ভাদ্র মাস পড়েছে কি পড়েনি, ঘরে ঘরে অরন্ধন। পুজোর ধামাকা এগিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু বিশ্বকর্মা তথা অরন্ধনের তো আসেনি! তবে? উত্তর জানতে বিবুধ সমাজে একটি ছানবিন করার চেষ্টা করায় যা জানা গেল, তা ভয়াবহ। সেই ১৯৬০-এর দশকের আভাঁ গার্দ আঁতলামির পরে এই ২০১৮-এ এসে বিশিষ্ট বাঙালি আঁতেলরা কফি হাউসে (মতান্তরে সিসিডি-তে) আহারাদি সারছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে এই অসময়ের অরন্ধনের সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে রীতিমতো সিনপসিস লিখে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শর্ট টার্ম জলপানিরও আবেদন করে ফেলেছেন বলে জানা গিয়েছে।

‘অরন্ধন’-এর সাদা বাংলার্থ— ‘হাঁড়ি না চড়া’। বাঙালির বাড়িতে এহেন অবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা ঘটেছে বলে জানা যায় না। এর কারণ কিন্তু সে অর্থে রাজনীতি বা সমাজিক ঘোটালায় পাওয়া যাবে না। এর মূলে রয়েছে বিনোদন। হ্যাঁ, নির্জলা, নির্যস এন্টারটেনমেন্ট।

বিবিধ ঝামেলায় বন্ধ হয়ে রয়েছে মেগা সিরিয়ালের শ্যুটিং। আর তাতেই টান পড়েছে বাঙালির হাঁড়িতে। এমনটা ভাববেন না যেন, মেগা সিরিয়াল বাংলার অর্থনীতির একটা ভাইটাল জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে। সিরিয়াল যা নিয়ন্ত্রণ করে, তা অর্থনীতির চাইতেও ভায়বহ। তার নাম ‘হোম ফ্রন্ট’।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

বাঙালির হোম ফ্রন্টের শান্তি কম-বেশি দু’দশক ধরে রক্ষা করে এসেছে মেগা সিরিয়াল। ‘জননী’, ‘জন্মভূমি’ যে স্বর্গাদপী গরিয়সী, তা বাঙালি টের পেয়েছে এই মেগা সিরিয়াল শুরু হওয়ার পর থেকেই। হোম ফ্রন্টের অস্থি-মজ্জায় প্রবেশ করে মেগা একদিকে যেমন মুক্তি দেয় বাঙালি গেরস্ত পুরুষকে, তেমনই অন্য দিকে তা তাদের অন্য বন্ধনে জড়ায়। বাঙালি পুরুষ সন্ধের গৃহজ ঝক্কি থেকে একদিকে মুক্তি পায়। অন্য দিকে, সিরিয়াল-প্রসূত মেয়েলি আড্ডার ঝক্কিও তাকে সইতে হয়েছে। কে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছে, কার মেয়ের বিয়েতে হিরের নাকছাবি চুরি গিয়েছে, কে কাকে জাত তুলে গালাগাল দিয়েছে— ক্রমাগত এই সব আলোচনায় বাঙালি ভুলতে বসেছে কে আপন কে পর। (দেখেছেন, সেই সিরিয়ালের ল্যাঙ্গোয়েজ এই লেখাতেও মুখ বাড়াল!)

গত দু’দশকে ক্রমাগত বেড়ে গিয়েছে বাঙালির পরিবার। নিজের নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সঙ্গে বইতে হয়েছে বিরাট বিরাট সিরিয়াল-পরিবারের ভার। শান্তশিষ্ট মেয়েটিও স্বামী আর সন্তানের ক্যাপসুলে বসে শাশুড়ি-ননদ-দেওর-জা’য়ের ঘোরালো পলিটিক্সের শিকার। একদিন অশান্তি না দেখলে ঘুম নেই। সেই সিরিয়াল টিভি থেকে উধাও! ভাবা যায় না, ভাবা সম্ভবই নয়। 

কাজের মেয়ে বলে গিয়েছে, সে সিরিয়াল চালু হলে কাজে আসবে। রান্নার মাসিও একই কারণে ‘ছুটিতে’। একা রান্নাঘর সমলাতে গিয়ে হিমশিম। ফল— অরন্ধন। বাংলার ঘরে ঘরে নিবন্ত গ্যাসের চুলো। রাস্তায় রুটিওয়ালার বিক্রি বেড়েছে। বেড়েছে সুইগি বা জোম্যাটোর দাপটও। সেই সব গলাধঃকরণ করেই আপিস-কাছারি। মনমরা গিন্নি আর ঝিম ধরা সংসারে মন টিকছে না। 

মেটাও মা মঙ্গলচণ্ডী। মেটাও ‘মেগা’ অসন্তোষ। বাঙালির ঘরেলু সন্ধে ভরে উঠুক মেগায় মেগায়। এই শূন্যতা তো আর সয় না।