কাশ্মীরি পরিবারের মেয়ে ফেরিনা ওয়াজির তাঁর ছোটবেলাটা কাটিয়েছেন স্কটল্য়ান্ডে,  মডেল হিসেবেই তাঁর পরিচিতি ছিল প্রাথমিক ভাবে। বছর দশেক আগে, ঠিক শারদোৎসবের আগে সারা কলকাতা ছেয়ে গিয়েছিল তাঁর হোর্ডিংয়ে। একটি জুয়েলারি ব্র্যান্ড-এর অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তাঁকে প্রথম চিনেছিলেন বাংলার মানুষ এবং সবার মনে দাগ কেটে গিয়েছিল তাঁর সৌন্দর্য। ঠিক তার পরের বছরই লন্ডন ফিল্ম উৎসবে স্ক্রিনিং হয় তাঁর প্রথম ছবি, কেতন মেহতা-র ‘রং রসিয়া’। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ছবি ‘এয়ারলিফ্‌ট’। কলকাতায় এলেন সম্প্রতি কাজের সূত্রে এবং তারই ফাঁকে মুখোমুখি হলেন এবেলা ওয়েবসাইটের কিছু প্রশ্নের— 

কলকাতার সঙ্গে তো তোমার অনেকদিনের যোগাযোগ, এই শহর কীভাবে নাড়া দেয় তোমাকে? 

ফেরিনা: কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই আমাকে বার বার এই শহরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। যারা এই কিংবদন্তি শহরকে ভালবাসে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই যেমনটা ঘটে। আমি বলব, এই শহর ভারতের একেবারেই হাতে-গোনা মেট্রোগুলির অন্যতম, যেখানে ইতিহাসের নানা মণিমুক্তো যত্ন করে রাখা আছে। 

কেউ যখন এসে বলে, ফেরিনা তুমি যেন ডিভাইন বিউটি, ঠিক কেমন মনে হয় তোমার? 

ফেরিনা: আমার মনে হয় তাঁরা আমার মাধ্যমে তাঁদের ভিতরকার ডিভাইন বিউটিকেই শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। আমাদের সবার মধ্যেই সেই ডিভিনিটি রয়েছে, আমরা সেটা কতটা কীভাবে অন্যদের সামনে তুলে ধরছি, সেটাই আসল। একজন শিল্পী হিসেবে আমি অনেকটা সময় ধরে নিজেকে রিফাইন করেছি, ডেভেলপ করেছি। আর সেটা আমার কাজের মাধ্যমে যখন সকলের সামনে এসেছে, তখন সবার মনে হয়েছে— কী সুন্দর! আমার ভিতরে যে স্বর্গীয় সৌন্দর্য তারা দেখেছে, আসলে সেটা হয়তো তাদের ভিতরেই রয়েছে এবং সারা পৃথিবীর সামনে সেটা প্রকাশ করতে চায়। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

তুমি কি নিজেকে ‘ফেমিনিস্ট’ বলবে? 

ফেরিনা: ‘ফেমিনিস্ট’ শব্দটাকে কীভাবে ডিফাইন করছ, তার উপর নির্ভর করবে। যদি তুমি বলো মা দুর্গা, যিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন, তিনি একজন ফেমিনিস্ট, তবে আমিও নিজেকে ফেমিনিস্ট বলব। 

তুমি রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ ড্রামাটিক আর্টস বা রাডা-এর ছাত্রী ছিলে, থিয়েটার নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের অনেকের কাছেই ড্রিম ডেস্টিনেশন ওই ইন্সটিটিউট, তোমার ছাত্রজীবনের কিছু অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করো।

ফেরিনা: হ্যাঁ রাডা-র মতো একটি ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা করা অবশ্যই দারুণ সুযোগ। খুব আনন্দ করে, মজা করে কাটিয়েছি কিন্তু একই সঙ্গে বলব যে আমার এদেশের থিয়েটার শিক্ষকরা, অ্যালিক পদমসে এবং সত্যদেব দুবে... তাঁদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। ইন ফ্যাক্ট, আমি যখন রাডা-তে ছিলাম, সেখানকার একজন ফ্যাকাল্টি হেড আমাকে বলেছিলেন, ‘রাডা তোমাকে এমন কিছু শেখাবে না, যা তুমি ইতিমধ্যেই জানো না।’’ভারতের থিয়েটার এবং সামগ্রিক ভাবে শিল্পচর্চা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সেটাকে সঠিক ভাবে যত্ন করতে হবে, যেমনটা হয় ওয়েস্ট-এ। তাহলেই ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ বা ‘পুণে ফিল্ম ইন্সটিটিউট’-ও ড্রিম ডেস্টিনেশন হয়ে উঠবে। 

তুমি কি কোনওভাবে বলিউড সম্পর্কে হতাশ বা মেইনস্ট্রিম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে মিশে যেতে একটু সমস্যা হচ্ছে কি তোমার? 

ফেরিনা: ঠিক হতাশ বলব না। কারণ তার মানেটা দাঁড়াবে এমন যেন আমার কিছু ‘আশা’ রয়েছে বা ছিল। আসলে আমি কিছুই আশা করি না। যা ঘটছে সেটা উপভোগ করি... একজন অভিনেতা বা শিল্পী হিসেবে সেটা যেন ঠিক একটা অ্যাডভেঞ্চার। আমি বলব আমি যথেষ্ট লাকি যে একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুভিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। অবশ্যই বলিউডের মেনস্ট্রিম ইন্ডাস্ট্রির বেশ কয়েকজন সংবেদনশীল মানুষের সঙ্গে ভাল ভাবে মিশতে পেরেছি। আবার অনেকের সঙ্গে পারিনি, আর সেটা খুবই স্বাভাবিক। তবে এটা দেখে ভাল লাগছে যে এখন পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টাচ্ছে, নানা ধরনের বিষয়ে ভারতীয় দর্শকরা আগ্রহী হচ্ছেন। 

সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের ছবি বা অন্য কোনও বাংলা ছবি কি তুমি দেখেছ? 

ফেরিনা: অবশ্যই! বিশ্ব চলচ্চিত্রে যে পরিচালকেরা পথ দেখিয়েছেন প্রথম, তাঁদের মধ্যে তো বিশেষ জায়গায় রয়েছেন বাঙালি পরিচালকেরা। তাঁদের কাজ সারা পৃথিবীর ফিল্ম স্কুলগুলিতেই পাঠ্য।  যাঁদের ছবি দেখে আমার ফিল্ম মাধ্যমটা সম্পর্কে শেখা, তাঁদের মধ্যে সবার আগে বলব সত্যজিৎ রায়ের কথা। ওঁর ছবিতে যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই আমাকে ভীষণ ইন্সপায়ার করেন... ‘চারুলতা’, ‘পথের পাঁচালি’, ‘অপুর সংসার’, ‘অপরাজিত’... আমার মনে হয় অতীতে ওঁদের এই অবদানকে শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হল বর্তমানে ভাল কাজ করা।  নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমি প্রচুর বাংলা ছবি দেখার সুযোগ পাই। খুব ভাল লাগে আমার বাংলা ছবি দেখতে। সাম্প্রতিক পরিচালকদের মধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ-এর ছবি খুব ভাল লাগে, বিশেষ করে ‘বাড়িওয়ালি’-র কথা বলব আর সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতিস্মর’ আমার খুব ভাল লেগেছে।  

তোমার এখনকার কাজ সম্পর্কে কিছু বলো, কী কী প্রজেক্ট রয়েছে পাইপলাইনে? 

ফেরিনা: আমি তো কলকাতায় এখন সম্রাট চক্রবর্তীর সঙ্গে একটা শর্ট ফিল্ম শ্যুট করছি। এটা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে একটি সিরিজের একটা পার্ট। পরিচালক অমিতাভ কল। এর জন্য বাংলা শিখেছি, আর সেটা একটা বেশ মজার অভিজ্ঞতা।  এছাড়া সম্প্রতি দুবাইতে মানব ভল্লা-র ‘লাশতুম পাশতুম’ ছবির শ্যুটিং সেরে এলাম। ওই ছবিতে প্রয়াত ওম পুরী কাজ করেছেন, এছাড়া টিসকা চোপড়া, ডলি আলুওয়ালিয়া রয়েছেন। আর নন্দিতা দাস-এর ‘মান্টো’-তে নারগিস দত্তের ভূমিকায় অভিনয় করেছি— দারুণ লেগেছে কাজ করে।