নকল পা। পরোয়া নেই। তিনি ছুটছেন!

২২ বছর আগের এক ৯ জানুয়ারি ট্রেন দুর্ঘটনায় বাদ পড়েছিল ডান পায়ের হাঁটুর নীচের অংশ। পরের এতগুলো বছরে কামারহাটির দাসুবাবুর বাগানের বাসিন্দা আফজল খানের ঝুলিতে আট’টি ‘ম্যারাথনে’ অংশগ্রহণের বিরল কৃতিত্ব। পাড়ার ক্রিকেট ও ফুটবল দলেরও তিনি নিয়মিত খেলোয়াড়।

আফজলের একটা পায়ের হাঁটুর নীচের অংশে ‘ব্লেড’ লাগানো। যা দেখে ‘ব্লেড রানার’ হিসাবে পরিচিত দক্ষিণ আফ্রিকার অস্কার পিস্টোরিয়াসের (পিস্টোরিয়াসের দু’টি পায়েই ব্লেড)  কথা মনে পড়তে বাধ্য।

দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন মেধাবী আফজল বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্র। ১৯৯৬ সালের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণেশ্বর স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার ট্রেনে আত্মীয়দের লাগেজ তুলে দিয়ে প্লাটফর্মে নামার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা পিছলে আফজল সোজা গিয়ে পড়েছিলেন ট্রেন লাইনে। প্রাণে বাঁচলেও হারাতে হয়েছিল একটি পা। আর জি কর হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে শুরু নতুন লড়াই।

প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। তারপর শিক্ষকতার চাকরি। শুধু তা-ই নয়, জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতার কারণে ৩৭ বছরের আফজল এখন কামারহাটিতে সিপিএমের অন্যতম ‘মুখ’।

কলকাতায় বার্ষিক ‘হাফ ম্যারাথনে’ নিয়মিত অংশ নেন তিনি। গুয়াহাটিতেও দু’বার ‘ম্যারাথনে’ দৌড়েছেন আফজল। প্রতিদিন ভোরে নিয়ম করে অনুশীলন করেন।

তাঁর কথায়, ‘‘ছোটখাট অনেক দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। আটবার অংশ নিয়েছি ম্যারাথনে।’’ খেলাধুলোয় বরাবরই ভাল। দুর্ঘটনার পরও ক্রিকেট এবং ফুটবল ছাড়তে পারেননি। বলেন, ‘‘ক্রিকেটে আমি ব্যা়টসম্যান। দৌড়োনোর সময় রানার নিই না। ফুটবলে এখন আর স্ট্রাইকার পজিশনে খেলতে পারি না। আমি পাড়ার টিমের গোলকিপার।’’

দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল এটা বুঝতে যে, আমি বেঁচে রয়েছি। হাসপাতালে যাঁরা দেখতে আসতেন তাঁরা বলতেন, ছেলেটার ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গেল। অনেকেই আমাকে ডিসএবল্ড (প্রতিবন্ধী) বলেন। আমি তাঁদের হেসে বলি, আমার জীবনে ‘ডিস’ বলে কিছু নেই। সবকিছুতেই আমি ‘এবল’! আমার মা-পরিবার-স্ত্রী এবং বামপন্থী মতাদর্শ আমাকে লড়তে শিখিয়েছে। বাসে-ট্রামে উঠলে আমি প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের দিকে তাকাই না।’’

প্রথমে হুগলির একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি নকল পা ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন প্রতিযোগিতামূলক খেলার জন্য উন্নতমানের নকল পা ব্যবহার করেন। ২০১১ সালে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছেন আফজল। প্রথমে কলকাতার একটি স্কুলে। এখন বদলি হয়ে কামারহাটিতে।

১৯৫৫ সালে উত্তরপ্রদেশ থেকে এ রাজ্যে এসেছিলেন আফজলের বাবা। পেশায় গাড়িচালক। আফজল বলেন, ‘‘আমার পরিবার বরাবরই বামপন্থী। রাজনীতির পাঠ পেয়েছি বাবা এবং পরিবারের থেকে। আমার মা-দাদা সকলেই সিপিএমের সঙ্গে যুক্ত। রাজনীতি করার জন্য ২০১৪-’১৫ সালে আক্রান্ত হয়েছি বেশ কয়েকবার। যত মার খেয়েছি তত শক্ত হয়েছি। যারা মেরেছে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি, আমার শরীরে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। মনে নেই!’’