SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক কথা

‘মিটু’ করলেই মহিলার চরিত্রের বাপান্ত করছেন যাঁরা, তাঁরা কতটা ঠিক

অক্টোবর ২৮, ২০১৮
```` Comments
আদ্যোপান্ত না জেনেই ‘মিটু’ নিয়ে চলছে চরম কাটাছেড়া। উলটে চাপ বাড়ছে অভিযোগকারীদের।

খবরের কাগজ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ‘হ্যাশট্যাগ মিটু’ ট্রেন্ডিং। যৌনতা নিয়ে গম্ভীর আলোচনা হোক কিংবা মশকরা, সবাই ফিরিস্তি দিচ্ছে মিটু-র। কিন্তু এই নতুন শব্দের আদ্যোপান্ত সম্পর্কে ঠিক ক’জনের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে, তা গুনে ফেলা প্রায় বাঁয়ে হাত কা খেল।  

২০০৮-য় শ্যুটিং চলাকালীন নানা পটেকর যৌন হেনস্থা করেছিলেন, তনুশ্রী দত্ত এই খবর আরও এক বার সামনে আনতেই মিটু নিয়ে সরগরম হয় বলিউড। তনুশ্রী যে ১০ বছর আগেও এই অভিযোগ তুলেছিলেন, অ্যাদ্দিনে তা মানুষের মগজ থেকে মিলিয়ে গিয়েছে। ঠিক তেমনই চাপা পড়ে গিয়েছে মিটুর ঠিকুজি-কোষ্ঠী। 

২০০৬-য় মার্কিন সমাজকর্মী তারানা বুরকে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন শুরু করেন— ‘মিটু মুভমেন্ট’। ২০১৭-য় মার্কিন অভিনেত্রীর অ্যালিসা মেলানোর হাত ধরে শুরু হয় ‘হ্যাশট্যাগ মিটু’। এর মূল কেন্দ্রে অবশ্যই কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা। সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল জুড়ে যৌন হেনস্থার অভিজ্ঞতা লেখা শুরু হয়। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

২০১৮-য় এসে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে ‘মিটু’। সঙ্গে গজিয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বিপরীত শিবির। এই শিবিরগুলির বেশ কিছু বক্তব্য রয়েছে। যার মধ্যে কয়েকটি মন্তব্যের যুক্তির ভিত বেশ শক্ত বই কি। টুইটার থেকে ফেসবুক সফর করতে গিয়ে এই ধরনের যুক্তিতে হোঁচট খেয়ে উপসংহারে না পৌঁছনো গেলেও পালটা যুক্তির অন্বেষণ লেগেই থাকবে। 

এক এক করে নারীবিরোধী, থুড়ি ‘মিটু’ বিরোধী শিবিরগুলির বক্তব্য নিয়ে একটু কাটাছেঁড়া করা যাক— 

বক্তব্য এক— ‘‘কেন এতদিন পরে ‘মিটু’-তে ভর করে অভিজ্ঞতার খাতা খুলছেন অভিযোগকারী বা অভিযোগকারিণীরা?’’ যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। আবার এই বক্তব্যেই রয়েছে পরস্পরবিরোধী শব্দ— ‘মিটু-তে ভর করে’। কারণ এই সমাজে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করার আগে অভিযোগকারীকে আগে প্রশ্নের নলের সামনে রাখা হয়। অভিযোগ যদি যৌন হেনস্থার হয়ে থাকে, আগেই ভেবে নেওয়া হয়, কোথাও রয়েছে ‘দেওয়া-নেওয়ার’ সম্পর্ক। নেটিজেনদের ভাষায় যাকে বলে ‘স্লাটশেমিং’। তাই যে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড জোট বেঁধে ভার্চুয়াল অ্যাবিউজ করার অন্যতম জায়গা হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে লড়তে গেলে জমিটাও শক্ত করা প্রয়োজন।

বক্তব্য দুই— ‘‘যাঁরা অভিযোগ আনছেন, তাঁরা বিভিন্ন দিক থেকেই পিছিয়ে পড়া। না-পাওয়া থেকেই ক্ষোভ বেরিয়ে আসছে।’’ এই যুক্তিকে মান্যতা দিতে গিয়েই থমকে যেতে হয়। ‘না পাওয়া’-টা কী হতে পারে? উর্ধতন কর্মীর প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় প্রোমোশনে দাঁড়ি? নাকি কর্পোরেট কারসাজি করে একেবারেই রেজিগনেশনের মেল নোটিফিকেশন অভিযোগকারিণীর ফোনে? 

বক্তব্য তিন— ‘‘এই যাঁরা ‘মিটু’ নিয়ে আজ গলা ফাটাচ্ছেন, তাঁরাই এক সময়ে পুরুষকে মইয়ের মতো ব্যবহার করেছেন’’ — এই বক্তব্যের যুক্তি অকাট্য। সত্যিই তো বিনিময়ের উপরে ভর করেই রাজনীতি থেকে অর্থনীতি— সবটাই চলছে! তা হলে শরীর দেওয়ায় কী অসুবিধা? অসুবিধা তখনই, যেখানে ‘সম্মতি’-র অভাব রয়েছে। তাই সেটাকে ‘যৌন হেনস্থা’ বলা হচ্ছে। 

তবে এখানে আর একটা প্রশ্ন এসেই যায়। কোনও নির্দিষ্ট নরনারীর মধ্যে নিঃস্বার্থ ভাবে সম্মতি নিয়ে স্রেফ শরীরী বিনিময় এই প্রসঙ্গের বাইরে। কিন্তু কোনও কিছুর বিনিময়ে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্যের সম্মতি আদায় করা কি যৌন হেনস্থার বাইরে পড়ে? ধরে নেওয়া যাক, কর্মক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ শরীর দিলেন, থুড়ি বাধ্য হয়েই দিলেন। কিন্তু সেই মহিলার কাছে যদি সুযোগ থাকত শরীর না দিয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার, তা হলে কি তিনি সেটাই বেছে নিতেন না? এখানে সম্মতির পাশে তাই আর একটি শব্দ চলেই আসে— কম্প্রোমাইজ। 

বক্তব্য চার— ‘‘কে বলে মহিলাদেরই যৌন হেনস্থা হয় শুধু? পুরুষও এমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছে’’। এই বক্তব্যে সহমত প্রকাশ করতেই হয়। ট্রেন-বাস থেকে কর্পোরেট দুনিয়ায় পুরুষও যৌন হেনস্থার মুখে পড়েছে, আপোসও করতে হয়েছে। কিন্তু যৌন হেনস্থা নিয়ে নারীর মতো পুরুষও কোথাও গিয়ে ভয় পায়। সমাজ নারীকে সম্মানহানির ভয় দেখায় আর পুরুষ তার পৌরুষ বা সুনাম হারানোর ভয় পায়। 

কিন্তু এরও ব্যতিক্রম রয়েছে। মার্কিন অভিনেতা-ফুটবলার টেরি অ্যালাম ক্রুজ, মার্কিন স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান ব্যারি ফ্র্যান্সিস, বলিউড অভিনেতা বীর দাস, কানাডিয়ান অভিনেতা ব্রেনডান ফ্রেসার শেয়ার করেছেন তাঁদের ‘মিটু’ অভিজ্ঞতা। তাই ‘মিটু’ মানেই মহিলার যৌন হেনস্থা একেবারেই নয়। পুরুষ, সমকামী ও রূপান্তরকামীরাও এর ভাগীদার। যদিও পুরুষের জন্য রয়েছে ‘হ্যাশট্যাগ হিমটু’। 

বক্তব্য পাঁচ— ‘‘প্রত্যেক পুরুষই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।’’ এই বক্তব্য অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। ‘মিটু’ যদি ক্ষমতা হয়, তার অপব্যবহারও রয়েছে। ঠিক যে ক্ষমতার ভয় পেতে বাধ্য করা হয় মহিলাকে। পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র— সব জায়গাতেই সাবধানী হতে হয়। পা ফসকে গেলেই হেনস্থা আর পাত্তা না দিলে ‘স্লাটশেমিং’। কিন্তু তা বলে এবার যে পুরুষের ভয় পাওয়ার পালা এসেছে তা কখনওই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং অযথা ‘ভয়’ থেকে নিস্তার মেলা দরকার। ‘আমি পুরুষের মতো সাহসী’ বলারও প্রয়োজন নেই। এই প্রসঙ্গে তাই মার্কিন নারীবাদী গ্লোরিয়া স্টাইনেমের একটি উক্তি ব্যবহার করাই যায়, ‘‘মহিলারা সব সময়ে বলেন— পুরুষ যা পারে, আমরা তা সব করতে পারি। বদলে পুরুষদের বলা উচিত— মহিলারা যা পারে, তা আমরা সব পারি।’’

স্বরলিপি দাশগুপ্ত: শুরু থেকেই ওয়েব সাংবাদিকতার প্রথম প্রজন্ম। লেখালিখির জন্য সব সমঝোতায় রাজি কিন্তু গানের জন্য নো কম্প্রোমাইজ।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -