পর তাঁরা সকলে ছাড়া পান৷
 
গল্পটায় কিন্তু গণ্ডগোল রয়েছে৷ ভারত সরকারের বিবরণ অনুযায়ী, ডাঃ চুঘ বা রাশিয়ান ডাক্তারেরা কোনওরকম বিষক্রিয়া সন্দেহ করেননি, একবাক্যে হৃদরোগে মৃত্যুর সার্টিফিকেটে সই করে দিয়েছিলেন৷ অথচ কেজিবি পাঁচজন পাচককে গ্রেফতার করে বসল৷ তা ছাড়া, শব-ব্যবচ্ছেদ না করে ডাক্তারেরা কী করে বুঝলেন যে বিষের কোনও ভূমিকা ছিল না? তাহলে শাস্ত্রীজির শরীরের ক্ষতচিহ্নগুলি কি পোস্টমর্টেমের দাগ ছিল? 

শাস্ত্রীজির মৃত্যু নিয়ে এ রকম অনেক প্রশ্ন উঠে আসে৷ যেমন, দেশের সংসদে ভারত সরকার বার বার তার প্রশস্তি গেয়েছে, কিন্তু জান মহম্মদ পুলিশের সন্দেহভাজন এ কথা এক বারও বলা হয়নি৷ আরও বড় কথা, পাঁচ জন সন্দেহভাজন পাচককে মুক্ত করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী ছুটে আসবেন— ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য রকম ফিলমি নয়? লালবাহাদুরের গৃহসচিব ও পরবর্তী জীবনে রাজ্যপাল লালনপ্রসাদ সিংহ তাঁর লেখা এক বইতে জানিয়েছেন— রুশ কর্তৃপক্ষ শাস্ত্রীজির মৃত্যুর ময়নাতদন্ত করতে চেয়েছিল, কিন্তু বিদেশমন্ত্রী কর্ণ সিংহ অনুমতি দেননি। তিনি নাকি বলেছিলেন, দেশবাসী মনে করবে দেহ অপবিত্র হয়ে গিয়েছে৷ অথচ সংসদে এই প্রশ্নের উত্তরে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় গৃহমন্ত্রী বলেছিলেন— সেই সময়ে কোনও রকমের পোস্টমর্টেমের কথাই ওঠেনি৷  


রহস্যেই আবৃত রইল তাঁর মৃত্যু, ছবি: নিজস্ব

দিন দিন এই রহস্য নতুন নতুন ধারায় পল্লবিত হচ্ছে৷ বছর দশেক আগে নেতাজি-বিশেষজ্ঞ অনুজ ধরও এই অনুসন্ধানে যোগ দিয়েছেন৷ তিনি তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিতে তথ্যের অধিকার আইন অনুযায়ী নথিপত্র চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানায়, তাদের কাছে লালবাহাদুর সম্বন্ধে মাত্র একটিই ফাইল রয়েছে, সেটিও দেশের স্বার্থরক্ষার্থে প্রকাশ করা যাবে না৷ শাস্ত্রীজির মৃত্যু নিয়ে কাগজপত্রের প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের সঙ্গে এক বার আমার কথা হয়েছিল৷ তিনি অনেক বছর শাস্ত্রীজির উপদেষ্টা ছিলেন, তাসখন্দেও শাস্ত্রীজির সঙ্গী হয়েছিলেন৷ তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শাস্ত্রীজীর কী হয়েছিল৷ বৃদ্ধ আমাকে স্নেহ করতেন৷ তিনি একটু সময় নিয়ে মাথা নেড়ে বলেছিলেন— ‘‘আমার তো এতকাল মনে হতো হার্ট অ্যাটাকই হয়েছিল। লেকিন পুত্তর, দুনিয়া নে বহুত কুছ দিখায়া, ক্যা মালুম, কুছ ভি হো সকতা...’’

তাঁর কথার মানে অনেক পরে বুঝেছিলাম৷ নায়ার সাহেব যখন লন্ডনে ভারতের হাইকমিশনার, তখন গর্বাচভের পতন হয়, গ্লাসনস্তের উচ্ছ্বাসে কেজিবি-র বহু গোপন ফাইল বেরিয়ে এসেছিল৷ নায়ার তাঁর একটি চেনা লোককে ডিউটি দিয়েছিলেন শাস্ত্রীজির মৃত্যু সম্বন্ধে ফাইলগুলি খুঁজে বার করতে৷ কিন্তু অনেক সন্ধান করেও কিছুই পাওয়া যায়নি৷
 
এখন কিছু কিছু নেতাজি গবেষক দাবি করছেন, তাসখন্দে নাকি শাস্ত্রীজির সঙ্গে নেতাজির দেখা হয়েছিল৷ তথ্যপ্রমাণ অবশ্য বড়ই নড়বড়ে৷ তবে শাস্ত্রীজির মৃত্যু নিয়ে গোলকধাঁধার গণ্ডগোলের মতো রহস্যের জাল বিস্তারিত হয়েই চলেছে৷ লালবাহাদুরের দৌহিত্র, বিজেপি নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিংহ ভারত সরকারের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন— ‘‘আমি মেনে নিচ্ছি, আমার দাদুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল৷ কিন্তু তুমি ভাই দুটো কাগজ তো অন্তত দেখাও৷’’ 

উত্তর মেলেনি৷ এই মুহূর্তে তাঁরই পার্টি সরকার চালাচ্ছে, কংগ্রেসকে বিঁধবার এমন মোক্ষম অস্ত্র যদি সত্যিই প্রধানমন্ত্রীর দফতরে থেকে থাকে, সেটা তাঁরা নিশ্চয়ই লুকিয়ে রাখতেন না৷ কিন্তু কোনও কাগজের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে শুনিনি৷ তাই আমরাও কাগজের প্রতীক্ষা করব৷ এবং যতদিন তা না আসে, প্রতি বছর ১০ জানুয়ারির ওই ভোর চারটের ফোনটা আমাকে নতুন করে কষ্ট দেবে৷
তথ্যসূত্র
1. Your Prime Minister Is Dead - Anuj Dhar -Vitasta, 2018
2. Beyond The Lines - Kuldip Nayar - Lotus Roli--2012

(সমাপ্ত)

দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়:  জন্ম ও পড়াশোনা কলকাতায়,তারপর সরকারি চাকরি নিয়ে ঘোরাঘুরি। সত্তর ছুঁই ছুঁই মানুষটির আসক্তি সিনেমা,গান, অলৌকিক আর অপ্রাকৃতে। সেই সঙ্গে সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামানো।​

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -