SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

মাচায় উঠে ‘পাবলিক’ নাচালেই শিল্পীর সার্টিফিকেট, তা হলে কি শ্রোতার হাতেই ভাগ্যের সুতো

নভেম্বর ২১, ২০১৮
```` Comments
এই তো সেদিন গান গাইতে গিয়ে নাচাতে না পারায় হেনস্থার শিকার হন এক গায়িকা। চটুল গানে কোমর দোলাতে না পেরে দর্শকরা ক্ষোভ উগরে দেন সেই মুহূর্তেই। নেমে যেতে হয় গায়িকাকে। ঘটনা খুব বিরল কি? অভিরুচি না থাকা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানের আয়োজকদের ভ্রুকুটির ভয়ে অনিচ্ছার গানটিও গাইতে হয়। পাছে পরের শো মিস না হয়।

‘বিশ্বকর্মা মাই কি জয়’ বলে মাইকে এক বার হাঁক দিলেই বাঙালির পুজো শুরু। আর তার উদযাপন অন্তহীন। শেষ হয়ে গেলেও কুছ পরোয়া নেহি। জগদ্ধাত্রী পুজোর পরেও তাই উৎসবকে টেনে ধরে বাঙালি বলে, ‘যেতে নাহি দিব’। বাধ্য শিশুর মতোই উৎসব বেচারাও থেকে যায় কখনও পার্কে, কখনও পাড়ার মোড়ে, কখনও মাঠে-ঘাটে। গভীর রাতেও দূরদূরান্ত থেকে ভেসে আসে কন্ঠীদের গলায় ‘দো ঘুঁট’, ‘মুংড়া’ বা ‘লায়লা ম্যায় লায়লা’। চার দেওয়ালের মধ্যে একফালি জানলার ফাঁক দিয়ে সুর ভেসে এলে শহরে উৎসবের রেশ কিছুটা অনুভব করা যায়। কিন্তু দূরবীন নিয়ে সেই সুরের পিছু নিলে কল্পনার ছবিটির মোলায়েম পরত খসে পড়ে। এই আপাত আনন্দ যে কতটা নির্মম আর রিক্ত, তা বুঝতে তালেবর হতে হয় না।

অতীতে যেতে হবে না। এই তো সেদিন গান গাইতে গিয়ে নাচাতে না পারায় হেনস্থার শিকার হন এক গায়িকা মেখলা দাশগুপ্ত। চটুল গানে কোমর দোলাতে না পেরে দর্শকরা ক্ষোভ উগরে দেন সেই মুহূর্তেই। নেমে যেতে হয় গায়িকাকে। ঘটনা খুব বিরল কি? অভিরুচি না থাকা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানের আয়োজকদের ভ্রুকুটির ভয়ে অনিচ্ছার গানটিও গাইতে হয়। পাছে পরের শো মিস না হয়। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

উৎসবের মেজাজে থাকা বাঙালির গান শোনা অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো। পেটে পাঁচফোড়ন পড়লেই তাঁরা কেউ তখন বেলবটম পরা অমিতাভ বা হাওয়ায় জামা উড়িয়ে সলমন খান। মঞ্চ ‘কাঁপানো’ শিল্পীর শুদ্ধ নি, কোমল নি-তে গিয়ে ঠেকছে নাকি দাদরা আর কাহারবার ধাক্কাধাক্কি চলছে, সেসব তখন স্রেফ মামুলি বিষয়। শর্ত— গান যেমনই হোক, তা যেন চেনা হয় ও কোমর দোলানো যায়। শিল্পী মহিলা হলে এবং বলিউডি আইটেম গাইলে তা পুজোর বোনাসের থেকে কম কিছু নয়। শিল্পীর কোন গানে আত্মতুষ্টি হয়, তার গুরুত্ব পাবলিকের কাছে নেই। 

কমফোর্ট জোন কার কাছে লোভনীয় নয়! তাই পাড়ার মাচা বা কলেজ ফেস্টেই শুধু চেনা গান নিয়ে মাতামাতি হয় বললে অসততা হবে। বোলপুরগামী ট্রেনের এসি কামরাতেও থেকে থেকে শোনা যায় ‘হৃদমাঝারে’ বা ‘দেখেছি রূপসাগরে’। বাউলের মতো সেজে একতারা হাতে কয়েক জন উঠে পড়েন ট্রেনে। যাত্রা পথেই শান্তিনিকেতনী আমেজ দিতে এই দু’টি গান ঠোঁটস্থ করে রাখেন। কর্পোরেটের রোজনামচা থেকে বাঁচতে উইকেন্ডে বোলপুরগামী বাঙালির লোকগীতি নিয়ে আদিখ্যেতা তখন যেন গিটারের পিঙ্ক নোট। অতএব নাম না জানা পথে সোনা কুড়োতে যাওয়ার থেকে আজকের ‘গানপ্রেমী’ বাঙালি চেনা গলিতে পাথর পেয়েই খুশি।  

ধরে নেওয়া যাক, কোনও অনুষ্ঠানে এক অমুক বা তমুক কণ্ঠী এসে নিজের পছন্দের গান ধরলেন। সেই গানের ব্যাকরণ যতই নিখুঁত হোক, সামনে বসে থাকা শ্রোতাদের চোখরাঙানিতে সেই কণ্ঠী তখন ‘বাপরে’ বলে এক্কেবারে ঠান্ডা। 

শিল্পীর নামের পাশে ‘সেলেব্রিটি’ তকমা থাকলে কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া যায়। নাচের গান গাওয়ার অনুরোধ থেকে যদিও তাঁরাও রেহাই পান না। তবে সেই জোরাজুরির জোর খানিক কম। কারণ অনুষ্ঠান শেষে শিল্পীর সঙ্গে 'একখান সেলফি হয়ে যাক'-এর পরেই ফেসবুকে ঢাক পেটানোয় রয়েছে উপরি আনন্দ। 


নাচের গানের অনুরোধ থেকে রেহাই পান না এঁরাও। (ছবি সৌজন্যে— খ্যাঁদা, ইমন ও রূপঙ্করের ফেসবুক)

বাউল হোক বা ঝুমুর, গলায় সুর তোলার সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতাদের স্রোতে ভাসাতে পারেন শিল্পী খ্যাঁদা (অনন্যা ভট্টাচার্য)। কিন্তু গানের সম্ভার যতই ভারী হোক, হিন্দি ধামাকাদার গানের অনুরোধ থেকে ছাড় পাননি তিনিও। সম্প্রতি রাজারহাটে এক আবাসনে গান গাইতে গিয়েও হিন্দি নাচের গানের অনুরোধ পান তিনি। রূঢ় না হয়ে উত্তর দেন, "আমি তো হিন্দি গান গাইতে পারি না। হিন্দি একটা গানই পারি, রঘুপতি রাঘব রাজা রাম। তোমরা কী ধরনের নাচ পছন্দ কর? হেড ব্যাং, না কি ভাসানের নাচ? কিন্তু আমি তো প্রত্যেকের নাচের ধরন অনুযায়ী গান গাইতে পারব না! বরং আমি যেমন গান গাই, তাতেই তোমরা নাচতে পারবে।" 

"আমি তো হিন্দি গান গাইতে পারি না। হিন্দি একটা গানই পারি, রঘুপতি রাঘব রাজা রাম। তোমরা কী ধরনের নাচ পছন্দ কর? হেড ব্যাং, না কি ভাসানের নাচ? কিন্তু আমি তো প্রত্যেকের নাচের ধরন অনুযায়ী গান গাইতে পারব না! বরং আমি যেমন গান গাই, তাতেই তোমরা নাচতে পারবে।" খ্যাঁদা

একই রকম পন্থা নেন গায়িকা ইমন চক্রবর্তীও। নাচের গানের অনুরোধ এলে ইমন বলেন, ''আমি যে গানটা গাইছি তাতেই নাচুন না! চাইলে 'তুমি যাকে ভালবাস' গানেও নাচতে পারেন।'' তবে শুধু গান নয়। পারিশ্রমিক নিয়েও শিল্পীকে হেনস্থার মুখে পড়তে হয়। এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে ইমন জানান, ''মালদায় একটি অনুষ্ঠানে পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমি গান গাইতে যাইনি। মালদার অনুষ্ঠানের আয়োজকরা তখন রটিয়ে দেয়, আমি অন্য একটি জায়গায় গান গাইতে গিয়েছিলাম।" সেই সময়ে ফেসবুক লাইভে এসে ইমন ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন।  

''মালদায় একটি অনুষ্ঠানে পারিশ্রমিক না পাওয়ায় আমি গান গাইতে যাইনি। মালদার অনুষ্ঠানের আয়োজকরা তখন রটিয়ে দেয়, আমি অন্য একটি জায়গায় গান গাইতে গিয়েছিলাম।"ইমন চক্রবর্তী

তা হলে কি শ্রোতার পছন্দ-অপছন্দ-রুচিবোধই শিল্পীর মাপকাঠি? শিল্পীর গানবোধ সব সময়েই মেপে দেবে শ্রোতা? অথবা যতক্ষণ না চোখে আঙুল দিয়ে মিডিয়া দেখিয়ে দেবে কে 'শিল্পী', ততক্ষণ তাঁর দর নেই। এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে অভ্যাস বদলে দিতে হবে শিল্পীদেরই। গায়ক রূপঙ্করের কাছে যেমন নাচের গানের অনুরোধ এলে তিনি বলেন, "আপনারা কেন আমাকে নিলেন? আপনারা যদি ডিজে আনতেন, তা হলে নাচতে অসুবিধা হতো না।"

আপনারা কেন আমাকে নিলেন? আপনারা যদি ডিজে আনতেন, তা হলে নাচতে অসুবিধা হতো না।রূপঙ্কর  

অদ্ভুত বিষয়, বৈঠকী আড্ডায় গান নিয়ে গালভারী করা বাঙালি, যাঁরা কানে হেডফোন গুঁজে গান নিয়ে আহা-উহু করেন, তাঁরাও পাড়ার অনুষ্ঠানে গিয়ে নাচিয়ে শ্রোতাদের ভিড়ে মিশে যান। কলকাতার বেশ কয়েকটি ছাদ সাবলীল হয়েছে। বেশ কয়েকটি ক্যাফেতেও শিল্পী নিজের মতো করে গান শোনাচ্ছেন। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায়, বা বেশ কিছু কলেজ ফেস্টেও রাত ও উত্তেজনা বাড়তেই চাহিদাও বদলাতে থাকে। তাই গায়ক বা গায়িকার ঝোলায় বলিউড আইটেম সং মাস্ট। তা না হলেই গান গেয়ে দিন গুজরানের আশা না ছেড়ে গতি নেই। 

তা হলে কি বসে গান শোনার লোক নেই? লোক থাকলেও সংখ্যা কমছে। রবীন্দ্রজয়ন্তী বা ১৫ই অগস্টে এঁরা ‘আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়’ পাড়ার মোড় ধুয়ে দেন। কিন্তু মোচ্ছবের দিনে কি একটু পা ফসকাবে না? তাই শিল্পীর দিকে সিটি ছুড়ে দিলে জামার কলার হয় গগনচুম্বী। সেই সময়ে শিল্পীর কেমন লাগছে, তা জানার বালাই নেই। শিল্পী তখন টাকা দিয়ে কেনা ‘বিনোদনকারী’ মাত্র। চাহিদা না মেটাতে পারলেই অবাঞ্চিত মন্তব্য ছুড়ে দেওয়া। 

সমস্যাটা ঠিক কী, সেটা আগে বুঝে নেওয়া দরকার। তার পরে কাটাছেঁড়া করলেই সমস্যার দেওয়াল থেকে একটা করে ইট ভেঙে পড়তে থাকে। এই প্রসঙ্গে সমস্যা মেটার ক্ষীণ আশা রয়েছে, যদি শিল্পীরাই রুখে দাঁড়ান। কয়েক জন অনুষ্ঠান আয়োজকদের টাকা গোনার শব্দকে উপেক্ষা করে তাই নিজের ভাল লাগার দিকটাই বড় করে দেখা দরকার। কারণ ইচ্ছের বিপরীতে না গিয়ে শ্রোতা-দর্শকদের গান শোনার অভ্যেস বদলের দায়িত্ব শিল্পীদের উপরেই বর্তায়। 

দায়িত্বের প্রসঙ্গ এলেই উঠে আসবে কয়েকটি প্রশ্ন। আগে নিজে বুঝে নিতে হবে, যাঁদের কথা বলা হচ্ছে তাঁরা আদৌ কি গানের শ্রোতা? নাকি সেই শ্রোতারা গান শোনার বদলে অনুষ্ঠানে নাচতে যান? দ্বিতীয়ত, এসব জেনেও শিল্পীকে গান গাইতে যেতে হয়। কারণ, পেট বড় বালাই। রুজিরুটির জন্য নিজের পছন্দের জায়গায় পেরেক ঠোকার মতোই। আর আপোস যেখানে রয়েছে, সেখানে সৃষ্টি নেই। তাই লক্ষ করার বিষয় এই, অনুষ্ঠান নতুন শিল্পীর জন্ম দিতে পারে না। চর্বিত চর্বণ চালিয়ে যায়। আর এক দল আছে যারা সব জেনে বুঝে দায় চাপায় 'পপুলার কালচার'-এর উপরে। তাঁরা কি জানে, এভাবে চললে ঢেউয়ের সময়ে ভেসে উঠলেও পরে ঠিক জলের তলানিতে হারিয়ে যাবেন? তাই শিল্পীর নিরাপত্তা এক্ষেত্রেও প্রশ্নচিহ্নের মুখে। সর্বোপরি যে প্রশ্নটা ওঠে, শ্রোতাদের জোয়ারে গা ভাসালে বাংলা গান কোন পথে যাবে? মাইলস্টোন তৈরি করার পিছনে কাঠখড় পোড়ানো বেশি থাকে, বিনোদন কম। তাই বাংলা ভাষায় নতুন গানের ভবিষ্যতে কি এভাবেই বাষ্প জমতে থাকবে? কিন্তু কিছু মানুষ নিশ্চই সেই বাষ্প জল হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনবেন।  

শুরু থেকেই ওয়েব সাংবাদিকতার প্রথম প্রজন্ম। লেখালিখির জন্য সব সমঝোতায় রাজি কিন্তু গানের জন্য নো কম্প্রোমাইজ।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -