অজিত ওয়াদেকর চলে গেলেন। গতকাল ১৫ অগস্ট একটু রাতের দিকে জানা গেল খবরটা। ৭৭ বছরের জীবন থমকে গেল ক্যানসারের মরণ-আঘাতে জর্জরিত হয়ে। একদা আক্রমণাত্মক বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান, পরে ভারতীয় দলের ম্যানেজার— ভারতীয় ক্রিকেটে ওয়াদেকরের  নাম সোনালি অক্ষরেই লেখা থাকবে। কিন্তু সে তো ইতিহাসের পাতায়। আজকের প্রজন্ম কি মনে রেখেছে অজিতকে? 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

হয়তো অনেকেরই মনে আছে, আজহারের দলের ম্যানেজার ওরফে কোচ প্রবীণ অজিতকে। কিন্তু অধিনায়ক অজিত? পতৌদির গরিমা ও সানির সাফল্যের ভিতরেও আলাদা করে স্টাইল আইকন হয়ে উঠেছিলেন যে ঝকঝকে তরুণ, এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর কথা মনে রেখেছেন ক’জন? না জানার জন্য তাদের দায়ী করেও লাভ নেই। অবসরের গুহায় ঢুকে পড়া খেলোয়াড়ের কথা তুলে ধরার আগ্রহই বা কোথায়? 

ইংল্যান্ডকে হারানোর পর দর্শকদের উচ্ছ্বাস, ড্রেসিংরুমের ব্যালকনিতে অজিত। ছবি: গেটি ইমেজেস।
 

আজকের টি টোয়েন্টি যুগে আমজনতার সময় কই পাঁচ দশক ফিরে যাওয়ার? কোনও ভাবে টাইম মেশিনে উঠে পড়ে একবার যদি ঘুরে আসা যেত সেই যুগ থেকে, তাহলে স্পষ্ট হয়ে উঠত ভারতীয় ক্রিকেটের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়, যার পুরোভাগে দলের অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকর। 

বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু ছেলের মন ক্রিকেটে বুঁদ। আর হলও তাই। বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি। তার পর সতেরো বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আবির্ভাব। আদ্যন্ত স্টাইলিশ অজিত কলার তুলে ফিল্ডিং করতেন। ব্যাটিংয়েও ছিল তার ছাপ। মুম্বই ঘরানার যোগ্য প্রতিনিধি ‘খাঁড়ুশ’ অজিতকে চিনতে ভুল হয়নি নির্বাচকদের। 

১৯৭৪ সালের ইংল্যান্ড সিরিজের সেই দল। মধ্যমণি সুনীল গাওস্কর ও অজিত ওয়াদেকর। ছবি: গেটি ইমেজেস।

১৯৭১ সালের ক্যারিবিয়ান সফরে ভারতীয় দলের নবাব মনসুর আলি খান পতৌদিকে সরিয়ে নতুন অধিনায়ক হন অজিত। সেই সিরিজে সোবার্সের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দেয় ভারত। সেই প্রথম ‘ক্যারিবিয়ান দৈত্য’ বধ ভারতের। তা-ও তাদেরই মাটিতে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সে দিনের অপ্রতিরোধ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোটা যে কী ছিল, সেটা আজকের প্রজন্মকে বুঝিয়ে ফেলা কঠিন। 

সেই সিরিজেই আবির্ভাব সুনীল গাওস্করের। অবিশ্বাস্য ৭৭৪ রানের সংগ্রহ চমকে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে। ভারতীয় ক্রিকেটে এক নতুন দিন এল। তখনও টিভির জমানা আসেনি। রেডিওই সব। সাগরপাড় থেকে ভেসে আসা ধারাবিবরণীতে কান পেতে গোটা দেশ। শোনা যায়, ধারাভাষ্যকার কেঁদেই ফেলেছিলেন ভারতের জয়ের মুহূর্ত বর্ণনা করতে গিয়ে।

এর পর ইংল্যান্ড। দু’-দু’বার ব্রিটিশ বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল অজিতের সেই টিম ইন্ডিয়া। রাতারাতি গোটা ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড়। পতৌদি, হাজারে, পঙ্কজ রায়, উমরিগড়দের ব্যক্তিগত ক্রীড়া নৈপুণ্য যতই সমীহ আদায় করে নিক, বলতে গেলে দলগত সাফল্যে ভারতের প্রকৃত জয়যাত্রা সেই শুরু। সুনীল, চন্দ্রশেখরের পাশাপাশি গোটা দেশের হার্টথ্রব স্টাইলিশ তরুণ অজিত।

কিন্তু ১৯৭৪ সালের ইংল্যান্ড সফরে সব বদলে গেল। সেই সিরিজকে বলা হয় ‘সামার অফ ফর্টি টু’। কেননা সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে করেছিল মাত্র ৪২! একনাথ সোলকার (১৮) ছাড়া আর কেউ দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছতে পারেননি। ০-৩ ব্যবধানে সিরিজ হার। সেই সঙ্গে জুটল আরও অপমান। দলের অন্যতম ক্রিকেটার সুধীর নায়েক ধরা পড়লেন মোজা চুরির দায়ে! রাতারাতি যেন কলঙ্কের কালো মেঘ এসে ঢেকে দিল সাফল্যের সোনালি সূর্যকে। সেই সিরিজেই প্রথম ঐতিহাসিক ওয়ানডে খেলা ভারতের। ম্যাচে মারকুটে ৬৭ রানের ইনিংসও খেলেছিলেন অজিত। 

গোটা দেশ তখন ভারতীয় দলের হার নিয়ে উত্তেজিত। সেই সময়ই আচমকা সকলকে চমকে দিয়ে অবসর ঘোষণা করে দিলেন অজিত। জানিয়ে দিলেন, তিনি আর খেলবেন না। এতটাই অভিমান হল, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তার পরে খেলেছিলেন মাত্র একটিই ম্যাচ। 

সেই অজিত। জয়ের আনন্দ, হারের বিষাদ ছুঁয়ে রক্তমাংসের এক ‘জ্যান্ত’ ক্রিকেটারের নাম অজিত ওয়াদেকর। রাতারাতি দেশের জনতার কাঁধে চড়ে বসা। তার পর নিজেকে সরিয়ে দেওয়া অন্তরালে। আলোক বৃত্ত থেকে দূরে। 

পরে অবশ্য ম্যানেজার বা জাতীয় নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের যে চিরন্তন রূপকথা, তাতে অভিমানী অজিতের অবসর নেওয়ার কাহিনি এক মায়াময় অধ্যায়। ভারতীয় ক্রিকেটে প্রবীণ অজিতের প্রত্যাবর্তনে সে মায়ার দ্যুতি ম্লান হয় না। প্রমাণ করে জীবন আর ক্রিকেট আসলে একই আয়নার ভিন্ন প্রতিফলন মাত্র। সাফল্য, ব্যর্থতা, অভিমান সেখানে হাত ধরাধরি করে চলে।