SEND FEEDBACK

Cancel
English
Bengali
Cancel
English
Bengali
হক-কথা

চাকরি খোয়ালেন জোম্যাটো ‘বয়’, বড় চোরদের না ধরে লঘু পাপে গুরু শাস্তি কেন

ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮
```` Comments
বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এই ঘটনা লঘু পাপে গুরু দণ্ড নয় কি? এঁটো খাবারই যদি প্রসঙ্গ হয়ে থাকে, তা হলে উঠে আসবে ভাগাড় মাংস কাণ্ড।

পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে— চলছে জোর চাপানউতর। আপামর ভারতবাসীর চোখ তখন ভোটের দাঁড়িপাল্লায়। পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে ধনী বিয়ের প্রস্তুতির এক ঝলক দেখে নেওয়ার হিড়িক। এমন চোখধাঁধানো আড়ম্বরের মধ্যে হঠাৎই ভাইরাল হল একটি ভিডিও। ‘জোম্যাটো’-র এক ডেলিভারি বয় খাবার পৌঁছে দেওয়ার আগে ব্যাগ থেকে একের পর এক খাবারের বাক্স খুলছেন ও কিছুটা খেয়ে রেখে দিচ্ছেন! 

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ফিরিস্তি দিতে দিতে ভিডিও দেখে নেটিজেনদের চোখ চড়কগাছ। সেখানেই শেষ নয়। সবাই তখন মনে মনে ‘বাঁধ ভেঙে দাও’ বলেই তাবড় বিপ্লবী। মুহূর্তে ভাইরাল সেই ভিডিও। নেটিজেনরা ‘আমিত্ব’ দূরে সরিয়ে রেখে তখন বিপ্লব করতে তৎপর। কারণ এখানেও কোথাও গিয়ে লুকিয়ে রয়েছে ‘আমি’-র স্বার্থ। পাছে উচ্ছিষ্ট পেটে যায়। 

দ্রুতগতিতে ‘বিপ্লব’ সাফল্য দেখল। ভিডিও ভাইরাল হতেই ‘জোম্যাটো’ ওই ব্যক্তিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। শুরু হয় বিরাট জয়ের আনন্দ উদযাপন। কিন্তু এ কি সত্যিকারের জয়? হলেও বা, কার জয়? এই রকমই আরও মুঠো মুঠো প্রশ্ন উঠে আসছে এই নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে। 

না, একেবারেই ক্রেতার জন্য বরাদ্দ খাবারকে উচ্ছিষ্টে পরিণত করার পক্ষ নিচ্ছি না। যে কোনও বিশ্বাসভঙ্গই নিন্দনীয়। ‘পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু টাকাকে যাবে না ছোঁয়া’-র মতোই বিশ্বাস প্রত্যাশিত ছিল তাঁর কাছ থেকে। কিন্তু সেই বিশ্বাসে চিড় ধরায় তাঁকে একেবারে উৎখাত করে দিতে দু’বার ভাবা হয়নি। 

ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই সময়ে পৌঁছে দিতে হয় খাবার। ছবি— ফেসবুক

বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এই ঘটনা লঘু পাপে গুরু দণ্ড নয় কি? এঁটো খাবারই যদি প্রসঙ্গ হয়ে থাকে, তা হলে উঠে আসবে ভাগাড় মাংস কাণ্ড। বছরের পর বছর মানুষ চোখে কাপড় বেঁধে ‘আহা কী সুস্বাদু’ বলে অজানা পচা মাংসের স্বাদ নিয়েছে, গলাধঃকরণ করেছে। তা নিয়েও নেটিজেনদের মধ্যে কম হইচই ছিল না। বিশ্বাস এখানেও ভঙ্গ হয়েছিল। কিন্তু সময়ের তালে যেন সেই ভাগাড় কাণ্ড মানুষের মন থেকে বুদবুদ হয়ে উড়ে গিয়েছে। এমনকী, পরবর্তী কালে যে আবারও ভাগাড় মাংসের খপ্পরে পড়তে হবে না, এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি কেউই। 

দু’বছর আগে এক মহিলা তাঁর চালককে নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের একটি নামকরা রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চালকের পোশাক নাকি যথেষ্ট রুচিশীল ছিল না রেস্তোরাঁর পরিবেশের সাপেক্ষে। এই দাবিতেই ঢুকতেই দেননি রেস্তোরাঁর রক্ষী। এই ঘটনার বীজটিও প্রথম সোশ্যাল মিডিয়ায় পোঁতা হয়। বহু ‘ফেসবুক-বিপ্লবী’ সরব হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রেস্তোরাঁর ওই কর্মীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তলিয়ে গিয়েছে কবেই! 

যে কোনও রকমের পরিষেবায় বিশ্বাস যে একটি বড় বিষয়, তা অনস্বীকার্য। জোম্যাটো-র ডেলিভারি বয়-এর ঘটনা থেকে যদি জুম-আউট করে দেখা যায়, পরিষেবায় প্রতারণার চিত্রটা আরও বড় হবে। এই দেশ থেকেই ৯ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে বহাল তবিয়তে লন্ডনে কাটাচ্ছিলেন কিংফিশার কর্তা বিজয় মাল্য। যদিও সম্প্রতি বিজয় মাল্যকে দেশে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। কিন্তু গোটা একটা বছর কোথায় ছিল এমন চুরি, এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ব্যক্তি মানুষকে প্রত্যক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারলেও, দেশের জন্য যে এঁটো খাবারের থেকেও এই অন্যায় কতটা বিপজ্জনক, তা অকল্পনীয় নয়। এমন অন্যায়ের তালিকায় রয়েছেন নীরব মোদী ও সুব্রত রায়রাও। ঘটে গিয়েছে সারদা-নারদা-রোজভ্যালি। বিপ্লব চালিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি স্রোতে গা ভাসানো ‘গণ’। 

এই ভিডিওটি কেন এতটা তৎপরতায় ভাইরাল? নাকি বিভিন্ন না-পাওয়াগুলো থেকে তৈরি হওয়া ক্ষোভ কারও উপরে উগরে দেওয়া গেলে বেশ তৃপ্তি মেলে? দেশে বা রাজ্যে টাকার নয়-ছয় হতে দেখলে যারা কেবলই হাত কামড়ায়, তারাই পাড়ার মোড়ে চোর ধরা পড়লে গণধোলাইয়ে সামিল হয়ে হাতের সুখে মজে। অফিসে বসের চোখরাঙানি আর সহকর্মীদের সঙ্গে মতান্তরের পরে যাঁরা পরিবারের উপরে এসে রাগ উগরে দেন, তাঁরাও এই দলেই পড়েন। 

যে নেটিজেনরা এত তৎপর হয়েছিলেন ভাইরাল হওয়া ডেলিভারি বয়-এর শাস্তির দাবিতে, তাঁরা কি অফিসে বা নিজের কাজের ক্ষেত্রটিতে যুধিষ্ঠিরের নীতি মেনে চলেন? নাকি ধরা পড়েন না বলে অনৈতিকতার বহর কমে যায়? 

কিন্তু নীতির বিরুদ্ধে ঠিক কখন যেতে হয় মানুষকে। জোম্যাটো যে ধরনের খাবার পৌঁছে দেয়, তা কিনে খাওয়ার আশা করেন না এই ডেলিভারি বয়রা। বাড়ি থেকে আনা লাঞ্চবক্সেই চলে দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর। থোড়-বড়ি হোক বা রুটি-ডাল, জিভে এই একই স্বাদের পরত পড়ে গেলেও চাইনিজ-কন্টিনেন্টালের দিকে হাত বাড়াতে গেলে চোখ রাখতে হয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সে। সায় না দিলে তখন ফ্যান্টাসিই বন্ধু। তাই পিঠে সুস্বাদু খাবারের বোঝা নিয়েও সংযমের পরীক্ষায় সফল হতে হবে।  

ওই ব্যক্তির মেধা, শিক্ষা, সাধ্যই নির্ধারণ করে দিয়েছে তাঁর পেশা, এ কথা ঠিক। তাই লোভে পড়ে ‘চিচিং ফাঁক’ বলতে ভুলে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত তিনি হবেনই। কিন্তু অনৈতিকতার নিরিখে মাপতে গেলে ‘জোম্যাটো’ কাণ্ড কিন্তু মামুলি বিষয়। 

নির্ধারিত সময়ে জিনিস না পৌঁছে দিতে পারলেই সংশয়ে চাকরি। ফাইল চিত্র 

সর্বোপরি, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে মানুষ কি এতই আত্মমগ্ন ও অসংবেদনশীল যে, এই ভিডিও ভাইরাল করতে দু’বার ভাবেনি? জোম্যাটো বা সুইগি থেকে খাবার অর্ডারের পরে, নির্ধারিত সময়ে খাবার না পেলে যাঁরা ডেলিভারি বয়ের বিরুদ্ধে নালিশ জানান তাঁরা কি রাস্তাঘাট, ট্র্যাফিক জ্যাম এগুলো সম্পর্কে অবহিত নন? তাঁরা কি বোঝেন, বরাদ্দ সময়ে খাবার দেওয়ার জন্য সেই ব্যক্তি ঝড়ের গতিতে দু’চাকায় সওয়ার? ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গেলেই যাঁর বেতন থেকে টাকা খসবে বা চাকা পিছলে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটবে? সবটাই জীবনযাপনের জন্য। অভাবের ছায়ায় না পড়ার জন্য। চোখধাঁধানো আলেয়ায় মত্ত হয়ে থাকলে এমন কঠিন বাস্তব, অভাব যেন আলোকবর্ষ দূরে সরে যায়।

ফরাসি বিপ্লবের সময়ে রানি ম্যারি আঁতানোয়েতের প্রসঙ্গ এখানে টানতেই হয়। এই রানির কেশসজ্জার জন্য বরাদ্দ থাকতেন একাধিক দাসী। একই সময়ে ফ্রান্সে দারিদ্র চরমে পৌঁছেছিল। মানুষ এক টুকরো রুটির জন্য হাহাকার করছে।  সেই সময়ে রানি নাকি বলেছিলেন, ‘‘ওরা রুটি পাচ্ছে না, তো কেক খাক।’’ তিনি নিজেকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, দেশের অভাব সম্পর্কে অবগত হতে পারেননি। 

জোম্যাটো কাণ্ডেও কি এমনই এক ‘দেজা ভ্যু’-এর সাক্ষী থাকল না মানুষ? সাত-পাঁচ না ভেবে কিছু হাতের কাছে পেয়ে ফেসবুকে পোস্টিয়ে কলার উঁচু না করলে হয়তো চাকরি যেত না মাদুরাইয়ের এই ডেলিভারি বয়ের। 

শুরু থেকেই ওয়েব সাংবাদিকতার প্রথম প্রজন্ম। লেখালিখির জন্য সব সমঝোতায় রাজি কিন্তু গানের জন্য নো কম্প্রোমাইজ।

আমাদের অন্যান্য প্রকাশনাগুলি -