বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানেই বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহিষাসুরমর্দিনী থেকে শুরু করে শোভাবাজার রাজবাড়ি বা ম্যাডক্স স্কোয়্যারে আড্ডা। কিন্তু কাজের সূত্রে শহর ছেড়ে যাওয়া প্রবাসী বাঙালিদের দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে একটু হলেও মন ভারী হয়ে যায়। তবে প্রবাসে দুর্গাপুজো হলে সেই কষ্টে কিছুটা হলেও প্রলেপ লাগে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তো এমনটা ঘটে না।

১৯৭৪ সালে কাজের জন্য দেশ ছেড়ে কলম্বিয়ার বোগোটাতে পাড়ি দেন বারাসতের বাসিন্দা অরুণকুমার পাল। কিন্তু বোগোটার মানুষের তখন বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না। তাই বছরের পর বছর দুর্গাপুজোর কথা চিন্তা করেই কাটিয়েছেন অরুণবাবু ও তাঁর পরিবার। 


পুজোয় জড়ো হয়েছেন বাঙালি থেকে অবাঙালি সব্বাই। নিজস্ব চিত্র 

পেশায় অরুনবাবু শেফ। কলম্বিয়ার বোগোটাতে রেস্তরাঁ খোলার আগে তিনি লন্ডন, গ্রীস, ইরানেও নিজের পেশার খাতিরে ঘুরেছেন। কিন্তু তার পরে স্থায়ী বসবাস হয়েছে তাঁর বোগোটাতে। কলম্বিয়াতেই খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনসঙ্গিনী ম্যারিস্টেলা ফোরেওকে। এই ভাবেই প্রায় ৫০ বছর অরুণবাবু কাটিয়ে ফেলেছেন বিদেশে। কিন্তু সবসময়ই নিজের মাটির কথা, দুর্গাপুজোর কথা মনে পড়ত তাঁর। 

চার দশকের বেশি হা-পিত্যেশ করে বসে থাকার পরে, অরুণবাবু দেখলেন বোগোটা রয়ে গিয়েছে দুর্গা-হীন হয়েই। তাই ২০১৫ সালে নিজের কাঁধেই দায়িত্ব তুলে নেন অরুণবাবু। বোগোটাতে এতদিন ধরে থাকার পরেও মনে প্রাণে বাঙালিই থেকে গিয়েছেন ৭০ বছরের অরুণ পাল। তাই ভেবেই নিয়েছিলেন যে, দুর্গাপুজো করবেন। আর এই পুজোতে সমস্ত বাঙালিকে এক জায়গা করার দায়িত্বও নেন তিনি। 


ট্যাব দেখে মন্ত্র পড়ছেন ভিনদেশি পুরোহিত। নিজস্ব চিত্র 

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। ২০১৫ সালে অত্যন্ত কম খরচে বোগোটার বাঙালি গোষ্ঠীকে নিয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন অরুণ কুমার পাল। কিন্তু ২০১৬ সালে ভাল মূর্তি এনে পুজোর আয়োজন করা হয়। ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন থেকে শুরু করে, সপ্তমীতে কলাবউ স্নান করানো সমস্তই নিয়ম মাফিক হয়। শুধু বাঙালিই নয়। এই পুজোয় বোগোটার অবাঙালি বাসিন্দারাও যোগ দেন। তাই তাঁদের কথা মাথায় রেখে নবরাত্রি উপলক্ষে ডান্ডিয়া নাচেরও আয়োজন করা হয়। 


অরুণবাবুর দুর্গাপুজোর প্রসাদ খাচ্ছেন বোগোটার বাসিন্দারাও। নিজস্ব চিত্র 

ভারতীয়দের এই জমকালো উৎসবে যোগ দেন কলম্বিয়ার বাসিন্দারাও। বোগোটার আর এক বাঙালি বাসিন্দা রাজীব সাহা জানান, কলম্বিয়ার মানুষ এই পুজোর আগে ভারতের সংস্কৃতি সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহল ছিল না। কিন্তু এই পুজো দেখার পরে তাঁরা ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আরও বেশি করে আগ্রহী। 


বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা। নিজস্ব চিত্র 

গত বছরও পুজোর বাজেট খুব বেশি না হলেও, পুজোতে কোনও খামতি ছিল না বলে জানান রাজীববাবু। ২০১৬ সালের থিম ছিল ‘গ্রামের দুর্গা পুজো’। কাশফুল, টোকা ইত্যাদি দিয়ে পুজো মণ্ডপ সাজানো হয়। এবারের পুজোর থিম হল কলকাতার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য।  এই বছর ভারতীয় দূতাবাসকেও আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানান রাজীববাবু।