কিংবদন্তিদের ব্র্যাকেটে আসেন না। অথচ নিজের টার্মে তিনি ‘লেজেন্ড’। এখন কার্যত বিস্মৃতপ্রায়ই বলা যায়! গুগলে রবার্তো মার্তিনেজ সার্চ করলেই যে মুখের ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে, তিনি প্রাক্তন এভার্টন কোচ। বেলজিয়ামের জাতীয় দলের কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। কিন্তু তাঁর-ই যে সমনামী ব্যক্তি বুয়েনস এয়ারস-এ থাকেন, তাঁর খোঁজ ‘সিধু জ্যাঠা’ গুগলেরও অধরা। অথচ রিয়াল মাদ্রিদ ও এস্প্যানিওল-এ সত্তরের দশকে সোনার সংসারের প্রতিনিধি তিনি। 

স্প্যানিশ ফুটবলে যত ট্রফি জিতেছেন গোটা কেরিয়ারে, বর্তমান সুপারস্টার ফুটবলাররাও লজ্জা পাবেন। দি’ স্তেফানো, সান্তামারিয়াদের মতো কিংবদন্তি কোচের প্রিয় ছাত্র তিনি। বিশ্বজয়ী দেল বক্সির ক্লাব সতীর্থ ছিলেন টানা ছ’বছর। গত মরশুমে দিল্লি ডায়নামোসে কোচিং করানো মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল পর্তুগাল চলতি মরশুমে কোচিং করাবেন পুণে সিটি এফসি-কে। ২০০৮ সালে  তিনি রিয়াল মাদ্রিদের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হয়েছিলেন। সেই সময়ে ‘বন্ধু’ মার্তিনেজকেই লাতিন আমেরিকা থেকে তরুণ প্রতিভাবান ফুটবলার স্কাউটিংয়ের দায়িত্বে এনেছিলেন।

সম্প্রতি রিয়াল মাদ্রিদের সর্বকালের সেরা যে ১০০ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়, সেখানেও স্থান পেয়েছেন ৭১ বছরের ভদ্রলোক। বুয়েনস এয়ারস থেকে এবেলা.ইন-এর জন্য নিজেই ভিডিও শ্যুট করে পাঠালেন। ইমেল-সাক্ষাৎকারে অনর্গল মিস্টার মার্তিনেজ—

রবার্তো জুয়ান মার্তিনেজ, বিশ্বফুটবলের শ্রদ্ধেয় চরিত্র। — নিজস্ব চিত্র

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

এবেলা.ইন— এস্প্যানিওল ও রিয়াল মাদ্রিদে আপনি কিংবদন্তি। দুই ক্লাবের জার্সিতে খেলেছেন এগারো বছরের উপরে। বর্তমানে স্প্যানিশ ফুটবলে যেভাবে রাজনীতির রং মিশে গিয়েছে কাতালান ইস্যুতে, তেমনই সত্তরের দশকেও কি ফুটবলকে প্রভাবিত করেছিল রাজনীতির ছায়া?

রবার্তো মার্তিনেজ: যখন প্রথম বার ইউরোপে এসেছিলাম, স্পেনে তখন জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর সরকার চলছিল। সেই সময়ে রাজনীতিতে অনেক বিধিনিষেধ ছিল। এর মধ্যে একটা ছিল কাতালান নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা। কাতালান নিয়ে কথা বলা একদমই নিষিদ্ধ ছিল। তবে খেলতে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনে কখনই রাজনৈতিক উত্তাপের আঁচ পোহাতে হয়নি আমাকে।

ঈর্ষণীয় ফিটনেসের অধিকারী মার্তিনেজ। — নিজস্ব প্রতিবেদন

এবেলা.ইন— বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন এস্প্যানিওল আপনার ‘ঘর’! তা সত্ত্বেও কাতালান ক্লাব থেকে ‘শত্রু’ রিয়াল মাদ্রিদে খেলার প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন কেন?

রবার্তো মার্তিনেজ: রিয়াল মাদ্রিদে ট্রান্সফার নেওয়ার সময়ে এক মুহূর্ত ভাবিনি। রিয়ালের মতো বিশ্ববিখ্যাত ক্লাবের জার্সিতে গোল করার স্বপ্ন ছিল বহুদিনের। অন্যদিকে, এস্প্যানিওল ছিল নিজের ঘরের মতো। প্রথম থেকে ক্লাবের সতীর্থরা আমাকে ভালভাবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। ক্লাবের সমর্থকদের ভালবাসাও খুব তাড়াতাড়ি অর্জন করেছিলাম। এই কারণেই স্পেনের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাই। ওখানে যে কয়েক বছর খেলেছিলাম, সমর্থকরা ভালবাসায়, স্নেহে এতটাই মুড়ে দিয়েছিলেন যে এখনও এস্প্যানিওলকেই ‘নিজের ঘর’ বলি।

এবেলা.ইন— রিয়াল মাদ্রিদের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের তালিকায় আপনি রয়েছেন। রিয়ালে খেলার সুযোগ পেলেন কীভাবে? 

রবার্তো মার্তিনেজ: স্পেনে তিন বছর কাটানোর পরে রিয়াল তাদের ক্লাবে আমাকে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। আমার পক্ষে কোনও মতেই এই প্রস্তাব উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এই ক্লাবের হয়ে খেলতে নেমে একটাই লক্ষ্য ছিল— নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ও সাফল্যের চুড়োয় পৌঁছনো। যে কোনও ফুটবলারের কাছেই খেতাব কেরিয়ারের উজ্জ্বল বৃত্ত সম্পন্ন করে। আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। রিয়ালের জার্সি পরলেই মনে হতো, কেরিয়ারের তুঙ্গে রয়েছি।

মার্তিনেজের ড্রিবলিং এখনও চোখে ভাসে সত্তরের দশকের দর্শকদের। — নিজস্ব চিত্র

এবেলা.ইন—আর্জেন্তিনায় আপনার জন্ম। অথচ কেরিয়ারের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে স্পেনে। আবার লিও মেসিও আর্জেন্তিনীয়। স্পেনে ক্লাব স্তরে চুটিয়ে খেলার পরেও আর্জেন্তিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলছেন। দি’ স্তেফানো আবার দুই দেশের হয়েই খেলেছেন। ব্যর্থ হলেই মেসির দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আপনার ক্ষেত্রেও কি এমনটা হয়েছিল?

রবার্তো মার্তিনেজ: ব্যানফিল্ডে খেলা শুরু করেছিলাম। প্রথম কয়েকটা ম্যাচেই বেশ কিছু গোল করে ফেলেছিলাম। সেই সময়ে আর্জেন্তিনার বিখ্যাত স্পোর্টস ম্যাগাজিন ‘গোলস’-এ আমাকে নিয়ে এক প্রতিবেদন লেখা হয়। জার্মানিতে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে আমাকে জাতীয় দলের সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে ধরা হয়েছিল সেই প্রতিবেদনে। তবে সেই ক্লাবে আমি মাত্র ৬ মাস খেলতে শুরু করেছিলাম। তার পরেই বার্সেলোনার এস্প্যানিওলে ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাই। সেই সময়ে স্পেনের জাতীয় দলে খেলারও সুযোগ তৈরি হয়। তাই কোনও রকম সংশয়ের অবকাশ না রেখে ওখানে চলে গিয়েছিলাম। এখন আমি সগর্বে বলতে পারি, স্পেনের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করাটা ভীষণই সম্মানের ছিল। আজও স্পেনের জাতীয় দলের খেলার কথা স্মরণ করলে গর্বে বুক ভরে ওঠে। তবে আর্জেন্তিনায় এই কারণে কোনও অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি।

পুত্র জুনিয়র রবার্তো মার্তিনেজের সঙ্গে। — নিজস্ব চিত্র

এবেলা.ইন— দারিদ্রের কারণে মেসি রোসারিও ছেড়ে এসেছিলেন বার্সেলোনায়। আপনি কেন আর্জেন্তিনা ছাড়লেন?

রবার্তো মার্তিনেজ: সত্তরের দশকে গোটা বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো এতটা উন্নত ছিল না। তবে আর্জেন্তিনাতে থাকলেও ফুটবলপ্রেমী হিসেবে বিশ্বের সেরা সেরা তারকাদের খেলা ফলো করতাম নিয়মিত। আর্জেন্তিনার দি’ স্তেফানো থেকে সিভোরি, আঞ্জেলিও, মাসেচিও-দের দেখে অনুপ্রাণিত হতাম। ইউরোপে খেলা বিখ্যাত এই আর্জেন্তাইনরা দেশে ফিরে ওখানকার ফুটবলের পেশাদার পরিকাঠামো থেকে প্যাশন— সবই শোনাতেন। সেই সময়ে আমাদের দেশে এসব কার্যত গল্পের মতো ছিল। তাই আমার কাছে যখন ইউরোপে খেলার প্রস্তাব এল, লুফে নিয়েছিলাম।

বুয়েনস এয়ারস থেকে এবেলা.ইন-এর জন্য পাঠানো বিশেষ ভিডিও...

 

 

এবেলা.ইন— জোসে সান্তামারিয়া আপনাকে আবিষ্কার করেন। ওনার মতো লেজেন্ডের সান্নিধ্যে খেলেছেন দীর্ঘ সময়। আজও তাঁকে কোচিংয়ের ম্যানুয়াল ধরা হয়।

রবার্তো মার্তিনেজ: আমি ভীষণ ভাগ্যবান যে এস্প্যানিওলে যখন খেলতে এসেছিলাম, তখন সেখানকার কোচ ছিলেন জোসে এমিলিও সান্তামারিয়া। উনি আমার ফুটবল-পিতা! ওঁর জন্যই এস্প্যানিওলে আমার সই করা। অন্য পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন দেশের ক্লাবে খেলতে এসেছিলাম। তবে এই সমস্যা কার্যত অনুভবই করিনি। কারণ, আস্তে আস্তে ক্লাবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্যও পর্যাপ্ত সময় আমি পেয়েছিলাম মূলত ওঁর সৌজন্যে। এখনও নির্দ্বিধায় স্বীকার করি, উনি না থাকলে আমি আজ রিয়ালের ‘দ্য গ্রেট’ রবার্তো মার্তিনেজ হতে পারতাম না। পাশাপাশি ফুটবলার সান্তামারিয়া তো রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি ফুটবলার। রিয়ালের পাঁচ বার ইউরোপের খেতাবজয়ী দলের ফুটবলার ছিলেন।

বিপক্ষ ফুটবলারদের কাছে ত্রাস। — নিজস্ব চিত্র

এবেলা.ইন— দেল বক্সির সঙ্গে দীর্ঘদিন রিয়াল মাদ্রিদে খেলেছেন আপনি। কোচ হিসেবে তো উনি বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা। ফুটবলার হিসেবেও শোনা যায় নেতৃত্ব দেওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল ওঁর। 

রবার্তো মার্তিনেজ: ভিসেন্তে দেল বস্কি টানা ছ’বছর রিয়ালে আমার সতীর্থ ছিলেন। দুর্দান্ত একজন ফুটবলার, ততোধিক বড় মাপের একজন ব্যক্তি। ফুটবলার হিসেবে ওঁর প্রধান অস্ত্র ছিল হেড। কত ম্যাচে যে উনি হেডে গোল করে দলকে বাঁচিয়েছেন! মাঠে প্রত্যেকের কাছে উনি দৃষ্টান্ত ছিলেন। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল গুণের জন্যই ফুটবলার হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ এবং স্পেনের কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ, ইউরো জিতেছেন।

এবেলা.ইন— সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে বার বারেই আর্জেন্টিনা ব্যর্থ হয়েছে। দেশীয় ফুটবলের রোগ নির্ণয় কবে ঠিকঠাক হবে?

স্প্যানিশ ফুটবলের সাড়া জাগানো নাম। — নিজস্ব চিত্র

রবার্তো মার্তিনেজ: আর্জেন্টিনার প্রধান সমস্যা আসলে ফুটবল সংস্থায়। শেষ কয়েক বছর ভীষণভাবে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে এএফএ। নেতৃত্ব দেওয়া থেকে ম্যানেজারদের নিয়োগ— প্রতিটি কাজেই অস্বচ্ছতার ছাপ। তাই সঙ্কট যেমন ছিল তা রয়েই গিয়েছে। আর এই ডামাডোলের সময়েই কর্তারা ব্যস্ত ক্ষমতা দখলের জন্য। এই কারণে শেষ চার বছরে তিনজন কোচকে ছাঁটাই হতে হয়েছে। এতে যে কোনও দেশের ফুটবলের অগ্রগতির কাজ থমকে যায়। আমার কাছে সমাধানের অঙ্ক খুব পরিষ্কার— সংস্থার যাঁরা দোষী তাঁদেরকে সমস্ত কিছুর দায় নিয়ে সরতে হবে। কারণ তাঁরা দেশের ফুটবলকে নতুন দিশা এনে দিতে পারেননি।

এবেলা.ইন— রোনাল্ডোকে রিলিজ করে রিয়াল কি ভুল করল? রোনাল্ডো-জিদানের অনুপস্থিতি রিয়ালের পক্ষে কতটা চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে?

রবার্তো মার্তিনেজ: ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, রোনাল্ডোর মতো জিনিয়াসের পরিবর্ত খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। তবে ক্লাবের টেকনিক্যাল ব্যক্তিরা রোনাল্ডোর সম্ভাব্য পরিবর্ত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। সময় বলে দেবে, কোচ লোপেতেগুই এবং অন্যান্য ফুটবলাররা রোনাল্ডোর অভাব পূরণ করতে সমর্থ হবেন কি না!

রিয়ালের মাদ্রিদের সোনার সংসারের সদস্য মার্তিনেজ। — নিজস্ব চিত্র

এবেলা.ইন— সত্তরের দশকে রিয়াল-বার্সায় এল ক্লাসিকোর ক্রেজ কেমন ছিল? মহারণ নিয়ে নিজস্ব স্মৃতি কেমন?

রবার্তো মার্তিনেজ: এল ক্লাসিকো ছিল এমন একটা ম্যাচ যা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে সমর্থকরা অপেক্ষা করে থাকতেন। এল ক্লাসিকোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই উত্তেজনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে থাকত। সেই সময়ে সাংবাদিকদের ব্যস্ততা ছিল দেখার মতো। ফুটবলারদের উদ্বেগ সংক্রমিত হত সাংবাদিকদের মধ্যেও। চূড়ান্ত ফুটবল প্রস্তুতিতে দু’দলের মধ্যে কার্যত কোনও তফাত থাকত না। ক্লাসিকোর আসল ভাগ্য নির্ণয় করত স্ট্র্যাটেজি। দু’দলের পার্থক্য গড়ে দিত মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা। ম্যাচের আগের দিনের রূদ্ধশ্বাস পরিবেশ, সমর্থকদের আবেগ, এমনকী চেনা পরিচিত রাস্তার চেহারাও বদলে যেত। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে বলতে পারি, ঘরের মাঠে স্যান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে একবার আমার করা একমাত্র গোলে রিয়াল জিতেছিল। লাখো লাখো সমর্থকের মুখে আমার নাম উচ্চারণ, উচ্ছ্বাসের রংয়ে রঙিন হয়ে ওঠা— এখনও আমার কাছে অমলিন।

বল পায়ে জাদু মার্তিনেজের। — নিজস্ব চিত্র

এবেলা.ইন— বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় জেনেছি আপনি দি’ স্তেফানোর ভীষণ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফুটবলার এবং ম্যানেজার হিসেবে বিশ্ব ফুটবলে কার্যত মিথ তিনি। গুরু হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি?

রবার্তো মার্তিনেজ: আলফ্রেডো দি’ স্তেফানোকে আমরা ‘ডন’ বলতাম। মাদ্রিদের স্পোর্টস সিটিতে প্রত্যেকদিন নিয়ম করে ঘণ্টাখানেক আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। সেই সময় বহু ফুটবল আলোচনার সঙ্গী থেকেছি আমি। দি’ স্তেফানো শুধু কিংবদন্তিই নন, এখনকার ফুটবলেও ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক। দি’ স্তেফানো টিম গেমের মন্ত্র শিখিয়েছিলেন আমাদের, ‘‘দলগত ফুটবল ছাড়া একজন ফুটবলার কখনও তারকা হয়ে উঠতে পারে না।’’ শুধু ফুটবলার হিসেবে নয়, কোচ হিসেবেও ‘উইনার’ ছিলেন উনি। আমার কোনও সন্দেহ নেই, সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার মিস্টার স্তেফানো।

সতীর্থ জুয়ানিতোর সঙ্গে মার্তিনেজ। — নিজস্ব চিত্র

এবেলা.ইন— আপনার সম্বন্ধে যতই পড়াশোনা করেছি, ততই মনে হয়েছে, আপনার কেরিয়ার আদতে এক ‘হিডন ট্রেজার’। কত মণি-মাণিক্য জমা রয়েছে আপনার ফুটবল কেরিয়ারে। অজ্ঞাত এমন কিছু ঘটনা জানান, যা বিশ্ব ফুটবল আজও জানে না।

রবার্তো মার্তিনেজ: রিয়ালে ছ’বছর থাকাকালীন ৫টা লা লিগা এবং ২টো স্প্যানিশ কাপ খেতাব জিতেছিলাম। এর মধ্যে স্মরণীয় তখনকার ইউরোপিয়ান কাপের (এখন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) একটি ম্যাচ। বুখারেস্টের বিরুদ্ধে খেলার সময়ে চোয়ালে আঘাত পাই। তবে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাইনি। সেই অবস্থাতেই খেলে গিয়েছিলাম। হাফটাইমে দলের চিকিৎসকরা চোট পর্যালোচনা করে আমাকে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে পাঠান। সেখানেই দেখা যায়, চোয়ালের তিনটে হাড় ভেঙেছে। উপরের চোয়ালের ম্যাক্সিলায় মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। পরের দিন অবাক হয়ে প্রেসের কাছ থেকে জানতে পারি, দ্বিতীয়ার্ধে খেলতে না নামায় সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ক্লাবের বাইরে সমর্থকরা ভীষণ প্রতিবাদ জানিয়েছিল। শেষমেশ, ক্লাবের তরফে আমার চিকিৎসার নথি প্রকাশ্যে দেখিয়ে সমর্থকদের শান্ত করতে হয়।

বুখারেস্ট ম্যাচে মারাত্মক চোট মার্তিনেজের। — নিজস্ব চিত্র

দ্বিতীয় ঘটনা আমার অবসর নেওয়ার সময়ে। স্প্যানিশ কাপের সেমিফাইনালে সেভিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে নেমেই বিপদে পড়েছিল দল। দলের এক নম্বর স্ট্রাইকার জুয়ানিতো চোট পেয়ে বেরিয়ে যায়। সেই ম্যাচেই আমার দুরন্ত এক গোলে সেভিয়াকে হারিয়েছিলাম ভাঙা দল নিয়ে। ৩৪ বছর বয়সেও ভেলকি দেখিয়েছিলাম। গোটা ম্যাচে দাপিয়ে খেলেছিলাম। দলের দুঃসময়ে নেতা হয়ে উঠেছিলাম। ম্যাচের পরে সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, সব-ই আমাকে ঘিরে। পার্কিংয়ে সমর্থকদের কাঁধে চেপে গাড়িতে উঠতে হয়েছিল। সেই সময়ের ঘটনা এখনও মনে রয়েছে। সেই সব স্মৃতি এখনও হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।

Roberto Martinez, eterno 'Pipi Cazagoles' from Roberto Martinez on Vimeo.