ইউটিউব জুড়েই দাপাচ্ছেন তেনারা। মাউস ক্লিক করলেই হাতের মুঠোয়। এমনই মুঠোবন্দি যে, আপনি ভুলেই যাবেন, তারা ‘অশরীরী’। বিশ্বের যে কোনও ভাষায়, যে কোনও দেশের, যে কোনও সংস্কৃতির ইউটিউব ভিডিও দাবালেই হাতে উঠে আসে খাবলা খাবলা ভূত। বাংলাও পিছিয়ে নেই। এই ভাষা ও সংস্কৃতিতেও ভূতের দাপট সাংঘাতিক। ফলে ইউটিউবেই বা কেন থাকবে না ভৌতিকতার আগমন-নির্গমন? 

বাংলা ইউটিউববাজির চৌহদ্দিতে যদি পশ্চিমের মতো স্মার্ট প্যারানর্মাল ভিডিও আশা করেন, তো ঠকবেন। ভৌতিক সাহিত্যে বাঙালি খানিক দক্ষতা দেখিয়েছে বটে একদা, ভৌতিক ভিডিও-য় কী দেখায়, তা নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। 

বাংলা বাজারে ভৌতিক ভিডিও হিসেবে এক সেলিব্রিটি রয়েছেন। তাঁর নাম শ্রী বিশ্বনাথ। তিনি নিজের পরিচয় দেন ‘প্রেত টাটিয়েক’ হিসেবে (এর মানে কী, আমার জানা নেই। মনে হয় ‘তান্ত্রিক’ লিখতে চেয়েছিলেন)। তাঁর অসংখ্য ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। সেই জনপ্রিয়তা ভৌতিকতার কারণে, নাকি তথাকথিত ‘প্রেত তান্ত্রিক’-কে খিল্লি করে, তা বুঝে নিতে হবে। সেই সব বোঝাবুঝির আগে দেখে ফেলতে হবে শ্রী বিশ্বনাথের ভিডিও।   

আপনি যদি মনে করেন, বিশ্বনাথের ভিডিও-য় এড ও লোরেইন ওয়ারেনের অভিজ্ঞতা ঝিলিক দিচ্ছে, তো আপনি গেলেন। এই ভিডিও একান্ত ভাবেই বাংলার মাল। এর সঙ্গে ‘বাংলা মাল’-এর তুলনাই করা যেতে পারে। এমন কাঁচা, অগা এবং ঝুল মাল খুব কমই হয়েছে ইতিহাসে। 

শ্রী বিশ্বনাথ হাতে একটা হাতলওয়ালা থার্মোমিটার নিয়ে ভূত ধরতে বের হন রাত-বিরেতে। তাঁর নিজের ভাষায় এর নাম ‘নৈশকালীন অভিযান ও অশরীরের খোঁজা’। বাংলা ভাষার দৌড় দেখলে পেটের ভিতরে ভূত আপনি চুলকে ওঠে। তার উপরে বিশ্বনাথবাবু মুখ খুললেই চৌতাল। অতি অসংস্কৃত উচ্চারণে ভুলভাল বাংলায় তিনি নাকি ভূতের অ্যায়সি কি ত্যায়সি করতে বদ্ধপরিকর। হাতের মিটারে তিনি টের পান কোথায় ভূতের ঝাঁক খদরবদর করছে। ওঁর সঙ্গে থাকেন ইন্দ্রদীপ নামের কেউ একজন। তাঁকে সচরাচর দেখা যায় না। কারণ তিনিই মোবাইল ক্যামেরা ধরে থাকেন এবং ঘন ঘন বিশ্বনাথকে ‘স্যর’ বলেন। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

রাতের বেলায় গলায় ১৯৫০-এর দশকের বেতার নাটকের কেতা দুরস্ত করে বিশ্বনাথ ও ইন্দ্রদীপ ফিল্ডে নামেন। ভিডিও-গুলো রীতিমতো এডিটেড (অতি যাচ্ছেতাই সেই এডিটিং), তার উপরে্ সেগুলোয় বিচিত্র সব মিউজিক। ট্যাঁ ট্যাঁ-ঝ্যাং ঝ্যাং-কুঁইচ কুঁইচ আর তার ফাঁকে ফাঁকে— ‘‘ইন্দ্রদীপ, ওটা কী! কে যেন আমার ঘাড়ে হাত রাখল!’’ অথবা ‘‘ওকী ওকী ওকী!! এত হাওয়া দিচ্ছে কেন?’’-গোছের মন্তব্য। না, বিশ্বনাথের ঘাড়ে কারোকে হাত রাখতে দেখা যায়নি, হাওয়ার চিহ্নমাত্র দর্শক টের পাননি। বিশ্বনাথ একাই চিল্লে গিয়েছেন। 

বিশ্বনাথের ভূত ধরার ভিডিও

সর্বদাই যে এমন বিনা আয়াসে বিশ্বনাথ পার পেয়েছেন, তা নয়। বেশ কিছু ভিডিও-য় তিনি নারকেল গাছে চড়েছেন, দেওয়াল ধরে ঝুলেছেন, পাঁচিল টপকে উঁকি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য একটাই— তিনি ভূতের চরম সব দাওয়াই জানেন। যে কোনও প্যারনর্মাল কাণ্ডে তাঁকে ডাকলেই কম্ম ফতে। তবে এর জন্য তিনি কি পারিশ্রমিক নেন, তা জানাননি কোথাওই। 

শ্রী বিশ্বনাথের এই নৈশকালীন অভিযান কি একান্ত ভাবেই সোশ্যাল ওয়ার্ক? নাকি এই ইউটিউববাজির আবডালে তিনি ভূতান্ত-ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা চাইছেন, সেটা বিচার করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই বিচারে না গিয়ে অসংখ্য পাবলিক বিশ্বনাথের ভণ্ডামি ধরতে ‘এক্সপোজড’ তকমা লাগানো ভিডিও বানিয়ে আপলোড করেছেন। এ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, মানুষের হাতে অনন্ত সময়। এ থেকে এ-ও প্রমাণিত হয় যে, শ্রী বিশ্বনাথ ইউটিউবে একজন রীতিমতো কেউকেটা। 

বিশ্বনাথকে ‘এক্সপোজ’ করার ভিডিও

আপনার মতামত আপনারই। শ্রী বিশ্বনাথ ভণ্ড কি ভণ্ড নন, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর অবকাশ আমার অন্তত হাতে নেই। তবে এই নিম্নমানের ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে এটা বার বার মনে হয়েছে যে, পেশাদার প্যারানর্মাল দূর অস্ত, একটা যথাযথ প্র্যাঙ্ক ভিডিও নামানোও পশ্চিমবাঙালির দ্বারা হয় না। ভূত বোধ হয় এইখানেই। শর্ট ফিলমই হোক অথবা ‘নৈশকালীন অভিযান’— কাঁচা হাতে ঘুঁটে দেওয়া বাঙালির ইউটিউববাজির প্রায় সর্বত্র।