তুমি তো সাংবাদিকতার ছাত্রী ছিলে, তখন থেকেই কি অ্যাঙ্করিং শুরু করেছিলে? 

বিনীতা: ১৫ বছর বয়স থেকেই অ্যাঙ্করিং করতাম বিভিন্ন প্রোগ্রামে। পাশাপাশি শুরু করি গানের পারফরম্যান্স। ছোটবেলা থেকেই ক্লাসিকাল মিউজিকে ট্রেনিং। আর জার্নালিজম-এও হাতেখড়ি স্কুল থেকেই। আমি স্কুল রিপোর্টার ছিলাম একটি সংবাদপত্রে। তার পরে টিটিআইএস-এও কনট্রিবিউট করি। স্কুল লেভেলে ডিবেট, এক্সটেম্পোর, মিউজিক, অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডান্স— আমায় সবাই মাল্টিটাস্কার, মাল্টিফেসেটেড বলতো। আমার যখন ৫ বছর বয়স, শিশুশিল্পী হিসেবে একটা সিরিয়াল করেছিলাম। সেখানে তরুণকুমার আমার দাদুর চরিত্রটা করেছিলেন, শঙ্কর চক্রবর্তী আমার কাকা, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ‘মেমবউ’-তে আমার বাবার চরিত্র করেছিলেন, উনিই আমার প্রথম সিরিয়ালে আমার বাবা হয়েছিলেন। চাইল্ড আর্টিস্ট হিসেবে শুরু করলেও আমার বাবা-মায়ের তখন ইচ্ছে ছিল না যে আমি মিডিয়ার জগতে থাকি। আমার বাবা একজন সায়েন্টিস্ট আর আমার মা ইন্ডিয়ান আর্মি অফিসার। বাড়ির সবাই চাইত, আমি অ্যাকাডেমিক্‌স-এ থাকি। আমারও ইচ্ছে ছিল জিওগ্রাফার হব, ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এর সঙ্গে যুক্ত হব। তাই মায়ের আর্মি-তে ট্রান্সফারের জন্য মুম্বইতে জিওগ্রাফিতে ভর্তি হয়েও চলে আসতে হয় কলকাতায়।

এখান থেকে আমার জীবনে শুরু হয় একটা নতুন ট্রানজিশন। ডেস্টিনি আমার হাত ধরে একটা অন্য দিকে নিয়ে যায়। তখন কলকাতায় অ্যাডমিশন প্রায় শেষ। লাস্ট মিনিটে লোরেটো কলেজে অ্যাডমিশন হয় কমিউনিকেটিভ ইংলিশ-এ। তার সঙ্গে ফিল্ম স্টাডিজ-এ মাইনর পড়তেই হয়। পরবর্তীকালে আমি এমএ করি মাস কমিউনিকেশনস অ্যান্ড জার্নালিজম নিয়ে। কলেজে ফিল্ম স্টাডিজ পড়তে পড়তে আমি ভীষণ ভাবে ইতালিয়ান ও ফ্রেঞ্চ সিনেমা নিয়ে অবসেশড হয়ে যাই। ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ আমার প্রিয় জ্যঁর ছিল। কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে, ১৭ বছর বয়সে অল ইন্ডিয়া এন্ট্রান্স দিলাম সিএনএন-আইবিএন-এর জন্য। ওই পরীক্ষায় টপ থ্রি-র মধ্যে আমি ছিলাম ইয়ংগেস্ট, বলতে পারো ইয়ংগেস্ট জার্নালিস্ট ইন ইন্ডিয়া। আর প্রথম দিনের প্রথম অ্যাসাইনমেন্টটাই ছিল ইন্ডিয়া টিম এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ইন্টারভিউ ইডেনে। সিএনএন-এ জার্নালিজম-এর সঙ্গে সঙ্গে বিবিসি-তে ফ্রিলান্সিং করতে শুরু করলাম। কলেজের সময় থেকেই শুরু হয় ওয়েস্টার্ন মিউজিকের কনসার্ট। আমার ১২ বছরের ক্লাসিকাল মিউজিক ট্রেনিংয়ের পরে কলেজে উঠে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকস, অলটারনেটিভ রক আর পপ শিখলাম। এইসবের মধ্যেও কোনওদিন অ্যাক্টিং নিয়ে ভাবিনি।   

সেখান থেকে অভিনয়ে এলে কীভাবে?

বিনীতা: সেটাই বলছি, খুব ইন্টারেস্টিং। গ্র্যাজুয়েশন আর মাস্টার্স ডিগ্রির মধ্যে ৩ মাসের গ্যাপ হয়। ওই সময়টায় মুম্বইয়ের ভিবজিওর ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সেই ৩ মাস পড়াই। কিন্তু পাশাপাশি অ্যাঙ্করিং ও গানের কনসার্ট করাটা ছাড়িনি। পরে যখন মাস কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম-এ এমএ করছি, সেই সময় একটা মেগা ইভেন্টে হেমা মালিনী-র উপর একটা অ্যাক্ট করেছিলাম। ওখানে স্টার টিভি-র সব হেড হঞ্চো-রা ছিলেন। ওঁদের এত ভাল লাগে আমার পারফরম্যান্স যে ওঁরা আমাকে অভিনয় করার একটা বড় সুযোগ দেন। ‘এক হাজারো মে মেরি বহনা হ্যায়’-এর মতো একটা জনপ্রিয় সিরিয়ালে আমায় একটা বাবলি পঞ্জাবি মেয়ের রোলে ফ্রেশ ফেস হিসেবে লঞ্চ করা হয়। আমি অ্যাকাডেমিক্যালি অনেক অ্যাওয়ার্ড জিতেছি। যেমন ইন্দিরা গাঁধী ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সেলেন্স ইন অ্যাকাডেমিক্স। তাই এবারও মা-কে প্রমিস করলাম, অ্যাক্টিং করতে যখন নেমেছি, তখন এখানেও একটা অ্যাওয়ার্ড নিয়ে আসব। জানুয়ারিতে আমার সিরিয়াল লঞ্চ আর মে মাসে আমি পেলাম ‘সিনেমা সেঞ্চুরি অ্যাওয়ার্ড’, ‘বেস্ট অ্যাক্টর ডেবিউ’-এর জন্য। সেই বছরেই পেলাম ফিকি অ্যাওয়ার্ড অ্যাজ ‘বেস্ট অ্যাক্টর ডেবিউ’। সবই ডেস্টিনির খেলা মনে হল, একেবারে স্বপ্নের মতো। তার পরে অনেক নন-ফিকশনও করেছিলাম টেলিভিশন অ্যাঙ্কর হিসেবে। চ্যাম্পিয়নস লিগ আর আইপিএল-এর চেন্নাই সুপার কিংস-এর আমি অফিসিয়াল প্রেজেন্টার ছিলাম। অমিতাভ বচ্চন, সিদ্ধার্থ মালহোত্র, অভিষেক বচ্চন, সোনু নিগম, বাপ্পি লাহিড়ি, প্রীতমদা, সেলিম-সুলেমান— সবার সঙ্গে ইন্ডিয়ার সবথেকে বড় শো-তে পারফর্ম করি। এমনকী হলিউডের পপুলার ব্যান্ড ‘অ্যাকসেন্ট’-এর সঙ্গে কোলাবরেট করি ভিএইচওয়ান ট্যুরের জন্য। এখনও পর্যন্ত দেশে এবং বিদেশে সব মিলিয়ে ১২০০ ইভেন্টস করেছি। 

‘অশোকা’-তে কর্ভকী চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছিলাম। তখন স্টার প্লাস থেকে আমাকে বলা হয় যে অ্যাক্রোপলিস একটা বাংলা সিরিয়াল করবে যেটার জন্য আমি একদম পারফেক্ট। স্নিগ্ধাদি একদিন আমায় স্টুডিওতে ডেকে মেকওভার করে ছবি তোলেন। আমাকে বলেছিলেন যে, এটা বিরাট বড় একটা অপরচিউনিটি। এটা যদি ক্লিক করে তবে শুধু কলকাতাতে নয়, পুরো বাঙালি ফ্রেটারনিটির মধ্যে এবং বিদেশেও তুমি এত জনপ্রিয় হয়ে যাবে যে ধারণা নেই। তোমার লাইফ বদলে যাবে। আর সত্যিই আমার লাইফ বদলে যায়। প্রোমো রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘মেমবউ’ একটা তুমুল আলোচনার ঝড় তুলে দেয়। বলা যায় সোশ্যাল মিডিয়ার বিগেস্ট বেঙ্গলি অবসেশন ওই সময়কার। আলোচনা-সমালোচনা-কনট্রোভার্সি— সব ‘মেমবউ’ নিয়ে। আমাদের বলা হয়, এনি কনট্রোভার্সি ইজ গুড কনট্রোভার্সি। তাই সেগুলো বন্ধ করার কোনও চেষ্টাই করিনি। আমি জানতাম পরে যখন আমার ইন্টারভিউ মানুষ পড়বে তখন তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে। একটি কোয়ালিফায়েড জার্নালিস্ট যখন একটা প্রজেক্টে অভিনয় করে, কিছু তো ভেবে করে। 

হ্যাঁ, সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচণ্ড ট্রলড হয়েছিলে। তাছাড়া অনেক দিন পর্যন্ত সবাই তোমাকে মোনালি ঠাকুর বলেই ভাবত, তোমার খারাপ লাগত কি? 

বিনীতা: হ্যাঁ, প্রচুর মিম তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মিমগুলো খুবই ব্রেনলেস, বুদ্ধিহীন ছিল। আমি সেন্স অফ হিউমরকে সব সময় অ্যাপ্রিশিয়েট করি। তার মধ্যে দু’একটা একটু স্মার্ট ছিল। আমার যেটা খারাপ লেগেছে যে কয়েকটি মিডিয়া হাউস সিরিয়ালটা শুরু হওয়ার আগে এত নেগেটিভ কমেন্টস করেছিল। কমেন্টস করা হয়েছিল উইগ নিয়ে, ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে বাংলা বলা নিয়ে, বাঙালি মেয়েকে বিদেশি মেকআপে সাজানো নিয়ে। এবং তাই নিয়ে আর্টিস্টকে দোষ দেওয়া হয়েছিল। এটা পুরোটাই ক্রিয়েটিভ ডিসিশন চ্যানেল এবং প্রোডিউসারের। আমরা অভিনয় করতে এসেছি। আমাদের যা সাজাবে, আমরা তাই সেজে অভিনয় করব। চরিত্রের জন্য যা করতে বলা হয়েছে আমি করেছি। উইগ, লেন্স, সারাক্ষণ ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে বাংলা বলা, এমনকী পরের দিকে উইগ সরিয়ে আমার নিজের চুলকে ব্লিচ করে দেওয়া হয় গোড়া থেকে। শুধু ক্যারল চরিত্রকে ভালবেসেছি বলেই অনেক কষ্ট সহ্য করেও আমি বার বার আমার চুলের রং করতে রাজি হয়েছি। ‘মেমবউ’ পরিবারের প্রত্যেকটি ফ্যামিলি মেম্বারের ভালবাসা, আদর এবং সাপোর্ট পেয়েছি। তাই সব সময় মনে হয়েছে কনট্রোভার্সিকে জবাব দেব ভাল পারফরম্যান্স দিয়ে। তাই পাঁচটার স্লটে যখন আমরা হায়েস্ট টিআরপি পাই, ‘মেমবউ’ ক্যাম্পে সেলিব্রেশন হয়। সবাই সবথেকে খুশি হয় যখন এই বছর স্টার জলসা পরিবার অ্যাওয়ার্ড-এ ‘মেমবউ’ টিম একটা অ্যাওয়ার্ড জেতে। যখন বেস্ট অ্যাক্টর ফর কমেডি অ্যাওয়ার্ডটা জিতে আমি ‘মেমবউ’-তে ফিরে আসি, আনন্দের মেলা তখন। এতদিনে কনট্রোভার্সির জবাব দিতে পেরেছিলাম আমরা এবং মানুষের ভালবাসাটাই আমাদের হার্ড ওয়র্ক-এর প্রাপ্তি। 

 

যারা লুক নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেগেটিভ কমেন্টস করেছে, ট্রল করেছে আর সিরিয়ালটা দেখার আগেই নিন্দা করেছে, তাদের কাছে আমার একটা ওপেন প্রশ্ন রইল। এর আগে কি কোনও ভারতীয় অভিনেতা বা অভিনেত্রী বিদেশি চরিত্রে অভিনয় করেননি? উইগ, অ্যাকসেন্ট ব্যবহার করেননি? উত্তমকুমার অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি চরিত্রে, সুচিত্রা সেন রিনা ব্রাউন চরিত্রে, সায়রা বানু-র মতো ক্লাসিক অ্যাক্টররা উইগ পরে, মেকওভার করে বিদেশি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তোমরা তাদের কী করে মেনে নিলে? সেখানে আমাকে কেন এত ট্রলড হতে হল? শুধুমাত্র আমি নতুন বলে? টিভি সিরিয়ালে যারা নাগিন সাজে, দেবী দুর্গা সাজে, তারাও তো উইগ পরে চরিত্রে অভিনয় করে। তাদের কী করে মেনে নাও? তাদের ট্রল করো না কেন? একটি নতুন মেয়ে একটি চ্যালেঞ্জিং চরিত্র প্লে করেছে তাই তাকে ট্রল করা হল। এটাকেই বলে হিপোক্রিসি! তোমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে আলোচনাই করো। তোমরা আমাদের সিরিয়ালের অডিয়েন্সও নয়। যারা টিভি অডিয়েন্স, যারা এপিসোডস দেখেছে, সবাই অ্যাপ্রিশিয়েট করেছে, ভালবেসেছে। এত ভাল একটা এক্সপেরিয়েন্স সব মিলিয়ে... ‘মেমবউ’ থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। আমি খুবই কৃতজ্ঞ।  

মেমবউ-এর পরে কী ভাবছ, কী করছ এখন? 

বিনীতা: একটা নতুন ছবি করছি। খানিকটা শ্যুটিং করেছি, বাকিটা দিওয়ালির পরে হবে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার আপকামিং ফিল্ম— ‘কলকাতা পেজ থ্রি’। একটু কনটেন্ট-বেসড ছবি। পরিচালক-প্রযোজক সবাই মুম্বইয়ের।আর একটা মিষ্টি কোইনসিডেন্স। আমার প্রথম ছবিতে দাদুর চরিত্র করেছিলেন তরুণকুমার, মেমবউ-তে দাদুর চরিত্র করলেন দুলাল লাহিড়ি আর তৃতীয় প্রজেক্টে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়— আমি ভীষণ ভাবে লাকি এই লেজেন্ডদের সান্নিধ্য পেয়ে। এছাড়া কিছু গানের প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি। খুব তাড়াতাড়ি একটা নতুন বড় প্রজেক্ট হতে চলেছে, সেটা এখন বলছি না। আর এখন আমি কাজ নিয়ে একটু সিলেক্টিভ হয়ে গিয়েছি। একটু ভাল কাজ, একটু সেনসিবল কাজ... দরকার হলে কম কাজ করব কিন্তু ভাল কাজ করব। 

তুমি মোটিভেশনাল স্পিকার হলে কবে থেকে? 

বিনীতা: আমি শুরু করেছিলাম করপোরেট অ্যাঙ্কর হিসেবে। তার পরে হয়ে গেলাম করপোরেট ট্রেনার। বিভিন্ন কলেজে, যেনন সেন্ট জেভিয়ার্স মুম্বই, নারসি মনজি ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদিতে আমি স্পিচ দিতে শুরু করলাম। খুব তাড়াতাড়ি হয়তো ‘টেড এক্স’-এ তুমি আমাকে স্পিচ দিতে শুনবে। একটি ইন্সপায়ারিং জীবনদর্শন দিয়ে যদি আমি আরও দশটা মানুষকে ইনস্পায়ার করতে পারি, তাতেই হবে আমার জীবনের সার্থকতা।