SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

বড়দিনের রাত মানেই পার্ক স্ট্রিট, কিন্তু কেন যান একটু বলতে পারবেন

ডিসেম্বর ২৫, ২০১৮
```` Comments
হাজারের বেশি ভিড় করা মানুষদের অর্ধেকের কাছে উত্তর নেই কেন এসেছি, কোথায় যেতে হবে। তবু হেঁটে চলেছেন তাঁরা।

ব্রিজের উপরে উঠতেই আচমকা বাইকটা দাঁড় করিয়ে দিলেন এক যুবক। বাইক থেকে নেমে সোজা ব্রিজের কিনারায় গিয়ে নীচের দিকে তাকাতে শুরু করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করা বাইক, গাড়ি এমনকী বাসও দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই ব্রিজের ধারে এসে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করছে নীচে আদতে কী হয়েছে। কিন্তু কারোর কাছে উত্তর নেই। ভিড় এতটা বেড়ে গেল যে, শেষে পুলিশকে ছুটে আসতে হল। এসব দেখে আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না সেই যুবক। রাস্তার সবাইকে বোকা বানানোর জন্যই বন্ধুর সঙ্গে মিলে এই প্ল্যান করেছিলেন তিনি। অবশ্য পরিকল্পনা সার্থক হয়েছিল তাঁর। ভিডিওটি বেশ ভাইরালও হয়েছিল। অনেকটা ঠিক তেমনই চিত্র বহাল থাকে ২৫ তারিখের পার্ক স্ট্রিটে। হাজারের বেশি ভিড় করা মানুষদের অর্ধেকের কাছে উত্তর নেই কেন এসেছি, কোথায় যেতে হবে। তবু হেঁটে চলেছেন তাঁরা।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই। রাস্তার দু'পাশে ব্যারিকেড। জায়গায় জায়গায় পুলিশি টহলদারি, ওয়াচ টাওয়ার, সঙ্গে আরও অনেক কিছু। সতর্ক হয়ে থাকেন আশপাশের বাসিন্দারাও। কারণ ২৫ তারিখ দুপুরের পরেই জনসমুদ্র নেমে আসবে। কে কোথায় যাবে, তা আগে থেকে কিছুই ঠাহর করা যায় না। বিকেল গড়াতেই  বদলে যায় পার্ক স্ট্রিটের চেহারা।

পার্ক স্ট্রিটে পুলিশি প্রহরা। নিজস্ব চিত্র

প্রশ্ন, আচ্ছা আচমকা এই পার্ক স্ট্রিট কেন? কলকাতার আর যে কোনও রাস্তাও তো এভাবে ঘোরা যেত।  না! তা হলে উত্তরটা হবে— আপনি পিছিয়ে পড়েছেন। এটাই ট্রেন্ড। বড়দিনের উৎসব বলে কথা, আর পার্ক স্ট্রিটে যাব না, তা কী করে হয়!  

শুরুটা হয় মোটামুটি ধর্মতলা থেকেই। তার পর সোজা পার্ক স্ট্রিট মেট্রো হয়ে যে কোথায় শেষ হয়, তা জানা নেই। প্রেমিক যুগল, বন্ধুদের গ্রুপ, পরিবার নিয়ে মোটামুটি বিকালের মধ্যেই প্রত্যেকে হাজির হয়ে যান। তার পরেই শুরু হয় ‘হাঁটা প্রতিযোগিতা’। রাতভর এমনটাই চলতে থাকে সেখানে। 

পার্ক স্ট্রিটে ভিড়। নিজস্ব চিত্র

ক্রিসমাস সাধারণত খ্রিস্ট ধর্মালম্বীদের উৎসব হলেও, এখন এটা গোটা বিশ্ব তাকে আঁকড়ে ধরেছে। ব্যতিক্রম হয়নি এদেশেও। বাঙালির দুর্গা পুজোয় যেমন দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মের মেলবন্ধন। তেমনই ক্রিসমাসও জাতি ধর্ম নির্বিশেষে দীর্ঘকাল ধরে পালিত। এই পালনের পিছনে যে ইংরেজ রাজত্বের চোঁয়া ঢেকুর নেই, তা-ও বলা যায় না। আসলে ইভেন্টটা সেলিব্রেটেড হয়। 

উদ্‌যাপন ভাল, কিন্তু উৎসব যখন হুজুকে পরিণত হয়ে যায় তখন তা বিস্ময় উদ্রেক করে বই কী। 

চলছে হইহুল্লোড়। নিজস্ব চিত্র

পুজোর সময়ে ম্যাডক্স স্কোয়ারও এমন। ভিড় লেগেই থাকে। অনেকেই বলতে পারেন, পুজোয় ক্লান্ত হয়ে ম্যাডক্সের মাঠে আড্ডা দিলে তাতে ক্ষতি কী! কিন্তু তাঁদের পালটা প্রশ্ন করব, পাশে যদি আরও বড় মাঠ নিয়ে একটু ছোট বাজেটের পুজো হয়, সেখানে কী তরুণ-তরুণীদের এই ভিড় দেখা যাবে?

বড়দিনের উৎসব পালন তো, বিভিন্ন চার্চে গিয়েও করা যায়। কলকাতার আশেপাশে প্রচুর চার্চ রয়েছে। দু’পা হাঁটলেই রয়েছে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল চার্চ। অনেকেরই দাবি, এটিই কলকাতার সব থেকে বড় ক্যাথিড্রাল চার্চ। পার্ক সার্কাসে রয়েছে ক্রাইস্ট দ্য কিং চার্চ। এই চার্চের মধ্যে কারুকার্য সত্যি অসমান্য। বিবাদী বাগে রয়েছে সেন্ট জন চার্চ। এটিও একটি ক্যাথিড্রাল। খোদ পার্ক স্ট্রিটেই রয়েছে সেন্ট টমাস চার্চ। উঁচু মিনারের জন্য এটি প্রসিদ্ধ। বড়বাজারে অবস্থিত আর্মেনিয়ান চার্চ খুবই বিখ্যাত প্রার্থনাস্থল। এছাড়াও পার্ক সার্কাসে রয়েছে বেথ এল চার্চ। এই চার্চগুলিতে কিন্তু সন্ধের পরে এমন ভিড় দেখা যায় না।

দেখে এই চার্চগুলির অবস্থান (গ্রাফিক্স—অভিজিৎ বিশ্বাস)

 

সুন্দর পরিবেশও আছে। কই? সেখানে তো হাজার হাজার এই ভিড় দেখা যায় না! 
পুজোর সময়ে হোক কিংবা চার্চে প্রার্থনার সময়ে লাইন থাকলেও একটা নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে। কিন্তু পার্ক স্ট্রিটের ভ্রাম্যমাণরা কোথায় যাবেন, সেটাই জানেন না। বেশিরভাগই গোটা রাস্তার এদিক ওদিক ঘুরে দেদার সেলফি তুলে চলে যান। রাতে ফেসবুকে আপডেট দিতে হবে যে!

চলছে ফোটো তোলা। নিজস্ব চিত্র

এ সবের মধ্যে ফায়দা তোলেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। ২৫ এর জিনিস ২০০ করে তোলার এটাই তাঁদের কাছে সেরার সেরা সময়! অথচ এই সময়ে কৃষ্ণনগরের চার্চের পাশে সুন্দর পুতুল বিক্রি হয়। কিন্তু তা কেনার জন্য এত ভিড় থাকে না। আসলে সমস্যাটা হচ্ছে, একজন যা করছে আমাকেও তা-ই করতে হবে— এই ভাবনা থেকেই। বাঙালির হুজুকেপনায় 'বড়দিন মানেই পার্ক স্ট্রিট' এটা আপাতত চলতে থাকবে বলেই মনে হয়। এ এক গড্ডলিকা প্রবাহ। তবে তা কত দিন? উত্তর একটাই— যত দিন না নতুন কোনও হুজুক তৈরি হয়।

পেশায় সাংবাদিক, ভালবাসেন গল্প লিখতে। অবসর কাটে বই পড়ে, সিনেমা দেখে

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -