"সমকামী প্রেমিকের লাঠির আঘাতে যুবক হাসপাতালে’’— খবরের কাগজের হেডলাইন দেখে চোখ আটকে গেল তীর্থর। খু্ঁটিয়ে খবরটা পড়তে শুরু করতেই ফোনটা বেজে উঠল। ওদিক থেকে মিহিরদার গলা, ‘আজকের কাগজটা দেখলি? তোকে আর সুধাকে এখুনি আরামবাগ যেতে হবে। খবরটা সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য জোগাড়  করে একটা সমপ্রেমী/ সমকামী  মানুষের সামাজিক পরিস্থিতির ওপর ডকুমেন্টেশন করে দিল্লিতে আকাশের কাছে পাঠাতে হবে। যদি ধারা ৩৭৭ পরিবর্তনের কোনও কাজে লাগে।


পুরুষ হয়ে পুরুষকে ভালবাসা অপরাধ, কিন্তু সেই পুরুষ প্রেমিকের প্রবাসে থাকা মা-এর পাঠানো টাকায় নিজের সংসার চালানো, সে তো অধিকার। আজ যখন বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস, আইনের চোখে, সমাজের চোখে নিন্দনীয়, কিন্তু পুরুষ হয়ে পুরুষের প্রেম  সামাজিক বা আইনি সমর্থন পায় না,  তখন সেটাই ছেলেমানুষি, নয়ত ন্যকামো বা অস্বাভাবিকতার তকমা দিতে কারও কোথাও আটকাবে না এটাই স্বাভাবিক। 

ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে গেল তীর্থ। চোখের সামনে ভেসে উঠল সুদীপের নিস্পাপ মুখটা। সেদিন ও আর সুধা আরামবাগের এক প্রত্যন্ত গ্রামে সুদীপের মামার বাড়ির উঠোনে বসে। জানতে পেরেছিল ছেলেবেলা(না মেয়েবেলা) থেকেই সুদীপ মামা মামীর কাছে থেকেই বড় হচ্ছিল, একটু আদুরে একটু নরম স্বভাবের সুদীপ কে কেন যে সবাই মেয়েলি বলে তা বুঝতে পারেন না ওর মাতৃসমা মামীমা। তাঁর কথায় না হয় একটু সাজতে ভালবাসে ছেলেটা, না হয় ঘরেদোর দিয়ে মায়ের শাড়িটুকু গায়ে জড়ায়, তা বলে পাড়ার লোকের এমন মাথাব্যথা! কারও গরু হারালে খুঁজে এনে দেওয়া, নয়ত গ্রামের লোকের বাড়ির পুজো অনু্ষ্ঠানে কুটনো কোটা, রান্না সবই করে ছেলেটা। তা বলে মিছিমিছি ছেলেটাকে খুনের দায়ে পুলিশে যেতে হবে? ছেলেমানুষ, বন্ধুদের মধ্যে অমন ঝগড়া-মারামারি হয়েই থাকে। তা বলে সুদীপ সজলকে খুন করতে চায়, এই কথা তিনি মানতে পারবেন না। 

দুই বন্ধুতে কত ভাব তাও জানাতে ভোলেন না তিনি, জানাতে ভোলেন না সুদীপের প্রবাসে থাকা মায়ের উপার্জনের টাকায় সুদীপের নতুন বাড়ির কথা, সেখানে ইলেকট্রিকের কাজ করেছে সজল, আবার মায়ের পাঠানো টাকা থেকে লুকিয়ে ভালবেসে বন্ধু সজলের বাড়ির গরু কিনে দিয়েছে তাঁর সুদীপ।

সেদিন দৈনিক খবরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওঁরা বসিরহাট হাসপাতালে পৌঁছল। নিজেদের মানুষের অধিকার ও লিঙ্গচেতনার কাজের পরিচয় দিয়ে হাসপাতালে সুপার-এর অনুমতি নিয়ে সজলকে দেখতে গেল, মাথায় চোট পাওয়া সজল কিন্তু একবারের জন্যও কোনও অভিযোগ করেনি সুদীপের নামে। বরং তারা একসঙ্গে মাছ ধরে, একসঙ্গে মেলায় যায়- সেসব গল্প শোনাতে চাইছিল। সজলের মুখেই জানা গেল তার বাড়িতে বিয়ে ঠিক করা হচ্ছে। তাই সুদীপ তার ওপর খুব রেগে গিয়োছে। বলতে বলতে সজলের কাকা এসে যাওয়ায় সে চুপ করে যায়। আর কোনও কথাই তার থেকে জানতে পারেনা তীর্থরা। হাসপাতালের বাইরে এসে সজলের কাকা কাকিমার মুখথেকে জানা যায়- ‘‘হিজরে ছেলেটা আমাদের সাদাসিধে ছেলেটাকে খুন করে ফেলবে যে কোনওদিন, ওর জেল হওয়াই ভাল।’’ তাঁরা এও জানাতে ভোলেন না তাঁরাই পুলিশে খুন করার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন বলেই সুদীপকে পুলিশ নিয়ে গেছে। খুনে ছেলে-হিজড়াটার শাস্তির ব্যবস্থা করবেনই তাঁরা। এমন কঠিন শাস্তি যাতে বেল না পায় সে চেষ্টাও তাঁরা করবেন। 

এরপর তীর্থ আর সুধা ঠিক করে ঘটনার সম্পর্কে আরও জানতে একবার সুদীপের সঙ্গে কথা বলবে।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর



বিচারাধীন বন্দী হিসাবে সুদীপের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সহৃদয় জেলরসাহেবও জানালেন, ছেলেটি বয়স অনেক কম, সে বাকিদের মত নয়, এখানে এসে পর্যন্ত খালি কাঁদছে, আর একটা কথাই বলছে আমার বন্ধু কেমন আছে, আমি একবার তাকে দেখতে চাই। ওকে দেখতে না পেলে আমি মারা যাব। 
তীর্থ আর সুধার সম্মুখীন হল এক ভীত সন্ত্রস্ত নিস্পাপ এক কিশোর, যে অনুতপ্ত ভালবাসার মানুষের গায়ে হাত উঠেছে বলে। তার একটাই কথা ও বাঁচবে তো? দিদি, ওর কিছু হলে আমিও বাঁচতে  চাইনা। আর নতুন কিছু খবর পেল না ওঁরা, তাদের কাছে সুদীপও আর যা জানাল তার অনেকটাই সুদীপের মামীমা আগেই জানিয়েছিলেন। 

জেলরও কথা দিলেন, বাচ্চা ছেলে, তিনি সাধ্য মতো চেষ্টা করবেন, যাতে শাস্তির মাত্রা কম হয়। 

এরপর সময়ের নিয়মে আর কোনও যোগাযোগ করে উঠতে পারেনি তাঁরা।


প্রায় দিন পনেরো কুড়ি বাদে একদিন ভোরবেলা, সুধার কাছে দৈনিক খবরের সাংবাদিক বন্ধুর ফোন এল, সুদীপ বেল পেয়ে আবারও সজলের ওপর চড়াও হয়েছে। তাকে সজলের বাড়ির লোকজন সজলের বাড়িতে আটকে রেখেছে। তাঁরা গ্রামের লোকজন নিয়ে সুদীপের বাড়িঘর ভাঙচুর করে সেখানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। 

সকালবেলা সুধারা পৌঁছে দেখে বাড়িটা বিধ্বস্ত ,চারপাশ পুড়ে ছাই। বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়ে দেখে আগুন নেভান হলেও ভেতরটা তখনও গরম, মেঝেতে কালি হয়ে আছে, বাড়ির ছাদে পরে রয়েছে মাথায় সিঁদুর ভর্তি হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত সুদীপের মৃতদেহ গায়ে একটা ওড়না। অদ্ভুত ব্যাপার সুদীপের দেহে কোনও কালি নেই। না আছে পোড়াবাড়ির কোনও চিহ্ন। 

বার বছর আগে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসাবে নথিবদ্ধ, আজও সুদীপের মৃত্যু হত্যা না আত্মহত্যা কিনারা হয়নি। পোস্টমর্টেম ও ভিসেরা রিপোর্টে পুলিশ কোনও এক শাড়ি পরা মহিলার রিপোর্ট পেশ করে। 


সব চরিত্র কাল্পনিক নয়। 
এবার হয়ত আর সুদীপদের হারিয়ে যেতে হবে না।

(লেখক এলজিবিটি অধিকার আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী)