‘‘বাংলা সিরিয়ালের শ্যুটিং বন্ধ। বেশ হয়েছে, আপদ চুকেছে!’’ মেগা সিরিয়ালের উপর দীর্ঘদিনই ঝরে পড়ছে বহু ‘শিক্ষিত’ বাঙালির অভিশাপ। এ বার সিরিয়ালের রিপিট টেলিকাস্ট চালু হওয়ায় ফেসবুকের ‘খাপ পঞ্চায়েত’-এ সেই ‘জ্ঞানগর্ভ’ অভিশাপ তীব্রতর হয়েছে।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

অভিশাপ কার্যত বদলে গিয়েছে উল্লাসেও। ‘সিরিয়াল কিলার’-দের কেউ বলছেন, ‘‘ভয়ানক সিরিয়ালগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়াটা অবিলম্বে দরকার।’’ কারও বক্তব্য, ‘‘ধুমতানানানা আর না!’’ এমনকী, যখন বহু মানুষের রুজি-রোজগার বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি হচ্ছে, তখনও তাঁদের বক্তব্য ‘‘বোমা কিংবা মাদকের ব্যবসা থেকে যাঁদের জীবিকা নির্বাহ হয়, তাহলে তাঁদেরও সাপোর্ট করা উচিত।’’ সব মিলিয়ে আর্টিস্ট ফোরাম বনাম প্রযোজক দ্বৈরথের জেরে বাংলা মেগা সিরিয়াল সম্প্রচার খানিক বেকায়দায় পড়তেই উদ্বাহু বাংলার ‘প্রাজ্ঞ’ ফেসবুক মহল।

একই সঙ্গে রয়েছে এই মেগা সিরিয়ালের যাঁরা মূল ভোক্তা, বাড়ির সেই মহিলাদের খাটো করার প্রবণতা। যে ‘বুদ্ধিজীবী’ বাঙালি যখন প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই আজ আর আম জনতার কাছে পৌঁছতে পারছে না, তখন তার অপরকে হীন প্রতিপন্ন করার মধ্যে কি আসলে লুকিয়ে রয়েছে নিজেরই ব্যর্থতা? কিংবা সেই ব্যর্থতা থেকে জন্ম নেওয়া প্রবল হতাশা।

ভেবে দেখা যেতে পারে উলটো দিক থেকেও। অধিকাংশ মেগা সিরিয়ালের বিষয়বস্তু যে উৎকৃষ্ট মানের নয়, তা কারও বক্তব্য হতেই পারে। কিছু দিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর বক্তৃতায় এই বিষয়বস্তু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তোলেন। কিন্তু গুণমানে খারাপ হয়েও সে সব স্টোরিলাইনই এপিসোডের পর এপিসোড চলছে কেন? একটি কথোপকথন প্রসঙ্গে সারকথা এই ফেসবুকেই জানিয়েছেন বাংলা টেলিভিশনেরই দীর্ঘদিনের চিত্রনাট্যকার অনুজা চট্টোপাধ্যায়।

অনুজা চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘একটা চ্যানেল যখন একটা শো লঞ্চ করবে ঠিক করে, গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র, পুরুষ-নারী, কিশোর-বৃদ্ধ নানা স্তরে এক্সটেন্সিভ রিসার্চ করে। কারণ তারা ব্যবসা করতে এসেছে। এমন কোনও প্রোজেক্ট তারা লঞ্চ করবে না, যা দর্শক নেবে না, যা থেকে আখেরে আর্থিক ক্ষতি হবে, বা যা প্রি-ম্যাচিওরড অবস্থায় বন্ধ করে দিতে হবে। রিসার্চে যা উঠে আসে, তারা সেটাকেই অনুসরণ করে। ফেসবুকের শিক্ষিত, সচেতন, বুদ্ধিমান দর্শক যা বলেন, যা ভাবেন, টার্গেট অডিয়েন্স প্রায়শই তার সম্পূর্ণ উলটোটা ভাবেন ও বলেন। ফল হাতেনাতে পাওয়া যায়। রমরমিয়ে টিআরপি হয়। বিষয় নির্বাচন প্রোডিউসর করেন না। করে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। তাঁরা নির্বাচিত কাজটি এগজিকিউট করার বরাত দেন প্রোডিউসরকে। তথাকথিত সুস্থ রুচির শো চালানোর চেষ্টা হয়েছে যত বার, প্রতি বার তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ‘চ্যানেল আট’ নামক একটি চ্যানেলে লাগাতার বাংলা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নানা গল্প উপন্যাস নিয়ে সিরিয়াল হয়েছে। এখনও হয়, রোজ। কেউ দেখেনি। দেখে না... এই হল বাংলা সিরিয়ালের দর্শক ও তাঁদের রুচি। এই বাঙালিই আবার খারাপ কনটেন্টের অজুহাতে হাজার হাজার টেকনিশিয়ানের ভাত বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনায় উল্লাসে নৃত্য করে। এত ভণ্ডামি অন্য কোনও জাতির মধ্যে বিরল!’’


অনুজা চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য। ছবি: ফেসবুক থেকে

এর পরে তিনি আরও বলেন, ‘‘...আপনারা যতই চেঁচামেচি করুন, যতই ফেবুর ঘোলা জলে সুনামি তুলুন, তাতে বাংলা সিরিয়ালের কন্টেন্টে বিন্দুমাত্র পরিবর্তনও আসবে না। সিরিয়াল দেখা যাচ্ছে না কারণ, যে কোনও ইন্ডাস্ট্রির মতো এখানেও এমপ্লয়ি ও এমপ্লয়ারের মধ্যে আর্থিক ও সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত কিছু মতপার্থক্য হয়েছে। সে সব মিটে গেলে আবার সিরিয়াল দেখা যাবে। এবং আপনাদের বিপন্ন ইন্টেলেক্টকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে কনটেন্ট তাই-ই থাকবে, যা টার্গেট অডিয়েন্স দেখতে চান।’’


অনুজা চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য। ছবি: ফেসবুক থেকে

কাজেই বঙ্গীয় ফেবুজীবীদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে শীঘ্রই চালু হবে শ্যুটিং, আবার শুরু হবে তাঁদের প্রিয় সিরিয়ালের নতুন এপিসোডের টেলিকাস্ট, এই আশায় ছাপোষা বাঙালি। চাহিদা তাঁদের এইটুকুই, তা সে বাঙালি বুদ্ধিজীবী ফেসবুক শিবিরের চোখে তাঁরা যতই ‘বোকা’ হোন না কেন!