তিনি কলকাতারই মানুষ। সেন্ট জেভির্য়াস কলেজিয়েট স্কুল (বউবাজার)-এর ছাত্র। পরে মৌলানা আজাদ কলেজে, ইতিহাসে নিয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। কিন্তু বর্তমানে তিনি প্রযোজক, অ্যাসরটেড মোশন পিকচার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা। বলিউড লেজেন্ড হেমা মালিনীকে নিয়ে লেখা তাঁর বই ‘হেমা মালিনী: দিভা আনভেইলড’ কলাকার অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয় ২০০৫ সালে। বর্তমানে এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বকে নিয়ে তাঁর দ্বিতীয় বই প্রকাশের পথে। এছাড়া গত বছর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছোট গল্পের সংকলন ‘লং আইল্যান্ড আইসড টি’। ২০০৬ সালে লায়ন্স ক্লাব, মুম্বই তাঁকে সেরা সাংবাদিকের সম্মাননা প্রদান করে। 

সেই বহুমুখীপ্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব রাম কমল মুখোপাধ্যায় এবেলা ওয়েবসাইটকে দিলেন একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার। সাংবাদিকতা থেকে প্রযোজনা, টেলিভিশন থেকে সিনেমার সাম্প্রতিক ট্রেন্ড-কনটেন্ট, সবই ধরা পড়ল কথোপকথনে— 

একজন এন্টারটেনমেন্ট জার্নালিস্ট হিসেবে তো আপনার কেরিয়ার শুরু, এই বিশেষ ক্ষেত্রের সাংবাদিকতা কতটা কঠিন? 

কলকাতায় যখন শুরু করেছিলাম তখন অন্যরকম ছিল। কলকাতায় আমার প্রথম কাজ ‘এশিয়ান এজ’-এ। সেখানে এন্টারটেনমেন্ট ডেস্কে ছিলাম। অনেক ধরনের রিভিউ, ইন্টারভিউ করার সুযোগ পেয়েছিলাম এবং কলকাতায় বসেই আমি বম্বের অনেক স্টোরি করতাম। তখন যে ধরনের জার্নালিজম হতো, সেই তখন আর এখনের মধ্যে ২০ বছরে অনেক কিছু পাল্টে গিয়েছে। তখন আমাদের পিআর, এজেন্সি বা মিডিয়া ম্যানেজারদের মাধ্যমে যেতে হতো না। আর তখন সোশ্যাল মিডিয়াও ছিল না। 

তাই সরাসরি ফ্যানেদের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে আর্টিস্টদের কাছে একটাই মাধ্যম ছিল— নিউজপেপার বা ম্যাগাজিনস। টিভিতেও তখন এন্টারটেনমেন্টের এত অনুষ্ঠান ছিল না। এখন সবকিছু মেপেজুপে কথা বলতে হয়। নাহলে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা খুব রেগে যান, পরিচালক-প্রয়োজকরা খুব রেগে যান, সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়, ইন্টারভিউ দেওয়া বন্ধ করে দেন। তাঁরা বন্ধ করার আগেও পিআর-রা কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আবার অনেক সময় কোনও কাগজ বা চ্যানেল ব্ল্যাকলিস্টেড হয়ে যায়, তাদের সম্পর্কে কিছু খারাপ লিখলে। এগুলো তো অনেক বেশি চোখে পড়ে, তখন এতটা পড়ত না। 

এখন কাজটা অনেক কঠিন, তাই তো? 

কাজটা কঠিন কিন্তু কেউ কিছু করতে পারছে না। এখন যদি এমন একটা আর্টিকল লেখা হয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে, যেটা তাদের স্তুতিবন্দনা নয়, সেটা পড়ে তাঁরা কিন্তু খুব রেগেই যান এবং রেগে যাওয়ার প্রতিফলন এটাই হয় যে তাঁরা কথা বলা বন্ধ করে দেন। ইভেঞ্চুয়ালি কোথাও গিয়ে সাংবাদিকদের তাঁদের একটা ভাল রিলেশনশিপ রাখতে হয়। এটা এখন একটা রিলেশনশিপ অফ কনভিনিয়েন্স হয়ে গিয়েছে, রিপোর্টিং অফ ট্রুথ ব্যাপারটা আর নেই। 

ছবি সৌজন্য: অ্যাসরটে়ড মোশন পিকচার্স

সেটা তো নিশ্চয়ই ভাল লাগে না আপনার। 

না, এবং সেই কারণেই আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি যখন ‘স্টারডাস্ট’-এর এডিটর ছিলাম, প্রায় চার বছর... আই হ্যাড মাই ফ্রিডম, আমার যেভাবে মনে হয় লিখতে পারতাম। আর আমার সঙ্গে আর্টিস্টদের যে হৃদ্যতা ছিল, সেটা এই জন্য যে আমি সত্যিটা সত্যি লিখতাম, মিথ্যেটাকে মিথ্যে বলতাম। বানিয়ে লেখা বা ব্যক্তিগত ভাবে কাউকে আঘাত করা, সেটা আমি কখনও করিনি। আমি বোধহয় লাস্ট জেনারেশন অফ জার্নালিস্টস, যাদের সঙ্গে আর্টিস্টদের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এর পরে মনে হয় না কোনও জার্নালিস্টের কাছে আর্টিস্টের নাম্বারও আছে বা তারা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে বা আর্টিস্টরা তাদের সঙ্গে কথা বলে সরাসরি।

এতদিন ধরে যে বলিউড কভার করেছেন, এতজন লেজেন্ডকে এত কাছ থেকে দেখেছেন, এটা কতটা থ্রিলিং?

ইট ইজ থ্রিলিং। বম্বেতে এসে যখন আমি মিট করলাম অমিতাভ বচ্চন, হেমা মালিনী, রেখা, শ্রীদেবী, ধরমজি বা শত্রুঘ্ন সিংহকে... এঁদের ছবি দেখে তো আমরা বড় হয়েছি। এঁদের সকলের মধ্যেই একটা জিনিস দেখেছি। এঁরা না সবাই খুব সহজ, সাবলীল ভাবে কথা বলেন। এঁদের মধ্যে কোনও মেকী ব্যাপার নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেকের কথা শুনলেই মনে হয় যেন পুঁথি পড়ে এসেছে। সবাই যেন একই রকম কথা বলে। অভিনয়ের এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে যা বলবে, পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা বা সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা, সবটাই যেন একই রকম শোনায় আমার কাছে। নতুন কোনও স্বাদ পাই না, যেটা আমি শেষ পেয়েছি বোধহয় শাহরুখ খানের ইন্টারভিউতে। হি ইজ ভেরি অনেস্ট। আর নতুন প্রজন্মের মধ্যে রণবীর কপূর, রণবীর সিং, বরুণ ধবন, সোনম কপূর, দীপিকা— এই জেনারেশনের মধ্যে অনেক বেটার ইন্টারভিউ দেন। অন্তত কিছু সাংবাদিকের সামনে অত্যন্ত সাবলীল এবং ভাল। 

হেমা মালিনীকে নিয়ে লেখা আপনার বইয়ের সম্পর্কে যদি কিছু বলেন। 

এটা হেমা মালিনীজিকে নিয়ে লেখা আমার দ্বিতীয় বই, হারপার কলিন্স থেকে। হেমাজির অভিনয়জীবন ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রসঙ্গ তো থাকছেই, তাছাড়া তিনি রাজনৈতিক জীবনে যে অনেক বেশি সফল হয়েছেন বা প্রযোজক-নির্দেশক-সমাজসেবী হিসেবেও সফল, সেই প্রসঙ্গগুলো থাকছে। তাছাড়া তিনি এখন গান শিখছেন, নতুন অ্যালবাম প্রকাশ করার পরিকল্পনা চলছে, সেটা থাকছে। দুই মেয়েরই বিয়ে হয়ে গিয়েছে, উনি এখন বলতে গেলে দাদী হয়ে গিয়েছেন— সেই পুরো জার্নিটা, এটা একটা কমপ্লিট বুক অন হেমা মালিনী। 

ছবি সৌজন্য: অ্যাসরটে়ড মোশন পিকচার্স

আপনি তো বললেন একটা সময় সাংবাদিকতা আপনার ভাল লাগছিল না বেশ কিছু কারণে, সেই কারণেই কি আপনি প্রযোজনায় গেলেন? 

মধ্যিখানে আমি একবার সাংবাদিকতা থেকে ব্রেক নিই, প্রীতিশ নন্দী কমিউনিকেশন জয়েন করি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ওখানে আমি ১২টা ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সেটা করতে করতেই আবার ‘স্টারডাস্ট’ ডেকে নেয় সম্পাদক হিসেবে। ওই সময়টা কিন্তু ভালই এনজয় করি, নতুন প্রজন্মের তারকাদের সঙ্গে ইন্ট্যার‌্যাক্ট করে— রণবীর-দীপিকা-সোনম-আলিয়া... সো ইট ওয়াজ ফান। তার পরে একটা সময় মোনোটনি তো এসেই যায়। ওই গুটিকতক কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই তো মেকী কথা বলে। সেটা নিয়ে আর কতক্ষণই বা চর্চা করা যেতে পারে। ওই করতে করতেই আমার খুব ভাল বন্ধু রাজশ্রী ওঝা, তিনি একটা সময় আমাকে বললেন যে আমি জি টিভি-তে একটা সিরিয়াল করতে চাই, তুমি যদি আমার সঙ্গে কাজটা করো। তার পরেই প্রযোজনায় আসা। উনিই আমাকে নিয়ে গেলেন, চ্যানেলের সঙ্গে কথা হল, আমাদের প্রজেক্টটা অ্যাপ্রুভড হল। আমাদের ধারাবাহিকের নাম ‘বিন কুছ কহে’। 

সম্প্রতি একটা কথা খুব শোনা যায় যে সিনেমা বা টেলিভিশনের জগতে কোয়ালিটি কনটেন্টের খুব অভাব, সেই বিষয়ে আপনার কী মনে হয়? 

আমি এটাতে পুরোপুরি সহমত। তাই আমার সিরিয়াল হল ৬ মাসের। তাই গল্পটাকে অকারণে ইলাস্টিকের মতো বাড়িয়ে, যার মধ্যে কোনও স্বাদ নেই, তেমনটা আমি করছি না। এটা ৬ মাসের সিরিয়াল, শ্যুটিংই হয়েছে সিনেমার মতো করে। আমরা শুরুটা আর শেষটা জানতাম। গল্পটা রাজশ্রীর লেখা, কাস্টিং আমার। কনটেন্ট কখন সাফার করে? যখন তাড়াহুড়ো থাকে, ডেডলাইন থাকে আবার যখন গল্প নেই তবুও লিখতে হচ্ছে গল্প, অকারণে সিনটাকে টেনে টেনে বড় করা— এইগুলো থাকলে কনটেন্ট খারাপ হয়ে যায়। এখানে সিন খুব কমপ্যাক্ট রাখা হয়েছে কারণ আমাকে ৬ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। এটাকে বলা হয় ‘ফাইনাইট সিরিজ’। এটা ভীষণই একটা আমেরিকান কনসেপ্ট, যেটা ধীরে ধীরে মনে হয়, ভারতীয় টেলিভিশনে চলে আসবে, ওই সোপ বা মেগা ব্যাপারটা চলে যাবে। এই ফাইন আর্ট সিরিজ আমেরিকাতে খুব হয়, সিজন ওয়ান, সিজন টু এভাবে। আমার মনে হয় আরও এক দু’বছরের মধ্যে এই ট্রেন্ডটাই ডমিনেট করবে। 

বাংলা টেলিভিশনের ক্ষেত্রে কিন্তু এই সিজন ব্যাপারটা আসতে চলেছে। শোনা যাচ্ছে, জি বাংলা-র খুব জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘গোয়েন্দা গিন্নি’-র সিজন টু শ্যুট করা হবে। 

ওইরকমই করা উচিত। একটা ব্র্যান্ড তৈরি করে নিয়ে ৬ মাস, ৬ মাস করে চালানো উচিত। তাতে অডিয়েন্সেরও একটু মুখ পাল্টায়, যারা কাজ করছে তারাও একটু নিঃশ্বাস নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা করতে পারে। যদি মোমবাতির সলতের উপরটাও জ্বালিয়ে দাও আর নীচটাও জ্বালিয়ে দাও, তাহলে মোমবাতিটা তো খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাবে। মোমবাতিটাকে জ্বালানোর জন্য তো একটু গ্যাপ দিতে হবে। আ ক্রিয়েটিভ থিং ইজ লাইক বার্নিং ইওর ব্রেন। সো তুমি কনস্ট্যান্টলি কাজও করে যাচ্ছ আবার ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে ভেবে যাচ্ছ, তা তো হয় না। তাছাড়া আমার যে প্রোডাকশন হাউস, অ্যাসরটেড মোশন পিকচার্স, যেখানে আমরা তিন জন আছি, আমি, সর্বাণী মুখোপাধ্যায় ও অরিত্র দাস। আমরা তিন জন মিলে অনেকগুলো শর্ট ফিল্ম, একটা মরাঠি ফিল্ম আর একটা বাংলা ফিল্ম করতে চাই। বাংলা ফিল্মটা তো মোটামুটি লকড হয়ে গিয়েছে কিন্তু সেটার এখন আমরা নাম নিতে পারব না। খুব টপ অ্যাক্টরদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। খুব নিটোল একটা সুন্দর ঘরোয়া বাঙালি গল্প, সেট ইন দার্জিলিং। কিন্তু আমি ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে একটু চিন্তায় আছি। আমি তো মুম্বইতে বেসড, বাংলায় কীভাবে ছবিটার ডিস্ট্রিবিউশন হবে, সেই নিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা চলছে। এছাড়া শর্ট ফিল্মের গল্পগুলো ঠিক হয়ে গিয়েছে, তবে কাস্টিংটা এখনও হয়নি।  

ছবি সৌজন্য: অ্যাসরটে়ড মোশন পিকচার্স

টেলিভিশনের কনটেন্ট নিয়ে তো আপনি বললেন, সিনেমার কনটেন্ট নিয়ে যদি কিছু বলেন...

দেখো, আমি তো বাংলায় খুব সিলেক্টেড ছবি দেখি। সৃজিত বা শিবপ্রসাদের সিনেমা, যা মুম্বইতে আসে, সেগুলো তো আমার ভালই লাগে দেখতে কিন্তু আমার মনে হয় যে বাংলা বলো বা হিন্দি বলো, এবার একটু সময় এসেছে, অন্য রকম ভাবনাচিন্তা করে সিনেমা বানানোর। পুঁথি পড়ানোর মতো করে যদি সিনেমা বানানো হয় যে অডিয়েন্স কিচ্ছু বুঝতে পারবে না, সবকিছুই তাকে আঙুল দিয়ে বলে বোঝাতে হবে, ওরকম সিনেমা এখন মনে হয় না করাই ভাল। কারণ আজকের জেনারেশন বেশ ইন্টালিজেন্ট। তারা উহ্য কথাও বুঝতে পারে এবং তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার মতো করে সিনেমা বানানোর কোনও প্রয়োজন নেই। আর তাছাড়া আমার বিনীত অনুরোধ, ওই সাউথের সিনেমার রিমেক করা যদি সবাই বন্ধ করেন, সেটা হিন্দিই হোক বা বাংলাই হোক, তবে আমি ভীষণ খুশি হব কারণ এখন সাউথ এমন একটা জায়গায় চলে গেছে ‘বাহুবলী’-র পরে, আর কপি করা উচিত নয়। আমার মনে হয়, সেটা খুব লজ্জাজনক হয়ে যাবে। ওই ছবিটা দিয়ে ওরা এমন একটা বেঞ্চমার্ক সেট করেছে যে এবার কম্পিটিশনের কথা যদি বলো, তবে উই শ্যুড ক্রিয়েট সামথিং বিগ, নাইস অ্যান্ড ইন্টালিজেন্ট। দেব আমাকে খুব সুন্দর করে বলল, ‘আমাজন অভিযান’ নাকি বাংলা সিনেমার উত্তর হবে ‘বাহুবলী’-কে। আমার সেটা শুনে খুব ভাল লাগল। এই কনফিডেন্সটা যে আছে, দিস ইজ হোয়াট আই ওয়ান্ট। এটা থাকলেই আমার মনে হয়, অনেক বেশি এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে।