স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে দীর্ঘদিন ধরে। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা একজন মানুষ, যাঁর ব্যধি অনিরাময়যোগ্য, তিনি যদি নিশ্চিত মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তাটিকে ছোট করতে চান, তাঁর সেই ইচ্ছে কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েই যাবতীয় তর্ক-বিতর্ক।

আসতে চলেছে এক বিশেষ ধরনের মেশিন ‘সারকো’। মৃত্যুর পথ বেদনাহীন ও সহজ করাই এই মেশিনের উদ্দেশ্য। তবে বাস্তবে কি সত্যি সম্ভব এরকম? যে মেশিনের দ্বারা মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন, তাও চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে?  

অস্ট্রেলিয়ান মানবতাবিদ ও স্বেচ্ছামৃত্যু সংস্থা ‘এক্সিট ইন্টারন্যাশানাল’-এর অধিকর্তা ফিলিপ নিৎস্কে বলছেন, ‘‘মৃত্যু বিষয়টি লুকিয়ে চুরিয়ে করার মতো নয়।’’ বিদেশি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-কে তিনি আরও জানান, স্বেচ্ছামৃত্যুতে সাহায্যকারী অনেক প্রাণঘাতী ওষুধ বাজারে আগে থেকেই রয়েছে। তবে ‘সারকো’ এলে স্বেচ্ছামৃত্যুর রাস্তা অনেক সহজ হয়ে যাবে। 

এখনও পর্যন্ত এই মেশিনের প্রাথমিক একটি থ্রিডি ডিজাইন ভাবা হয়েছে। জানা গিয়েছে এই বছরের শেষে নেদারল্যান্ডসে ‘সারকো’র সম্পূর্ণ চেহারা দেখা যাবে। পরীক্ষার জন্য এই মেশিন পাঠানো হবে সুইৎজারল্যান্ডে যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মেশিনের ভিতরে নাইট্রোজেন ভর্তি একটি ক্যাপসুল থাকবে।যা মুহূর্তের মধ্যেই জীবনকে ঠেলে দেবে মৃত্যুর মুখে। 

‘মৃত্যু যন্ত্রে’র তিনটি লেয়ারের থ্রিডি ডিজাইন । আমস্টারডামে একটি এক্সপোয় মৃত্যুর ‘ভারচুয়াল রিয়ালিটি’ এক্সপেরিয়েন্স করছেন এক ভদ্রমহিলা
(উপরে) । ছবি- ফিলিপ নিৎস্কের টুইটার।

কিন্তু কোথা থেকে এল এই ভাবনা? নিৎস্কে জানান, ২০১২ সালে রাগবি খেলোয়াড় টনি নিকলসনের কথা শোনার পর তিনি সারকো বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। টনি নিকলসন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘকাল সঙ্কটজনক অবস্থায় জীবিত ছিলেন। স্বেচ্ছামৃত্যু ছাড়া তাঁর অন্য কোনও মুক্তির পথ ছিল না তাঁর। কিন্তু তাঁকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলত তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। টনির মতো যাঁরা ‘লকড-ইন’ সিনড্রোমে ভুগেছেন, তাঁদের জন্য ফিলিপ নিৎস্কের এই মেশিন হতে পারে মুক্তির পথ।

ফিলিপ নিৎস্কে। ছবি- নিৎস্কের ফেসবুক প্রোফাইল। 

ভারতেও স্বেচ্ছামৃত্যুর স্বপক্ষে অনেক আইনি জটিলতা রয়েছে। সবার ক্ষেত্রে এটি কোনওভাবেই প্রযোজ্য নয়। কঠিন অসুখে কোনও ব্যক্তি শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে এবং সেই অবস্থা থেকে তাঁর সেরে ওঠার আর কোনও সম্ভাবনা না থাকলে, সেই সমস্ত ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’র রায় দিয়ে থাকে। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

২০১১ সালের ৭ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট অরুণা সনবাগের স্বেচ্ছামৃত্যুর সপক্ষে প্রথম ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’র রায় দেয়। শ্লীলতাহানি হওয়ার ফলে অরুণা দীর্ঘ ৪২ বছর ‘ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ বেঁচে ছিলেন। এরকম অবস্থায় কারও সংজ্ঞা, চৈতন্য থাকে না। শরীর মৃতদেহের মতো নিথর অবস্থায় পড়ে থাকে। বলাই বাহুল্য এরকম জীবন থাকার থেকে না থাকা অনেক ভাল। ফিলিপ নিৎস্কের ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’-এর এই  মেশিন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে যন্ত্রণাহীন ভাবে এগিয়ে যেতে কতটা সাহায্য করবে সেটাই এখন দেখার।