শবরের রেশ কাটতে না কাটতেই আপনার ছবি ‘বালিঘর’-এর পোস্টার নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় জোর আলোচনা শুরু হয়ে গেল। আপনার পরিচালকের চেয়ারটা তো শক্তপোক্ত জমির উপরেই। তবে বালির ঘর বানানো কেন?

আমাদের সবার মনে একটা ঘর থাকে। ছোট্টবেলা থেকেই সেই স্বপ্নের ঘর বানানোর ইচ্ছে থাকে। যত বয়স বাড়ে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায় স্বপ্ন, বদলায় সিদ্ধান্ত। সব বালির ঘর ধুয়ে-মুছে যায়। আমার কাহিনিতে ১২ বছর পরে সাত বন্ধুর রিইউনিয়ন। এই সময়ের ব্যবধানে সবার জীবনে বালির ঘরগুলো ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। যে সক্রিয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিল, সে রাজনীতিকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। যারা পাগলের মতো প্রেম করে বিয়ে করেছিল, তাদের বাড়ির দরজা এখন হাট-খোলা। সব সম্পর্কগুলো এখন অন্য বাঁক নিয়েছে। আসলে এটা ভায়োলেন্ট রিলেশনশিপের গল্প। কিন্তু সবার শেষে হতাশা নয়, আলোর কথা, আশার কথা বলে। 

সম্পর্কগুলো নিয়ে আলাদা-আলাদাভাবে ছবি হতে পারত। 

দেখুন, আমার কাছে এই ছবিটা বানানো খুব কঠিন। দার্শনিক ভাবে দেখলে, এই ছবিটা ‘আবর্ত’-র পরের ছবি হতে পারত। আমার কাছে থ্রিলার ঘরানার ছবি অনেক বেশি সহজ। ‘ধনঞ্জয়’-এর মতো ছবি বানানো অনেক কঠিন।  


শবর বা ব্যোমকেশ অনেক সহজ আপনার কাছে?

আমার সাতটা ছবি পর পর হিট। আমার দর্শক বেসটা এখন তৈরি হয়ে গিয়েছে। অরিন্দম শীলের ছবি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করে চলেছে, সেজন্য আমি ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞ। ‘দুর্গা সহায়’ ছবির কেন্দ্রে দুই নায়িকা। তনুশ্রী বাড়ির মালকিন, সোহিনী পরিচারিকা। এমন কাহিনি লোকে নেবে না, এই বলে অনেক পরিচালকই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু দর্শক তো দেখলেন। তাঁদেরই প্রশংসায় আমার ছবি প্রযোজককে লাভের মুখও দেখিয়েছে। স্পিলবার্গের ‘দ্য পোস্ট’ দেখছিলাম। জীবনের কোন সন্ধিক্ষণে এসে স্পিলবার্গ এমন ছবি বানালেন! একটি ছোট্ট বিষয় নিয়ে কত গভীর অনুসন্ধান! যে-কোনও ফিল্মমেকারকেই নতুন ভাবনার আলো দেবে।

নদীর ওপারের নায়িকারা কি অনেক বেশি গভীর, এপারের চেয়ে?

এপার বাংলাতেও ভাল অভিনেত্রী আছেন। 

জয়া আহসান আপনারই আবিষ্কার। এই বঙ্গে এসে সব নায়িকাকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। পাশাপাশি যদি শুভশ্রীকে রাখা যায়...

জয়ার সঙ্গে শুভশ্রীর তুলনা চলে না। কিন্তু সোহিনীর তুলনা চলে। নুসরতের কথাও ধরুন, আমার ছবিতে ও প্রচণ্ড খেটে অভিনয় করেছে। 

জয়া আহসানের বাংলাদেশি ছবিগুলোর সঙ্গে এখানকার পারফরম্যান্সের কোনও মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না... এখানে এসে বাংলাদেশি অভিনেত্রীরা সম্পূর্ণ বদলে যান কীভাবে?

আসলে বাংলাদেশে ওঁদের যে ধরনের কাজ করতে হয়, তার পরিসর খুবই সীমিত। তাঁর মধ্যে থেকেই যাঁদের অন্য পরিচালকরা আবিষ্কার করেছেন, তাঁরা একেবারে ছাইঘাঁটা হিরে! আমি বাংলাদেশি টেলিভিশনে জয়াকে দেখেছি। এত দুরন্ত অভিনেত্রী যে, সবকিছু ছেড়ে শুধু জয়ার দিকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকেছি। অপু করিম বলে আরও একজন অভিনেত্রী আছেন, যাঁর কাজ দেখে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে! আমার ‘বালিঘর’-এও আর এক আবিষ্কার দেখতে পাবেন দর্শক। আমার স্থির বিশ্বাস। একটু অপেক্ষা করুন।

আপনার ছবিতে একাধিক নায়িকা। এপার-ওপার মিলিয়ে।

অবশ্যই। এটা যৌথ প্রযোজনার ছবি। ছ’-সাতজনের কাস্টিং করতে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কালঘাম ছুটে যায়! নানান গল্প আছে। ইনি ওঁর সঙ্গে কাজ করবেন না, উনি আবার অমুকের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করবেন না, তাই যৌথ প্রোডাকশন আমাদের অনেকগুলো চয়েস দেয়। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

কে কার সঙ্গে কাজ করতে চায় না? একটা ছোট্ট তালিকা দেওয়া যায় না?


বলে কী হবে। বলতেও চাই না। তবে যৌথ প্রযোজনা সত্যিই বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সুযোগ দিয়েছে নিজেকে প্রমাণ করার।

অরিন্দম শীল যখন অভিনেতা ছিলেন, তেমন কোনও বলার মতো সুযোগ আসেনি। পরিচালকের চেয়ারে বসে সেসব দিনের কথা মনে পড়ে?

(হাসি) এখন যখন সেই লোকগুলোকেই বলতে শুনি, অরিন্দম শীলের মতো অভিনেতা হয় না, তখন মনে মনে হাসি পায়। তখন সত্যিই সুযোগ পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন পরিচালক হিসেবে আমি সকলের অভিনয় নিজে করে দেখাই। প্রতিটি অভিনেতা অভিনেত্রীর। এভাবেই আমার অভিনয় সত্তা বেঁচে আছে। আমার সঙ্গেই আছে।
দেখুন, কৌশিক, অঞ্জনদা, আমি- আমরা অভিনয় দিয়ে শুরু করেছিলাম বলেই আজ সফল পরিচালক...অঞ্জনদার আগামী ছবিতে আমি অভিনয় করছি, কারণ অঞ্জনদা জানে যে, আমি ওই চরিত্রেই দারুণ অভিনয় করব।

আশা করা যায়, আপনার সঙ্গে অঞ্জন দত্তের আর কখনও মনোমালিন্য হবে না!


চলচ্চিত্রে শত্রুও নেই, বন্ধুও নেই। আমার একজিকিউটিভ প্রোডিউসার হওয়া, আমার শুরুর দিকের স্ট্রাগল— সবেতেই অঞ্জনদার অবদান আছে। বয়সের সঙ্গেসঙ্গে ম্যাচিওরিটি আসে। পুরনো অভিমান জমিয়ে রেখে কোনও লাভ হয় না। অভিমান করলে দু’জনেরই লস। 

 আসল সময়েই তো বেশিরভাগ মানুষ পাশে থাকেননি...

দেখুন, জীবনে আমি প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। আড়়ম্বরে বিশ্বাস করি না। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় জীবনের মধ্যাহ্নে এসে কেরিয়ার বদল করতে পারেন, অসম্ভব নিয়মানুবর্তিতা মেনে বেঁচে থাকতে পারেন, সেটাই তো দৃষ্টান্ত। কত স্টারকে জাস্ট হাওয়া হয়ে যেতে দেখেছি। কত শিল্পীকে দেখেছি, কথা বলার সময়ে টেবিলের উপর জুতোশুদ্ধু পা তুলে কথা বলে। শুনেছিলাম, তাদের ছাড়়া নাকি ইন্ডাস্ট্রি চলে না, আজ তারা কোথায়? প্রসেনজিৎ তো নিজে কোনওদিন বলেননি যে, তিনি উত্তমকুমার! তিনি নিজের চেষ্টায় টিকে থেকেছেন। টিকিয়ে রেখেছেন।