তিন তালাককে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই মামলায় আবেদনকারী ছিলেন চার মুসলমান মহিলা ও মুসলমান মহিলাদের সংগঠন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সরকারই আসল অনুঘটকের কাজ করেছে এই মামলায়।

শীর্ষ আদালতে দাঁড়িয়ে সরকারি আইনজীবী বিচারপতিদের বলেছিলেন, আদালত চাইলে কেন্দ্র সরকার তিন তালাকের জায়গায় মুসলমানদের জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের নতুন আইন তৈরি করতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টও সেই নতুন আইন প্রণয়নের নির্দেশই দিয়েছে। মুখে মুসলমান মহিলাদের ক্ষমতায়নের কথা বললেও, প্রধানমন্ত্রীও তিন তালাক নিয়ে শীর্ষ আদালতের রায় যে আসলে তাদেরই জয়, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন দলীয় সভাপতিকে দিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করিয়ে।

এই রায় নিয়ে এখনও পর্যন্ত তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি। দলের তরফেও কিছু বলা হয়নি। এখন চুপ থাকলেও, এই আইন প্রণয়নের সময় সংসদে প্রত্যেকটি দলেরই তিন তালাক নিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।

তিন তালাক তো নরেন্দ্র মোদী সরকারের একটি পদক্ষেপ মাত্র। সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাজেন্ডার দিকে তাকালে দেখা যাবে বিজেপি-সঙ্ঘ বিরোধী দলকে চাপে ফেলার জন্য মোদী সরকারের থালায় অনেক উপকরণ রয়েছে। 

যে ইস্যুগুলি ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজের ধারাকে একদম অন্য খাতে নিয়ে যাবে। তার সঙ্গে ভারতের বহুত্ববাদী ও নেহরু-গাঁধীর জাতীয়তাবাদের ধারণায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলিকে চাপে ফেলবে।

এমন চারটি ইস্যু কী কী  হতে পারে দেখা যাক এক নজরে:

রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ

ইতিমধ্যেই অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির তৈরি হবে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। সুপ্রিম কোর্টেই চূড়ান্ত শুনানি চলছে। 

ইলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত রামজন্মভূমির জায়গা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার কথা বললেও, সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে এসেছে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষই। 

এই মামলাতেও মোদী সরকারের পূর্ণ সমর্থন থাকবে ‘রাম মন্দিরের’ দিকে। অযোধ্যায় রামমন্দির গড়ে তোলা যে তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য তা উত্তরপ্রদেশে বিজেপি-র নির্বাচনী ইস্তেহারে প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি

তিন তালাক তুলে দেওয়া কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দিকেই এক কদম এগিয়ে যাওয়া। 

কোনও ধর্মের ব্যক্তিগত আইন না রেখে সব ধর্মের মানুষই যাতে একটিই আইন মেনে চলে, সেই উদ্দেশেই এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উদ্যোগ।

মুসলিম পার্সোনাল ল শরিয়ত আইনের উপর ভিত্তি করেই তৈরি। ১৯৩৭-এর পরে এর কোনও সংশোধন হয়নি। তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক কম হয়নি। হিন্দু কোড বিল নিয়েও একইরকম বিতর্ক হয়েছিল।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করাও সঙ্ঘ পরিবারের একটি অন্যতম লক্ষ্য।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

সংবিধানের ৩৭০ ধারা

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারায় জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য বিশেষ স্বায়াত্ত্বশাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের সব আইন জম্মু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না।

জম্মু কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিজেপির। অটলবিহারি বাজপেয়ীর সরকারের আমলে এই নিয়ে বিশেষ এগোতে পারেনি তৎকালীন বিজেপি সরকার। 

এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সারা ভারত জুড়েই নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে ও রাজ্য সরকারগুলিতে ক্ষমতায় এসে সেই দিকে এগোতেই পারে নরেন্দ্র মোদী সরকার।

সেই কাজ শুরু হয়ে গেলেও, প্রকাশ্যে বিজেপি এখনই কিছু বলছে না। তবে লক্ষ্যে তারা অবিচল থাকবে এ কথা বলাই যায়।

হিন্দু রাষ্ট্র

এখন শুনতে অবাস্তব লাগলেও, বিজেপির মূল যেখানে, সেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ‘ভারত’-এর ধারনা আসলে দাঁড়িয়ে হিন্দুত্বের আধিপত্যের উপরেই। 

ধীরে ধীরে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের তকমা ঝেড়ে ফেলে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ে তোলার দিকেই এগোতে চায় আরএসএস। আর রাজনৈতিক ভাবে সেই লক্ষ্য পূরণ করবে বিজেপি।

মোদী সরকারকে না হঠাতে পারলে দেশকে যে ধীরে ধীরে সেই দিকেই নিয়ে যাচ্ছে বিজেপি তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিজেপির নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীও হিন্দুত্বের সঙ্গে আধুনিক ভারতের ধারণাকে বাঁধতে চাইছেন। তাই তাঁর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে কৃষ্ণ থেকে গণেশ আসে, মহাদেবের সঙ্গে গঙ্গা দূষণের সমস্যাকে জোড়েন তিনি।

 

সংঘ-বিজেপির অ্যাজেন্ডাকে প্রতিহত করতে যে সব রাজনৈতিক দল মুখর তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে সব চেয়ে জনপ্রিয় করতে চাইছেন। তাঁর মোদী-বিরোধিতাকে প্রশ্নাতীত করতে চাইছেন।

সেই কাজে নেমে মমতাকে রাজনৈতিক নানা সিদ্ধান্তের সঙ্গে মোদীর আদর্শগত অ্যাজেন্ডার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে হবে। তা যথেষ্ট কঠিন লড়াই, সে নিয়ে তৃণমূল নেত্রীর মনেও কোনও সন্দেহ নিশ্চয়ই নেই।