SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

বাংলা ছবির ‘মণি’-দের কেন নিঃশব্দে চলে যেতে হয়

ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯
```` Comments
তাঁর মৃত্যুসংবাদ কেউ জানবে না এমনটাই নাকি চেয়েছিলেন তিনি। এই অভিমান কি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের?

তাঁর মৃত্যুর খবর সঙ্গে সঙ্গে ‘ভাইরাল’ হয়নি, দু’দিন পরে হয়েছে। কারণ, বিগত অনেক বছর তিনি প্রচারের আলোয় ছিলেন না। এমন একটা অন্তরাল তিনি বেছে নিয়েছিলেন যেখানে ‘ইন্ডাস্ট্রি’-র আলো পৌঁছায় না। শেষ জীবনটা কাটিয়েছেন বৃদ্ধাশ্রমে। এই বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর মনে কতটা অভিমান ছিল অথবা আদৌ কোনও অভিমান ছিল কি না, সেটা জানার সুযোগ হারিয়েছেন প্রতিবেদক। শোনা গিয়েছে যে তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মৃত্যু সংবাদ ‘কেউ’ জানবে না।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

এই ‘কেউ’-এর মধ্যে কারা পড়ছেন? এবং কেন? ‘কেউ’ মানে তো আসলে এই সময়কাল, গোটা বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রি থেকে দর্শক, সবাই যে চক্রাকার আবর্তে আবদ্ধ। সেই ‘কেউ’ সম্ভবত তাঁর জীবনকালে তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। তাই তিনিও মৃত্যুর পরে সেই সময়কাল থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন। আসলে তিনি যে সময়ের, সেই কালে বাংলা ছবির ‘জগৎ’ ছিল, ‘ইন্ডাস্ট্রি’ নয়। এই জগৎ থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তরণের বহুমাত্রিকতার ফাঁক গলে হারিয়ে গিয়েছেন বাংলা ছবির যে মণিমুক্তোরা, তাঁদেরই তো একজন ছিলেন সত্যজিতের ‘তিন কন্যা’ (১৯৬১)-র মণিমালিকা। 

সেই মহান চিত্র পরিচালকের কত ‘ফ্যান’! নব্য প্রজন্ম তাঁর ছবির কথা বলে! সংলাপে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। কত তর্কে, আলোচনায়, বিদগ্ধ চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ অথবা সত্যজিৎ বার্ষিকীতে কত শতবার উচ্চারিত হয়েছে ‘মণিহারা’-র নাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, অভিনেত্রী কোথাও নেই কেন? মহানায়িকাও ছিলেন অন্তরালবাসিনী, স্বেচ্ছা-নির্বাসিতা। কণিকা মজুমদার ‘মহানায়িকা’ হয়ে উঠতে পারেননি। কেন পারেননি সেই বিশ্লেষণের যোগ্যতা এই প্রতিবেদকের নেই। কিন্তু প্রশ্ন আছে, সমসাময়িক বাংলা ছবির ‘ইন্ডাস্ট্রি’-র কাছে, নিজের কাছে।

‘মণিহারা’-র একটি দৃশ্যে। ছবি: ইউটিউব থেকে

কণিকা মজুমদার নিঃসন্দেহে সত্যজিতের আবিষ্কার। ‘মণিহারা’ তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা কাজ। কিন্তু কণিকা তো ‘দ্য প্যাশন অফ জোয়ান অফ আর্ক’ (১৯১৭)-অভিনেত্রী রেনে জঁ ফ্যালকোনেত্তি নন। সিনেমার ইতিহাসে ফ্যালকোনেত্তি একজন কিংবদন্তি কিন্তু ওই একটি ছবির পরে আর কখনও কোনও ছবিতে তাঁকে দেখা যায়নি। চলচ্চিত্রের ইতিহাস প্রণেতাদের অনেকে বলেন, ফ্যালকোনেত্তি কখনওই ওই চরিত্রটি থেকে বেরোতে পারেননি। কিন্তু কণিকার ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। ‘মণিহারা’-পরবর্তী অভিনয় জীবন ছিল ডায়নামিক। ‘চিড়িয়াখানা’ থেকে ‘বসন্ত বিলাপ’ পর্যন্ত। সত্তর-আশির দশকের শিক্ষিত, রুচিসম্পন্ন যে ‘আধুনিকা’-রা বিলাসী ড্রয়িংরুমে অথবা কলেজের অলিন্দে, বাসস্টপে, সূক্ষ্ণ আবেদনে আগুন হতেন, পর্দায় সেই নারীত্বের অপরূপ ও নিখুঁত নির্মাণ ছিলেন কণিকা। অর্থাৎ সত্যজিৎ বাদ দিয়েও বাংলা ছবির জগতে কণিকা মজুমদারের চিরস্মরণীয় অবদান রয়েছে।  

  

‘মণিহারা’-র একটি দৃশ্যে। ছবি: ফাইল চিত্র

তবু, কেন আলোচিত হতেন না কণিকা? কয়েকশোবার ‘চারুলতা’ (১৯৬৪)-র জন্য মাধবী মুখোপাধ্যায় আলোচিত হয়েছেন, ‘সমাপ্তি’ (১৯৬১)-র জন্য অপর্ণা সেন আলোচিত হয়েছেন, ‘পোস্টমাস্টার’ (১৯৬১)-এর ‘রতন’-ও আলোচিত হয়েছেন কিন্তু ‘মণিহারা’-র কণিকা মজুমদার আলোচিত হননি সেই ভাবে, অন্তত সাম্প্রতিক সময়ে। ‘হার মানা হার’ (১৯৭২) অথবা ‘বসন্তবিলাপ’ (১৯৭৩)-এর কণিকাও নয়। এই জনবিস্মৃতি অনেকটা অলৌকিক নয় কি? আসলে এইভাবে ভাবতে পারলে কিছুটা দোষলাঘব হয়, আত্মগ্লানি কমে। ‘‘কেউ মনে রাখেনি, তাই আমিও মনে রাখিনি।’’ সংখ্যাতত্ত্বের জয়!

এমনটা নয় তো যে ‘মণিহারা’ দেখতে দেখতে দর্শক আসলে ভুলে যান যে ওই চোখ মণিমালিকার নয়, অলঙ্কার-আসক্তিতে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠা ওই শরীর মণিমালিকার নয়, ‘অভিনেত্রী’ কণিকা মজুমদারের। আর সেখানেই নিঃশব্দ অহঙ্কার-অভিমান বোধহয় অভিনেত্রীর। সেই অহঙ্কার শিল্পীর, সেই অভিমান প্রতিভার! তাই সত্যজিতের মণিমালিকা নির্জনে নিঃশেষ হতে হতে যেন মিলিয়ে গেলেন রবি ঠাকুরের কাদম্বিনীতে!

শাঁওলি দেবনাথ: কফি ও ক্যাফে অন্ত-প্রাণ। সুদূরের পিয়াসী আবার প্রিয় গান, প্রিয় সিনেমা, প্রিয় বই ও প্রিয় খাবার সহযোগে ঘরকুনো হতে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -