SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

ফেসবুকে বাঙালি বিপুল অধৈর্য! কারণ খুঁজতে গেলেই বিপদ

অক্টোবর ৯, ২০১৮
```` Comments
পরস্পরকে কমেন্ট ছুড়তে ছুড়তে যাওয়া। কারোই যেন সময় নেই, কেবল নিজের তূণ থেকে বাক্য ছুড়েই মিলিয়ে যাওয়া।

যুগটা যে সোশ্যাল মিডিয়ার, সেটা আর নতুন কী কথা! দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা বছর পেরিয়ে গিয়েছে। মোটামুটি এক দশকের কাছাকাছি হয়ে গেল ফেসবুকের রাজত্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। তারও আগে অর্কুট ছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, অর্কুট নেহাতই ছেলেমানুষ। শুধু অর্কুট কেন, ইয়াহু মেসেঞ্জার বা আরও যে সব চ্যাট রুম এক সময়ে দাপিয়ে বেরিয়েছে, তারা কেউই ফেসবুকের মতো দাপিয়ে বেড়াতে পারেনি। আসলে মোবাইলে ইন্টারনেট জলভাত হয়ে যাওয়ার পরে ফেসবুক একেবারে শিকড় চারিয়ে দিয়েছে জন-গণ-মনের ভিতরে। আপনি স্বীকার করুন বা না-ই করুন, চলতে ফিরতে ফেসবুকের একটা এফেক্ট আপনার জীবনে রয়েছেই। কিন্তু এ লেখার বিষয় সেটা নয়। কথা হচ্ছে, এই যে ফেসবুকে আমরা রাতদিন কাটিয়ে দিচ্ছি, সেখানে কেন ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে গিয়ে ফেল করে যাচ্ছি। 

ফেসবুকের দুনিয়া এক আজব জগৎ। আমরা কে কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, কী পরছি, কী ভাবছি— সব, স-অ-ব কিচ্ছু নিজের দেওয়ালে তুলে ধরতে না পারলে শান্তি নেই। ঘটনা হচ্ছে, খাওয়া-পরা নিয়ে অতটা সমস্যা নেই। সেখানে লাইক, কমেন্টের বন্যায় বেশ ভালই কেটে যায় সময়। গোলটা বাধে ওই ভাবনার ক্ষেত্রেই। 

আপনি যা ভাবছেন, তা আমি কেন ভাবব কিংবা আপনি যা ভাবছেন না তা আমি কেন ভেবেছি ইত্যাদি নানাবিধ জটিল প্যাঁচের খেলায় লেগে যায় তরজা। এটা আগেও ছিল। ধোঁয়া ওঠা চা-কফির কাপে টেবিল চাপড়ানো তর্ক-বিতর্ক বা রকে বসে চপ-মুড়ির আড্ডায় এমন বহু তর্ক বাঙালির ইতিহাসে মিশে রয়েছে। টেনিদা-ঘনাদা-পিনডিদা-বরদা হয়ে সেই আড্ডা বাঙালির ঐতিহ্যে ঘন হয়ে মিশে আছে। কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সেই তর্ক-বিবাদ এক অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে।

সত্যজিত রায়ের ‘আগন্তুক’ ছবিতে উৎপল দত্ত অভিনীত মনমোহন নাম্নী চরিত্রটি রবি ঘোষকে, যিনি আড্ডাকে বাঙালির ‘মনোপলি’ বলে ফেলছিলেন, উদ্দেশ করে বাঙালির আড্ডাকে একহাত নিয়েছিল। বিশ্বভ্রামণিক মনমোহন আড্ডার পেটেন্ট বাঙালিকে দিতে রাজি হননি। বরং আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের আড্ডাকে ‘আড্ডা, বাট অ্যাট দ্য হায়েস্ট লেভেল’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই আড্ডার আখড়া ছিল জিমন্যাসিয়াম, যেখানে শরীরের পাশাপাশি মনেরও ব্যায়াম চলত। সক্রেটিস, প্লেটোদের মতো ব্যক্তিত্বের কথাও সে প্রসঙ্গে চলে এসেছিল। 

বাঙালির আড্ডার প্রধান রসদ পরনিন্দা-পরচর্চা, সে কথাও ঠারেঠোরে বলেছিলেন সত্যজিৎ। ফেসবুকের কল্যাণে সেটা দারুণ ভাবে উপলব্ধি করা যায়। আর সেই নিন্দামন্দই জন্ম দিয়ে চলেছে ধৈর্যহীনতার। আসলে ফিজিক্যাল আড্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে যা চলত, সেটা ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এসে অন্য রূপ ধারণ করেছে। কারও হাতেই সময় নেই (এটাও এক ধরনের ভাঁওতা, যা আমরা নিজেরাই নিজেকে দিয়ে চলেছি)। মাইক্রোসফটের একটা সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, সবথেকে কম মনঃসংযোগ এতদিন ছিল গোল্ড ফিশের। ১২ সেকেন্ডের বেশি তারা মনঃসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু মানুষ তাকেও হারিয়ে দিয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে সময়টা গড়ে ৮ সেকেন্ড! আর বাঙালি বোধ হয় সেখানে আরও এগিয়ে। ফলে স্ক্রিনে কিছু দেখা মাত্রই যা মনে হল তৎক্ষণাৎ তা বলে ফেলে, ধাঁই করে অন্য কারও ওয়ালে। সেখানে আবার ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু কমেন্ট সেকশনে আছড়ে পড়ল আপনার কমেন্ট। তার পর আচমকাই ইউটিউবে ঢুকে গান শুনতে শুরু করেছেন আপনি। এই অবস্থায় কেউ যদি আপনার কমেন্টের বিরোধিতা করে ফেলে, ব্যাস হয়ে গেল মুডের দফারফা। 

এভাবেই পরস্পরকে কমেন্ট ছুড়তে ছুড়তে যাওয়া। কারোই যেন সময় নেই, কেবল নিজের তূণ থেকে বাক্য ছুড়েই মিলিয়ে যাওয়া। স্বাভাবিক ভাবেই, বিরোধিতা আরও বড় হলে ধৈর্য হারিয়ে এক সময়ে অবস্থা আরও গম্ভীর চেহারা নেয়। কেবল মত বিনিময়ই নয়, কিছু পছন্দ হল না, কোনও সেলেবের কোনও কথা পছন্দ হল না, দড়াম করে মিম চার্জ করে দিলাম। আহা, কী আনন্দ! 

এভাবেই চলছে। যে কোনও কিছুতেই সহজে ধৈর্য হারিয়ে বাঙালি বিচরণ করে চলেছে ফেসবুকে। সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য ‘পুরন্দর ভাট’ হয়ে বলে গিয়েছেন সেই অমোঘ বাক্য, ‘বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়’। সেই অসহায়তাই ফুটে বেরোয় তার ফেসবুক-বিহারে। 

বিশ্বদীপ দে: পেশায় সাংবাদিক, নেশায় গল্পকার। ভালবাসেন রোমাঞ্চকর খাওয়া-দাওয়া। ভালবাসেন কল্পবিজ্ঞান, ভূতের গল্পও।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -