মাঠে ভীষণ এনার্জি আর হার না মানা মনোভাব নিয়ে নামেন আপনি। জানতে ইচ্ছা করছে কীভাবে ব্যাটারি রিচার্জ করেন? বিরাট কোহলিকেও তো কোথাও একটা বিশ্রাম নিতে হয়। সেটা কীভাবে করেন?
বিরাট কোহলি: সত্যি বলতে কী, সেটা করাটা খুব কঠিনই হয়ে যায়। একটা রুটিনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। মিশে গিয়েছি। সেটা ছেড়ে বেরোতে ইচ্ছা করে না। শুধু রুটিনটা দেখলেই তো হবে না বা কতটা পরিশ্রম করতে হচ্ছে, সেটা দেখলেই তো চলবে না। এই রুটিনটার হাত ধরে কী কী আসছে, সেটাও মাথায় রাখতে হবে। কখনও-সখনও অবাক লাগতে পারে যে, একই রুটিন কী করে অনুসরণ করে যাচ্ছি। কিন্তু ঠিক আছে। আমার অভিযোগ নেই।

কিন্তু টানা খেলার ফাঁকে একটু শ্বাস নেওয়ার দরকারও তো পড়ে। মানে এটা তো মনে হতেই পারে যে, গিয়ে একটু হেঁটে আসি অন্তত। তখন কী করেন? 
কোহলি: ভারতের বাইরে খেলতে গেলে সেটা সম্ভব হয়। তখন ইচ্ছা হলেই আমি রাস্তায় বেরিয়ে হেঁটে আসতে পারি। রেস্তোরাঁ বা কাফেট্যারিয়ায় গিয়ে সময় কাটাতে পারি। ভীষণ তরতাজা লাগে সেটা করতে পারলে। ভীষণ রিফ্রেশিং। কিন্তু ভারতে থাকলে সেটা সম্ভব হয় না। অথবা সম্ভব করতে হলেও অনেক ঝক্কি নিতে হবে সেটা অর্গ্যানাইজ করতে। যাতে মানুষ আমাকে দেখতে না পায়। লুকিয়ে কোথাও যেতে হবে। সেটা একমাত্র হয় যদি আমি বাড়িতে থাকি। মানে সিরিজের মাঝে কোনও ফাঁক থাকল, দু’তিনদিনের জন্য বাড়ি ফিরে আসতে পারলাম। তখন হাত-পা ছড়িয়ে থাকা যায় বেশ। সেটা করতে বেশ ভালও লাগে। 

অন্যান্য খেলার কিংবদন্তিদের দেখার ব্যাপারেও আপনার খুব আগ্রহ। তাঁদের সঙ্গে আপনার দেখাও হয়ে যাচ্ছে। এই যেমন লুইস ফিগোর সঙ্গে দেখা হল কয়েকদিন আগে। বা রজার ফেডেরারের সঙ্গে দেখা করেছেন। অন্য খেলার কিংবদন্তিদের থেকে কী কী শিক্ষা নেন আপনি?
কোহলি: প্রথম কথা হচ্ছে, এটা ভাবতেই আমার কেমন অবিশ্বাস্য লাগে যে, লুইস ফিগোর পাশে দাঁড়িয়ে আছি। তাঁর মতো কিংবদন্তি ফুটবলারের সঙ্গে কথা বলছি। উইম্বলডনে যখন গিয়েছিলাম, থিয়েরি অঁরির পাশে বসে খেলা দেখেছিলাম। ছোটবেলায় গোল-গোল চোখে তাকিয়ে ওঁদের ফুটবল দেখেছি আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থেকেছি। স্বপ্নের সেই নায়কদের কাছাকাছি আসার বা তাঁদের সঙ্গে কথা বলার ঘোরটাই তাই কাটতে চায় না। রজার ফেডেরারের সঙ্গে দুবাই বা উইম্বলডনে দেখা হওয়াটাও একইরকম অবিশ্বাস্য লাগে। এই সব কিংবদন্তিদের সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতা আমার পক্ষে ভাষায় বর্ণনা করাই কঠিন। 

কেন? কঠিন কেন?
কোহলি: তার কারণ হচ্ছে, আমার হৃদয়ের মধ্যে আমি এখনও দিল্লির মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা সেই ছেলেটা। আমার মস্তিষ্কের মধ্যে আমি এখনও একইরকম আছি। আমার বন্ধুদের কাছে আমি সেই পুরনো বিরাটই আছি। কোনও কিছুই পাল্টায়নি। তা সে আমার বাইরের পৃথিবী যতই পাল্টে গিয়ে থাকুক। ইনফ্যাক্ট, ভিতরে-ভিতরে আমি নিজেকে সেই ছেলেটাই মনে করি, যে দিল্লির ক্লাব ক্রিকেটে খেলে চলেছে। সেই কারণেই যখন কোনও লুইস ফিগো বা রজার ফেডেরারের সঙ্গে আমি দাঁড়িয়ে কথা বলি, কেমন একটা যেন লাগে। কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা অবিশ্বাস মিলিয়ে একটা ঘোর লাগার মতো অনুভূতি তৈরি হয়। আমি সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার ভাষা হারিয়ে ফেলি। বুঝেই উঠতে পারি না, আমি কী বলতে পারি!

নিজে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত তারকা হওয়ার পরেও এটা মনে হয়? সত্যিই অভিনব! 
কোহলি: ওঁদের কাছে হয়তো আমি ভারতের একজন সফল খেলোয়াড়। যে তার খেলায় ভাল করছে, অনেক ভক্ত-টক্তও হয়তো বানিয়েছে। কিন্তু আমি জানি, আমার কাছে ওঁদের স্থানটা কোথায়। কিশোর অবস্থায় ওঁদের ঘিরে আমার যে স্মৃতি, যেটা সঙ্গে করে নিয়ে আমি বড় হয়েছি, সেটা কখনও হারিয়ে যেতে পারে না। আমি বরাবরই অন্যান্য খেলা দেখি আর সেই সব খেলার সফলদের থেকে প্রেরণা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যেমন, রজার ফেডেরারের মতো কেউ। আমার ফেভারিট টেনিস প্লেয়ার। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো আমার ফেভারিট ফুটবলার। শুধু ওঁদের খেলাটাই যে ভাল লাগে, তা নয়, যেভাবে অনুশাসন আর কঠোর পরিশ্রম করে ওঁরা নিজেদের এই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। যেরকম শৃঙ্খলা আর খিদে ওঁরা নিজেদের খেলায় এনে দিয়েছেন, সেটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ফেডেরার সতেরোটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন। আমি আর কোনও ক্রীড়াবিদকে জানি না, যাঁর ভাল সময় বা সেরা সময় এতটা দীর্ঘমেয়াদি হয়েছে। সাত-আট বছর ধরে কেউ ফেডেরারের ধারেকাছে পর্যন্ত আসতে পারেননি। বড় কোনও চোট-আঘাত ছাড়া এত দীর্ঘ সময় ধরে ফেডেরার যেভাবে সেরার উচ্চতায় থেকে গিয়েছেন, অবিশ্বাস্য! এত তীব্র, ফিটনেস-নির্ভর একটা খেলায় এই ধারাবাহিকতা ভাবাই যায় না!

আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে ভাল লাগার কারণ?
কোহলি: রোনাল্ডোকে মানুষ খুব ভুল বুঝেছে। খুব ‘মিসআন্ডারস্টুড ক্যারেক্টার।’ জীবনে অনেক আত্মত্যাগ করে আজ ও এই জায়গায় পৌঁছেছে। আমি যতটুকু শুনেছি, ওর খেলায় অন্য যে কারও চেয়ে রোনাল্ডো অনেক বেশি পরিশ্রম করে। সাফল্য কীভাবে ধরে রাখব, সেটা নিয়ে ওর নিজের তৈরি করা শৃঙ্খলা আর অনুশাসন আছে। কারও বলে দিতে হয়নি। সেটা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। রোনাল্ডোর মতো চরিত্ররা সকলের কাছে প্রেরণা। যে কোনও খেলা যারা ভালভাবে খেলতে চাইছে, তাদের কাছে উদাহরণ। আমিও ওদের দেখে শেখার চেষ্টা করি আর যখনই ফেডেরার বা ফিগোর মতো কিংবদন্তির পাশে আসার সুযোগ হয়, দিল্লির মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই কিশোরের গোল-গোল চোখ নিয়ে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি! 

শুধু যে নিজে অন্য খেলার তারকাদের সঙ্গে আপনি দেখা করছেন, এমন নয়। আপনার ব্যাটিং দেখে অন্য খেলার তারকারাও টুইট করছেন। সেটা দেখে কেমন লাগে?
কোহলি: হ্যারি কেন টুইট করেছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটার পরে। আসলে ফুটবল বা টেনিসের মতো ক্রিকেট গ্লোবাল স্পোর্ট নয়। তাই গড়পরতা ধারণাটা হচ্ছে, বহির্বিশ্বে খুব বেশি লোক হয়তো এই খেলাটা দেখছে না। বিশেষ করে আমাদের ধারণা হয়ে গিয়েছে যে, আমরা যে খেলাটা খেলি, সেটা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় খুব একটা আগ্রহ নেই। আর এটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার একটা কারণ মনে হয়েছে। যে সব দেশে ক্রিকেট খুব একটা খেলা হয় না বা খুব জনপ্রিয় নয়, সেখানকার মানুষ ক্রিকেট খেলাটা বুঝতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। অনেক নিয়মকানুনও তো আছে আমাদের খেলাটার। সেগুলো না জানলে ক্রিকেট দেখেও তো কেউ কিছু বুঝতে পারবেন না। কিন্তু ইংল্যান্ডে সেরকম নয়। ওখানে সবাই বড়ই হয় ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে খেলতে। তাই ওঁরা দু’টো খেলাই বোঝেন। হয়তো দু’টোই দেখেন। হ্যারি কেন টুইট করার পরে প্রথমে আমার এক বন্ধু সেটার ছবি তুলে পাঠায়। আমার মনে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, আসল হ্যারি কেন কি না? টুইটার হ্যান্ডেল ভাল করে দেখে বুঝতে পারি যে, ইপিএলের সর্বোচ্চ স্কোরারই টুইট করেছে। আসল হ্যারি কেন-ই। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ আমরা পাগলের মতো দেখি। একেবারে ভক্তের মতো দেখি। ইপিএলের সফলতম গোল স্কোরার টুইট করছে, ফুটবলের মতো গ্লোবাল স্পোর্টের তারকা প্রশংসা করছে দেখে সত্যিই খুব আনন্দ হয়েছিল। অন্য একটা খেলার তারকা আমার খেলা দেখছে, এটা জানতে পারার অনুভূতিটাই খুব স্পেশ্যাল। আর সেটা যদি হয় হ্যারি কেনের মতো কেউ— যে কি না নিজে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সেরা পারফরম্যান্স করে দেখাচ্ছে, তাহলে আরওই ভাল লাগে। ইপিএলে যারা সফল হয়, তারা অন্য লেভেলের খেলোয়াড়। লিগটা এত সংঘর্ষপূর্ণ আর তীব্রতায় ঠাসা। একটা ম্যাচও সহজ নয়। সারা পৃথিবী দেখছে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, আবেগের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ইপিএলে খেলার চাপটাই আলাদা। টিম ভাল না করলে লোকে মারমুখী পর্যন্ত হয়ে যায়। হিংসাত্মক হয়ে পড়ে। তাই ফুটবলারদের ওপর চাপটা কী অমানুষিক থাকে, সহজেই অনুমান করা সম্ভব। সেই লিগে সফল একজন ফুটবলার টুইট করল দেখে আমার কাছে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের সেই পারফরম্যান্সটার অর্থ আরও বেড়ে গিয়েছিল। 

(চলবে)