বাঙালি নাকি লিবেরাল। উদারমনা। সারা দেশের থেকে অনেক আলাদা। দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীর তকমা নাকি কলকাতা শহরের। এ নিয়ে নানা সময়ে নানা ধরনের বিতর্ক হলেও, সুপ্রিম কোর্ট যেই সমকামিতাকে বৈধ বলে ঘোষণা করল, তখনই বেরিয়ে এল অধিকাংশ বাঙালির মনের ভাব। 

সমকামিতা অসুস্থতা। সমকামিতা অসভ্যতা। সমকামিতা ধর্ম-বিরোধী। সমকামিতা নোংরামি। সমকামিতা প্রকৃতি-বিরোধী। সুতরাং, সমকামীরা ধ্বংস হোক। 

শুধুমাত্র এবেলা.ইন-এর ফেসবুকের পাতায় যে মন্তব্যের ঝড় উঠল তাতেই বোঝা গেল আদালত অধিকার দিলেও, সমকামীদের লড়াই অনেক বাকি।

অনেকেই প্রকাশ্যে লিখলেন, আদালতের রায় সম্পূর্ণ ভুল। জঘন্য। যেমন আমাদের পাঠক চন্দন দে লিখেছেন, ‘‘সভ্যতা আর সংস্কৃতির সাথে এটা ঠিক যায় না। ভারতের হাজার বছরের ইতিহাসকেই আজকে কলঙ্কিত করা হল।’’

মহম্মদ ওমর আমানত উল্লাহ লিখছেন, ‘‘যে কাজ গুলো সুপ্রিম কোর্টের করা দরকার সে গুলো বাদ দিয়ে এই নেংরা কাজ নিয়ে ব্যস্ত সুপ্রিম কোর্ট ছিঃ ছিঃ ছিঃ।’’

কী করে এমন ‘জঘন্য’ একটি রায় দেওয়া হল সেই প্রশ্ন তুলে রাজ রিপন লিখছেন, ‘‘তাহ‌লে কি ধ‌রে নে‌ব ভার‌তে অধিকাংশ মানুষ সমকা‌মী,  কোনও রু‌চিশীল মানুষ কি ভার‌তে নেই যে এই জঘন্য আইনের ও কর্মকাণ্ডের বিরু‌দ্ধে প্রতিবাদ কর‌বে, সমাজটা দিন‌দিন কী হ‌য়ে যা‌চ্ছে, ত‌বে কি বে‌শি শি‌ক্ষা দীক্ষার ফ‌লে আজ আমা‌দের এত অধঃপতন, এতটা জঘন্য ও কুরু‌চি আমা‌দের, ছিঃ,‌ছিঃ ভাব‌তে লজ্জা লা‌গে সমকা‌মিতা।’’

সমকামিতাকে প্রাকৃতিক নিয়মবিরুদ্ধ বলেও দাবি করেছেন অনেকে। যেমন সাহিত্য প্রিন্স নামে একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘‘সমকামিতা এক ধরনের নোংরামি ছাড়া আর কিছুই না। ছেলে ছেলের সাথে সেক্স করবে, বিয়ে করবে ছেলেকে আর ও অনুপ্রাণিত করবে ভাল ছেলেদের সমকামী হওয়ার জন্য। এ ব্যাপারগুলো বিকৃত চিন্তা ভাবনা ছাড়া আর কিছুই না।’’

এটিকে যে অনেকেই মানসিক রোগ বলে ভাবেন, তারও উল্লেখ রয়েছে অনেকের মন্তব্যে, যেমন দীপঙ্কর দেবনাথ লিখছেন, ‘‘মানসিক রোগ হলে চিকিৎসা দরকার। আর সেটা না করে আইন পাশ করা মানে আইনের লোকেরাও সমকামী।’’

এটা ঠিক যে মহাভারত হোক বা রামায়ণ এমন কী বাৎসায়নের কামসূত্র— কোথাও সমকামী দম্পতির উল্লেখ মেলে না। বাংলাতেও সেভাবে সমকামিতার স্পষ্ট কোনও আভাস পাওয়া যায় না পুরনো সাহিত্য বা নথিতে। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

শুধু তাই নয়, ধর্মের দোহাইও তো দিচ্ছেন অনেকে। উজ্জ্বল হাসান লিখছেন, ‘‘ইসলামে সমকামিতা নিষিদ্ধ।’’ কিছু হিন্দু সংগঠনও তো এর বিরোধিতা করেছে। সাংসদে কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুর ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বদল নিয়ে আইন করতে গেলে এনডিএ সরকারের সাহায্য পায়নি। কয়েকটি খ্রিস্টান সংগঠনও তো সুপ্রিম কোর্টে সমকামিতার অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরোধিতা করেছে।

কিন্তু তার মানে কী এটা যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের একাংশের যৌন স্বরূপ যখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও স্বীকৃত হচ্ছে এবং সামাজিক ভাবেও নানা দেশে স্বীকৃত মিলছে, তখন ভারতের সেই অংশের মানুষের অধিকারকে একেবারেই অস্বীকার করব আমরা!

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের রায়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে যে কী পরিস্থিতিতে ১৫৭ বছর ধরে চালু একটি আইন খারিজ করতে হল। সময়ের দাবি মেনেই আইন বদলাবে, আধুনিক সমাজব্যবস্থায় সেটাই বিধি।

কিন্তু চোখ বুজে থেকে সমকামীদের পছন্দকে এক কথায় ‘সংস্কৃতির’ দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাব আর গালাগাল করব, এটাও কী উদারপন্থী বলে গর্ব করা বাঙালীর থেকে প্রত্যাশিত ছিল।

এবেলা.ইন-এর পাঠক অভিজিৎ মণ্ডল লিখছেন, ‘‘এবার সমকামী পুরুষ বা গে-দের উৎপাত বাড়বে। যারা এতদিন পরিচয় লুকতো, তারা এবার গর্বিত হয়ে বলবে আমি গে।’’

তাহলে কী সমকামীদের ‘উৎপাত’ বা ‘আক্রমণের’ ভয়েই আতঙ্কিত আম বাঙালী? নাকি বাড়িতে এসে ছেলে বা মেয়ে এসে নিজের লিঙ্গের কাউকে ভালবাসার কথা জানালে বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজনেরা তার মানসিক চাপ নিতে পারবেন না? তাই এত ভয়। 

এবেলা.ইন-এর পাঠিকা নিবেদিতা ওম সামন্ত লিখেছেন, ‘‘ঠিক যেমন খিদে পেয়েছে বলে বিষ খাওয়া যায় না, তেমনি কারোও সমকামিতায় রুচি বলে সেভাবে জীবনযাপন করা যায় না....এতে হয়তো কিছু মানুষ তাদের যৌন স্বাধীনতা ঢাকঢোল পিটিয়ে উদযাপন করবে কিন্ত তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আরো বেশি উচ্ছন্নের পথে এগোবে।’’

এ কথা সত্যি আইনের দোহাই দিয়ে সমাজ বদলানো অনেক কঠিন কাজ। সমকামিতার অধিকার আইনত বৈধ হলেও তা সামাজিক ভাবে মান্যতা পেতে অনেক সময় লাগবে। 

খুশির কথা এটাই যে, এবেলা.ইন-এর কিছু পাঠক-পাঠিকাই অবশ্য শীর্ষ আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। সম্মান জানাতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারকে।

যেমন এবেলা.ইন-এর পাঠক অভিলাষ ঢোলে যখন লিখছেন, ‘‘পশ্চিমি কালচারকে মান্যতা দিয়ে, এক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিজের দাম্ভিকতা হারাল।’’ তখন তার উত্তরে রকি হালদার লিখছেন, ‘‘পশ্চিমী কালচারের কথা বলছেন আবার পশ্চিমের তৈরি ফেসবুক ইউজ করছেন। সমকামিতা কোনো পশ্চিমী সভ্যতার নিদর্শন নয়, এটা সারা বিশ্বের সব জায়গাতেই আছে। এটার আবিষ্কারক প্রকৃতি, কোনও পশ্চিমী সমাজ নয়।’’

আমাদের পাঠক সুদীপ্ত ভট্টাচার্য যেমন লিখছেন, ‘‘এটি শুধু সমলিঙ্গের যৌনতার বিষয় নয়। এটি আসলে মানবাধিকারের বিষয়। তাঁর সুরে সুর মিলিয়েই সৈকত মিত্র লিখছেন, ‘‘সমকামিতা কোন শারীরিক বা মানসিক রোগ নয়। এটা কোন শখ বা অ্যাডভেঞ্চারও নয়। কিছু মানুষ আছে যারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হন না বা প্রেম অনুভব করেন না, পরিবর্তে তাদের টান সমলিঙ্গের প্রতি। এতে অপরাধের কিছু কি আছে? দোষ যদি কেউ করে থাকেন, তা সৃষ্টিকর্তা করেছেন তাদের এই রকম ভাবে সৃষ্টি করার জন্য। আর মানুষ হয়ে ইশ্বরের বিচার করার ক্ষমতা আমাদের নেই। যেটা করা যেতে পারে, এই ব্যতিক্রমী মানুষ গুলোকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া, তাদের অধিকার গুলোকে সম্মান জানানো।’’

এই অধিকারের অপব্যবহার হলে তার সমাধান আইনের পরিসরেই থাকছে। দরকার একটু খোলা মনে অন্যের পছন্দকে সম্মান জানানো। সেই মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য হয়তো আম বাঙালীর আরও অনেকটা সময় দরকার। ভারতের অন্য অনেক প্রদেশের মতোই।